চন্দন দে
সকালেই মোড়ের মাথার চায়ের দোকানে জটলা। স্বাধীনতা দিবসের সকাল। কিন্তু জাতীয় পতাকা ওঠার আগেই পাড়ায় দেশপ্রেমের পতাকা নিয়ে তর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে।
অনুপ চায়ের কাপে ফুঁ দিতে দিতে বলল,
“ক্লাবে কেন ওই বুড়োটাকে দিয়ে পতাকা তোলানো হলো?”
আনোয়ার বলল,
“কেন? বুড়ো মানুষ বলে দেশপ্রেম কম?”
“তা নয়। ও আমাদের ক্লাবের কে? এই তো সেদিন পর্যন্ত ‘দিদি, দিদি’ করে গুণগান গাইত। এখন আবার গেরুয়া হয়ে গিয়েছে। মানে কী? ভালো তৃণমূল!”
শঙ্কর হেসে বলল,
“দল বদলেছে, তাই চরিত্রও বদলে গেল?”
ইতু বলল,
“সুমির ছোট মেয়েটাকে দিয়ে তোলালেই তো ভালো হতো। নতুন প্রজন্মের ছবি হতো।”
চঞ্চল সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তখন আবার প্রশ্ন উঠত, মেয়েটা কোন দলের?”
অনুপ বলল,
“আর যদি কোনও দলেই না থাকে?”
শঙ্কর মাথা নেড়ে বলল,
“তা হলে তো আরও বিপদ। আজকাল নির্দল মানুষই সবচেয়ে সন্দেহজনক।”
ঠিক তখনই ক্লাবের মাইক থেকে তারস্বরে ভেসে এল,
‘চক দে চক দে ইন্ডিয়া...’
সবাই কিছুক্ষণ চুপ।
আনোয়ার কানে আঙুল দিয়ে বলল,
“সাতসকালেই শুরু হয়ে গেল!”
চঞ্চল বলল,
“মাঝরাত থেকে তারস্বরে দেশপ্রেমের শব্দব্রহ্ম চলছে। ‘মেরে রং দে বাসন্তুী’, ‘চক দে ইন্ডিয়া’। যেন নতুন জাতীয় সঙ্গীত।”
ইতু বলল,
“জাতীয় সঙ্গীতের জায়গা যদি এরা নিয়ে নেয়, তা হলে সংবিধানও একদিন রিমিক্স হয়ে যাবে।”
শঙ্কর হেসে বলল,
“গেরুয়া উত্তরীয় জড়িয়ে পতাকা তোলার সমারোহ। পাশে গেরুয়া ফেট্টিধারী বাইক বাহিনী। সব মিলিয়ে প্রশ্নটা তো উঠবেই, এ কোন স্বাধীনতা দিবস?”
রাজুর ডাক পড়ল।
“রাজু! মাইকটা একটু কমা!”
দূর থেকে রাজুর গলা এল,
“কমিয়েছি তো!”
মাইক কমল না।
বরং আরও জোরে উঠল,
‘চক দে... চক দে...’
অনুপ বলল,
“রাজু স্বাধীনতার সঙ্গে শব্দের স্বাধীনতাও পালন করছে।”
হাসির রেশ কাটতেই আনোয়ার বলল,
“কিন্তু ব্যাপারটা মাইকের মধ্যে আটকে নেই। এখন তো কে দেশপ্রেমিক, কে দেশবিরোধী, কে আসল ভারতীয়, কে নাগরিক, কে সন্দেহজনক, সব কিছুরই যেন আলাদা সার্টিফিকেট লাগছে।”
চঞ্চল বলল,
“দেশপ্রেম এখন পরীক্ষার বিষয়। প্রশ্নপত্র রাজনৈতিক, পরীক্ষক রাজনৈতিক, আর পাশ-ফেলের মাপকাঠিও রাজনৈতিক।”
*‘ওটিপি-র মাপকাঠিতে নাগরিক’*
ইতু বলল,
“নাগরিকত্বের কথাই ধর। একটা সময় নাগরিক হওয়া ছিল সংবিধানের প্রশ্ন। এখন যেন ডিজিটাল যাচাইয়ের প্রশ্ন।”
অনুপ হেসে বলল,
“ওটিপি-র মাপকাঠিতে নাগরিক!”
