Fifa world cup 2026

অতীতকে না ভুলে তাকে আরও উন্নত করে বিশ্বকাপ জয়

খেলা বিশ্বকাপ ২০২৬

প্রতীম দে


স্পেনের বিশ্বকাপ জয় কেবল একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়, এটি আধুনিক ফুটবলে একটি সুপরিকল্পিত দর্শনের জয়। ২০১০ সালের টিকি-টাকার ঐতিহ্যকে ধরে রেখে, কিন্তু আরও গতিময়, আক্রমণাত্মক ও বাস্তববাদী ফুটবল খেলে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল বিশ্বকে দেখিয়ে দিল বল দখল মানেই শুধু পাসের পর পাস নয়, বরং প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক সময়ে আঘাত হানা। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে। পুরো ম্যাচে বলের দখল, পাসের সংখ্যা এবং আক্রমণের ধার সব ক্ষেত্রেই তারা এগিয়ে ছিল।

এক সময় স্পেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা অনেক পাস খেললেও গোলের সামনে ধার কম। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর বিরুদ্ধে সেই সমস্যাই দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এর স্পেন সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে। এখন তাদের পাসিংয়ের লক্ষ্য শুধু বল ধরে রাখা নয়, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দ্রুত ফাঁকা জায়গা তৈরি করা। লুইস দে লা ফুয়েন্তে টিকি-টাকাকে আরও গতিশীল করে তুলেছেন।

মিডফিল্ড ছিল স্পেনের হৃদস্পন্দন

বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের মিডফিল্ড। রদ্রি ছিলেন দলের মেট্রোনোম। কখন খেলার গতি বাড়াতে হবে, কখন ধীর করতে হবে সব সিদ্ধান্ত এসেছে তার পা থেকে। তার পাশে পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ এবং দানি ওলমো প্রতিপক্ষের মাঝমাঠকে কার্যত অচল করে দেন। এই চারজনের সমন্বয় প্রতিটি ম্যাচে স্পেনকে বলের নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়।
বিশ্বকাপে অনেক দল তারকা নির্ভর ফুটবল খেললেও স্পেন খেলেছে মিডফিল্ড-নির্ভর ফুটবল। আর সেই কারণেই তাদের আক্রমণ যেমন ধারালো ছিল, তেমনি রক্ষণও ছিল নিরাপদ।

ডান-বাম উইংয়ের বিস্ফোরণ

স্পেনের আক্রমণের আরেকটি বড় অস্ত্র ছিল দুই প্রান্ত। লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস এবং প্রয়োজনে ফেরান তোরেস প্রতিপক্ষের ফুল-ব্যাকদের চাপে রেখেছেন পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে। তারা শুধু ড্রিবল করেননি, ভেতরে ঢুকে গোলের সুযোগও তৈরি করেছেন।
ফাইনালে ম্যাচের একমাত্র গোলটিও আসে বদলি খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে, যা প্রমাণ করে স্পেনের শক্তি শুধু প্রথম একাদশে নয়, পুরো স্কোয়াডেই ছড়িয়ে ছিল।

হাই প্রেসিং-এ প্রতিপক্ষকে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ নয়

স্পেন বল হারানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে প্রতিটা ম্যাচে। এই কাউন্টার-প্রেসিংয়ের ফলে প্রতিপক্ষ নিজেদের অর্ধ থেকেও স্বাভাবিকভাবে আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি।
ফ্রান্স, বেলজিয়াম কিংবা আর্জেন্টিনা সব বড় দলের বিরুদ্ধেই স্পেন একই কৌশল বজায় রেখেছে। তারা প্রতিপক্ষকে সময় দেয়নি, জায়গা দেয়নি।

 

দলই ছিল সবচেয়ে বড় তারকা

এই স্পেন কোনও একক সুপারস্টারের উপর নির্ভরতা ছিল না। কখনও ইয়ামাল ম্যাচ জিতিয়েছেন, কখনও মিকেল মেরিনো, কখনও ফেরান তোরেস, কখনও আবার রদ্রি বা পেদ্রি। গোলদাতা যেমন বদলেছে, তেমনি ম্যাচের নায়কও বদলেছে।
এই দলগত সংস্কৃতিই স্পেনকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও বারবার বলেছেন, ব্যক্তিগত প্রতিভার চেয়ে দলের স্বার্থই তার দর্শনের মূল ভিত্তি।

রক্ষণে নিখুঁত ভারসাম্য

শুধু আক্রমণ নয়, রক্ষণেও স্পেন ছিল অসাধারণ। পাউ কুবার্সি, লাপোর্তে, কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরো মিলে এমন একটি ডিফেন্স গড়ে তোলেন, যারা বল নিয়েও স্বচ্ছন্দ এবং বল ছাড়াও সংগঠিত। ফুল-ব্যাকরা আক্রমণে উঠলেও পিছনে ভারসাম্য নষ্ট হয়নি। ফলে প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণও কার্যকর হয়ে ওঠেনি।

লুইস দে লা ফুয়েন্তে, নেপথ্যের স্থপতি

এই বিশ্বকাপের প্রকৃত স্থপতি নিঃসন্দেহে লুইস দে লা ফুয়েন্তে। স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ দল থেকে উঠে আসা বহু ফুটবলারকে তিনি আগে থেকেই চিনতেন। ফলে জাতীয় দলে এসে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে হয়নি। খেলোয়াড়দের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তার পরিষ্কার ধারণা ছিল।
তিনি পুরনো স্প্যানিশ দর্শনকে অক্ষুণ্ণ রেখে তাতে আধুনিক ফুটবলের গতি, সরাসরি আক্রমণ এবং স্কোয়াড রোটেশনের নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

স্পেনের এই বিশ্বকাপ জয় প্রমাণ করে, আধুনিক ফুটবলে শুধু তারকা ফুটবলার থাকলেই হয় না। প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট দর্শন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং দলগত শৃঙ্খলা। বল দখল, দ্রুত পাস, হাই প্রেসিং, তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারদের নিখুঁত মিশ্রণ এবং একজন দূরদর্শী কোচ এই পাঁচ স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়েই স্পেন আবারও বিশ্বের সেরা হয়েছে।
২০১০ সালে স্পেন বিশ্বকে শিখিয়েছিল কীভাবে বলের দখল দিয়ে ম্যাচ জেতা যায়। ২০২৬ সালে তারা দেখিয়ে দিল, সেই দর্শনকে সময়ের সঙ্গে বদলে আরও দ্রুত, আরও কার্যকর এবং আরও প্রাণঘাতী করে তুললে বিশ্বকাপ ফের জেতা যায়।

Comments :0

Login to leave a comment