আনোয়ার বলল,
“মানে?”
“নিজেকে নাগরিক প্রমাণ করতেও ফোনে আসা একটা ওটিপি’র দিকে তাকাতে হবে। এই দেশে নাগরিক কে, সেটা সংবিধান ঠিক করবে, না অ্যাপ, ডেটাবেস আর প্রশাসনিক যাচাই?”
শঙ্কর বলল,
“প্রযুক্তি পরিষেবা দেওয়ার হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু নাগরিকত্বের রাজনৈতিক মাপকাঠি হতে পারে না।”
চঞ্চল যোগ করল,
“নাগরিক অধিকার কোনও লগ-ইন পাসওয়ার্ড নয়। দেশপ্রেমও কোনও ওটিপি দিয়ে যাচাই করার বিষয় নয়।”
মাইক আবার চেঁচিয়ে উঠল।
‘চক দে ইন্ডিয়া...’
“রাজু!”
“এই তো কমাচ্ছি!”
কোনও লাভ হলো না।
*স্বাধীনতার রাতেও অনুমতি*
শঙ্কর বলল,
“মাঝরাতে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। সেই স্মৃতিতে মানুষ যদি রাত জেগে গান করে, রাস্তায় বেরোয়, নিজেদের মতো স্বাধীনতা উদ্যাপন করে, সেখানেও অনুমতি-অনুমতির প্রশ্ন কেন?”
আনোয়ার বলল,
“নিরাপত্তার যুক্তি অবশ্যই আছে।”
ইতু মাথা নেড়ে বলল,
“কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে। আইন কি সবার জন্য একই?”
একদিকে রাজনৈতিক মিছিল, সভা, মাইক, বাইকবাহিনী। অন্যদিকে নাগরিকের সাংস্কৃতিক জমায়েত নিয়ে কড়াকড়ি।
চঞ্চল বলল,
“‘ফ্রিডম অব মিডনাইট’-এর নামে শব্দব্রহ্ম চলবে। কিন্তু নাগরিকের নিজের কণ্ঠস্বর অস্বস্তিকর?”
অনুপ বলল,
“স্বাধীনতা কি শুধু সরকারের পছন্দের শব্দে উদ্যাপন করা যাবে?”
*২০১৪-র স্বাধীনতা, ২০২৬-এর স্বাধীনতা*
আনোয়ার বলল,
“আবার একটা মজার ব্যাপার আছে। ২০১৪-কে নতুন ভারতের সূচনাবিন্দু বলা হয়।”
শঙ্কর বলল,
“আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বয়ানে বলা হচ্ছে, রাজ্যের স্বাধীনতার স্বাদ পেতে ২০২৬-এর ৪ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।”
ইতু হেসে বলল,
“তা হলে স্বাধীনতা কি সরকার বদলের সঙ্গে আসে?”
চঞ্চল বলল,
“তাহলে তো প্রত্যেক নির্বাচনের পর নতুন করে স্বাধীনতা দিবস পালন করতে হবে!”
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।
অনুপ বলল,
“স্বাধীনতা কোনও দলের সম্পত্তি নয়। ১৯৪৭ কোনও সরকারের কৃতিত্বও নয়। কোটি মানুষের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং একটা বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের জন্মের ফল।”
শঙ্কর বলল,
“সরকার বদলাবে। দল বদলাবে। স্লোগান বদলাবে। স্বাধীনতার মালিকানা বদলাবে না।”
*লালকেল্লা থেকে ‘দিমাগি নকশাল’*
চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে পতাকা হাতে গলায় গেরুয়া স্কার্ফ ঝুলিয়ে কয়েকজন ছেলেকে যেতে দেখা গেল।
চঞ্চল বলল,
“আজ লালকেল্লা থেকেও নতুন শব্দ এসেছে। ‘দিমাগি নকশাল’।”
অনুপ বলল,
“আগে ছিল ‘আরবান নকশাল’। এখন ‘দিমাগি নকশাল’।”
আনোয়ার বলল,
“শব্দটা নতুন। অভিধানটা পুরানো।”
শঙ্কর বলল,
“প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সশস্ত্র নকশালবাদ দুর্বল হলেও আদর্শগত নকশাল মানসিকতা এখনও কিছু প্রতিষ্ঠানে রয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার কথা বলা হয়েছে।”
ইতু প্রশ্ন করল,
“কিন্তু বন্দুক না থাকলেও কি কারও চিন্তা তাকে নকশাল করে দেয়?”
চঞ্চল বলল,
“সরকারের নীতির সমালোচনা করলে?”
অনুপ, “নকশাল?”
আনোয়ার, “প্রশ্ন করলে?”
শঙ্কর, “নকশাল?”
ইতু, “ছাত্র আন্দোলনে নামলে?”
চঞ্চল, “নকশাল?”
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে অনুপ বলল,
“তাহলে স্বাধীন চিন্তাই সন্দেহের কারণ হয়ে গেল?”
*পালটা প্রশ্ন*
আনোয়ার বলল,
“বিরোধীরা তো বলছে, ‘আরবান নকশাল’-এর কোনও নির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞাই নেই।”
শঙ্কর বলল,
“কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশও সেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, আগে ‘আরবান নকশাল’ বলা হতো, এখন ‘দিমাগি নকশাল’।”
চঞ্চল বলল,
“সমস্যাটা এখানেই। সমালোচনা নকশালবাদ নয়। প্রশ্ন করা রাষ্ট্রদ্রোহ নয়। মতবিরোধ দেশবিরোধিতা নয়।”
ইতু বলল,
“গণতন্ত্রে সরকারকে প্রশ্ন করা নাগরিকের অধিকার। অনেক সময় দায়িত্বও।”
অনুপ বলল,
“সরকারের সমালোচককে যুক্তিতে হারাতে হয়। ‘নকশাল’, ‘দেশবিরোধী’, ‘দিমাগি নকশাল’ বলে দাগিয়ে দেওয়া যুক্তির বিকল্প হতে পারে না।”
শঙ্কর চুপচাপ সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল,
“আজ যে প্রশ্নকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলা হচ্ছে, কাল সেটাই যদি সরকারের নীতি হয়ে যায়?”
চঞ্চল তাকালো।
“তখন নকশাল কে আর নীতিনির্ধারক কে?”
মাইক আবার চেঁচিয়ে উঠল।
‘চক দে ইন্ডিয়া...’
“রাজু!”
“দাদা, এবার সত্যিই কমিয়েছি!”
“কোথায় কমালি?”
“আমার দিক থেকে তো কম!”
সবাই আবার হেসে উঠল।
*টেলিপ্রম্পটার ছাড়া ‘মহামানব’*
ইতু বলল,
“আর প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার ওই অংশটা দেখেছিস?”
অনুপ বলল,
“বায়ো-ইকোনমির কথা বলার সময় যে হোঁচটটা খেলেন?”
চঞ্চল বলল,
“হ্যাঁ। কাগজের নোটের দিকেও তাকাতে দেখা গেল।”
আনোয়ার বলল,
“পবন খেরা তো সঙ্গে সঙ্গে কটাক্ষ করেছেন, ‘মহামানব বিনা টেলিপ্রম্পটারে।’”
শঙ্কর বলল,
“আর অরবিন্দ কেজরীওয়াল বলেছেন, ওঁকে নাকি ওই মুহূর্তে ‘আত্মবিশ্বাসে টান, নার্ভাস এবং টলমলে’ মনে হয়েছে।”
ইতু বলল,
“বক্তৃতায় হোঁচট খাওয়া কোনও অপরাধ নয়।”
অনুপ বলল,
“অবশ্যই নয়।”
“সমস্যা হোঁচট খাওয়ায় নয়। সমস্যা নেতাকে মানুষ না রেখে প্রায় পৌরাণিক চরিত্র বানিয়ে ফেলার প্রবণতায়।”
চঞ্চল বলল,
“যাকে প্রতিটি বক্তৃতায় অপরাজেয়, অলৌকিক, অতিমানবীয় করে দেখানো হয়, তাঁর স্বাভাবিক ভুলও তখন রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে যায়।”
*দেশপ্রেমের মাপকাঠি কে বানালো?*
শঙ্কর এবার একটু জোরেই বলল,
“জাতীয় পতাকা থাকবে। জাতীয় সঙ্গীত থাকবে। বন্দে মাতরম্ থাকবে। ভারতমাতার ছবি থাকবে। গেরুয়া থাকবে। লাল থাকবে। সবুজ থাকবে। সামরিক শক্তির প্রদর্শনও থাকবে।”
“সব থাকবে,” বলল ইতু।
“কিন্তু ক্ষুধার্ত ভারতের ছবি থাকবে?”
চায়ের দোকানে আবার নীরবতা।
অনুপ বলল,
“বেকার যুবকের ছবি?”
আনোয়ার বলল,
“ঋণে ডুবে থাকা কৃষকের ছবি?”
চঞ্চল, “বন্ধ কারখানা?”
ইতু, “চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে না-পারা পরিবার?”
শঙ্কর, “পরিযায়ী শ্রমিক?”
অনুপ বলল,
“দেশপ্রেম যদি মানুষের পেটের প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, মঞ্চের আলোয় যতই সুন্দর দেখাক, বাস্তব জীবনে তার দাম শূন্য।”
চঞ্চল বলল,
“বেকার যুবককে ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলানো যায়। কিন্তু স্লোগানে চাকরি তৈরি হয় না।”
আনোয়ার বলল,
“কৃষককে জাতীয়তাবাদের পাঠ পড়ানো যায়। কিন্তু তাতে ফসলের ন্যায্য দাম আসে না।”
ইতু বলল,
“শ্রমিককে দেশের গৌরবের কথা বলা যায়। কিন্তু তাতে মজুরি বাড়ে না।”
শঙ্কর বলল,
“দেশপ্রেমের প্রথম পরীক্ষা মানুষের জীবন।”
সেকুলার ভারত কোথায়?
মাইক আবার শুরু হলো।
‘চক দে...’
চঞ্চল বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই মাইকটা যেন আজকের ভারতের প্রতীক। একটা শব্দ ঢাকতে আরেকটা শব্দ।”
ইতু বলল,
“ভারতের আসল শব্দগুলো কোথায়?”
“কী রকম?”
“মন্দিরের ঘণ্টা। মসজিদের আজান।...’’
হঠাৎ কথার ফাঁকে ঢুকে পড়ল লম্বা লাইন পেরিয়ে মাটন কিনে ফেরা গলদগর্ম মুকেশ। বলল, না বাবা সেদিন গেছে। এখন মসজিদ মসজিদে গিয়ে পুলিশই খুলে দিচ্ছে মাইক।
খিল্লির মধ্যেই আনোয়ার আবার বলতে লাগলো, ‘‘সে যাক গে। মন্দির-মসজিদও আছে। গির্জার প্রার্থনাও আছে। গুরুদ্বারের কীর্তন। বাউলের গান। সুফির কবিতা। রবীন্দ্রনাথের ‘জন গণ মন’। নজরুলের বিদ্রোহ। লালনের মানবতাবাদ। ভূপেন হাজারিকার সুর। পাহাড়, জঙ্গল, মরুভূমি, সমুদ্র, অসংখ্য ভাষা আর সংস্কৃতি।”
আনোয়ার বলল,
“এই সহাবস্থানটাই তো ভারত।”
শঙ্কর বলল,
“এই ভারতই সেকুলার ভারত।”
সেকুলার মানে ধর্মহীন ভারত নয়।
সেকুলার মানে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকের সমান মর্যাদা।
চঞ্চল বলল,
“তাই কে নাগরিক, কে দেশপ্রেমিক, কে ভালো ভারতীয়, তার মাপকাঠি যদি রাজনৈতিক আনুগত্য হয়ে যায়, ক্ষতি কোনও একটি সম্প্রদায়ের নয়।”
ইতু বলল,
“ক্ষতি ভারতের।”
দেশটা কার?
অনুপ বলল,
“দেশটা বিজেপি’র?”
“না।”
“কংগ্রেসের?”
“না।”
“বামপন্থীদের?”
“না।”
“গৈরিক বাহিনীর?”
সবাই একসঙ্গে বলল,
“না।”
শঙ্কর বলল,
“দেশটা নাগরিকের।”
দেশপ্রেমের আসল রিপোর্ট কার্ড
ইতু এবার প্রশ্ন করতে শুরু করল।
“একজন মানুষ নিজের ধর্ম পালন করতে পারছেন?”
“নিজের ভাষায় কথা বলতে পারছেন?”
“সরকারকে প্রশ্ন করতে পারছেন?”
“ভয় ছাড়া প্রতিবাদ করতে পারছেন?”
“চাকরি পাচ্ছেন?”
“দু’বেলা খেতে পারছেন?”
“চিকিৎসা পাচ্ছেন?”
“একজন মহিলা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছেন?”
“একজন ছাত্র নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারছেন?”
কেউ উত্তর দিল না।
শঙ্কর ধীরে ধীরে বলল,
“এই হলো স্বাধীনতার আসল রিপোর্ট কার্ড।”
অনুপ বলল,
“পতাকা কত উঁচুতে উঠল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।”
চঞ্চল বলল,
“কিন্তু পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কতটা স্বাধীন, সেটা আরও গুরুত্বপূর্ণ।”
আনোয়ার হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের লাইন আওড়াল,
“যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?”
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর ইতু বলল,
“দেশপ্রেমের পাহারাদাররা, একটা প্রশ্নের উত্তর দিক।”
“দেশটাকে কতটা ভালোবাসেন?”
“পতাকাকে নয়, মানুষকে।”
“স্লোগানকে নয়, সংবিধানকে।”
“ক্ষমতাকে নয়, স্বাধীনতাকে।”
মাইক আবার তারস্বরে।
‘চক দে ইন্ডিয়া...’
রাজুকে শেষবারের মতো ডাকল অনুপ,
“রাজু! মাইকটা কমা!”
রাজু বলল,
“দাদা, কমছে না!”
শঙ্কর মৃদু হেসে বলল,
“এই তো! মাইক কমছে না। শব্দও কমছে না। দেশপ্রেমের সার্টিফিকেটও কমছে না।”
চঞ্চল বলল,
“কিন্তু মানুষের প্রশ্নগুলো?”
ইতু উত্তর দিল,
“সেগুলোই তো কমানো হচ্ছে।”
চায়ের দোকানের সামনে আবার বাইকের শব্দ। গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা কয়েকজন ছেলেকে পতাকা হাতে যেতে দেখা গেল।
মাইক তখনও চেঁচাচ্ছে।
‘চক দে চক দে ইন্ডিয়া...’
আর সেই শব্দের ভিতরেই যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটা:
দেশপ্রেম কি পতাকা হাতে দাঁড়ানোর নাম, নাকি সেই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির স্বাধীনতা রক্ষা করার নাম?
পতাকা হাতে দাঁড়ানো সহজ।
একজন ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কঠিন।
একজন ভীত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আরও কঠিন।
আর ক্ষমতাবানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা?
সেটাই স্বাধীনতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
আর মাথা খাটিয়ে প্রশ্ন করাই যদি ‘দিমাগি নকশাল’ হয়, তা হলে স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে জরুরি নাগরিক গুণটির নামই দাঁড়ায়:
স্বাধীন চিন্তা।
মাইক আবার তারস্বরে উঠল।
‘মেরা রং দে বাসন্তী...’
রাজুকে আরও একবার ডাকতেই হল।
“রাজু! এবার সত্যি কমা!”
দূর থেকে উত্তর এল,
“দাদা, আমার হাতে নেই!”
অনুপ বলল,
“এই তো! স্বাধীনতার আসল ছবি। মাইক কার হাতে, সেটা কেউ জানে না। কিন্তু শব্দটা সবার মাথার ভিতর ঢুকছে।”
Comments :0