Huge Gap in GDP Claims

ভারতের তথাকথিত উন্নয়নে বিস্তর ফাঁক

সম্পাদকীয় বিভাগ

দেবাশিস মিথিয়া
ভারতের প্রাক্তন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কৌশিক বসু সম্প্রতি এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন— ‘‘গত ছয় সপ্তাহ ধরে আমি দিল্লিতে আছি এবং ভারতের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করছি। আমার মূল্যায়ন: অর্থনীতির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। বেকারত্ব আকাশছোঁয়া, শিক্ষাব্যবস্থা বিশৃঙ্খল, আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের প্রতি আস্থা কমেছে, নিট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) শূন্যের কাছাকাছি, দূষণ রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে অথচ কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেই।’’ এর ঠিক উলটো দিকে সরকার লাগাতার প্রচার করে চলেছে— দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ‘হুহু’ করে হচ্ছে, জিডিপি বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের ওপরে। এমনকী দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ঘোষণা করেছেন যে ভারত এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রকৃত উন্নয়ন যদি এতখানিই হয়ে থাকে, তবে কেন আজও দেশে বেকারত্বের হার এত বেশি? বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের মতো গুরুত্বপূর্ণ তালিকায় ভারতের স্থান কেনই বা এত নিচে? দেশের জনগণের একটি বড় অংশকে আজও দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের জন্য কেন সংগ্রাম করতে হচ্ছে? স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে আজও কেন অন্নদাতা কৃষকদের আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়?
একদিকে উন্নয়নের গালভরা পরিসংখ্যান, অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষের জীবনযন্ত্রণা— দুইয়ের বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, সরকার যে উন্নয়নের কথা বলছে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। মিথ্যে পরিসংখ্যান দিয়ে জিডিপি’র হারকে বাড়িয়ে দেখানো সহজ, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবিকার সঙ্কটকে মোকাবিলা করা কঠিন। 
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ হা-জুন চ্যাং ভারতের এই উন্নয়নকে ‘পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ’ বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি ভারতের এই অর্থনৈতিক পথচলাকে ‘অসম্পূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ’ বলেছেন। তাঁর মতে, ভারত শিল্পায়নের অপরিহার্য ধাপগুলো যথাযথভাবে অতিক্রম না করেই এক অতি-দ্রুত পুঁজিবাদী উন্নয়ন মডেলকে অনুসরণ করছে। যাকে অর্থনীতিতে ‘স্পিডরানিংক্যাপিটালিজম (এসআরসি)’ বলা যেতে পারে। তাঁর কথায়, শক্তিশালী শিল্পভিত্তি তৈরি না করেই ভারত সরাসরি পরিষেবা খাতে ঝাঁপ দিয়েছে। তবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিধিনিষেধের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পনীতির ধারাবাহিক ব্যর্থতাই ভারতকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিয়েছে, যা সরকার ঘোষিত তথাকথিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোকে সামনে এনে দিয়েছে। এটা ভারতের জন্য কেবল বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং বিপজ্জনক।
ভিডিও গেমে গেমাররা যেমন সফটওয়্যারের সূক্ষ্ম ‘ত্রুটি’ বা ‘গ্লিচ’ ব্যবহার করে যে কোনও উপায়ে দ্রুত শেষ ধাপে পৌঁছানোর চেষ্টা করে, ঠিক তেমনই বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিনিয়োগের পথ এড়িয়ে— আর্থিক  ফাটকাবাজিকে কাজে লাগিয়ে—বৃহৎ শিল্পপতি ও কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে খুব কম সময়ে মুনাফাকে সর্বোচ্চ করার এক উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে। সহজ কথায়, মুনাফার পেছনে এক ‘শর্টকাট’ দৌড়। তবে এটি সাময়িকভাবে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়তে সাহায্য করলেও, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
অর্থাৎ, এই অর্থনৈতিক কৌশলে একটি উন্নয়নশীল দেশ চিরাচরিত শ্রম-নিবিড় উৎপাদন ক্ষেত্রকে শক্তিশালী না করেই, সরাসরি সেবা বা আর্থিক খাতের মতো পুঁজিবাদের পরবর্তী ধাপে লাফ দেয়। ১৯৯০-এর দশকের সংস্কারের পর থেকে ভারতে পরিষেবা খাতের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি (যা জিডিপিতে ৬০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে) এই এসআরসি মডেলের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। 
এই পরিষেবা-নির্ভর অগ্রগতির নেপথ্যে কাজ করছে মূলত একটি ‘এলিট-ড্রিভেন ডেভেলপমেন্ট’ মডেল। ভারতের নীতি নির্ধারকেরা বাস্তব উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে আর্থিক খাতকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, আর প্রভাবশালী শিল্পপতিরাও সময়সাপেক্ষ উৎপাদনশীল বিনিয়োগের বদলে শেয়ার বাজার বা আর্থিক খাতের দ্রুত লেনদেন থেকে তাৎক্ষণিক মুনাফা অর্জনে বেশি আগ্রহী। ফলে অর্থনীতির ভিত মজবুত হওয়ার বদলে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিমভাবে ফোলানো এক অর্থনীতি, যা সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়নে কোনও ভূমিকা রাখতে পারছে না। 
উন্নয়ন অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যদি মূলত পরিষেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে বাধ্য। দেশের দারিদ্র দূরীকরণের জন্য অর্থনীতিতে এমন একটি খাত প্রয়োজন যা কৃষি থেকে আসা বিপুল সংখ্যক স্বল্প-দক্ষ শ্রমিককে কাজে লাগাতে পারে। ইতিহাস বলে, কেবল শ্রম-নিবিড় শিল্পই এই কাজটি করে এসেছে। কিন্তু ‘এসআরসি’ মডেলের উচ্চমানের পরিষেবাগুলো অত্যন্ত উৎপাদনশীল হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কার্যকরী নয়। 
উন্নয়ন অর্থনীতির সফল ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দ্রুত শিল্পায়িত দেশগুলো (যেমন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন) তাদের উন্নয়নের সময় জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অবদান ২৮ থেকে ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। এর ঠিক উলটো মেরুতে ভারতের ম্যানুফ্যাকচারিং খাত, যা কখনোই জিডিপিতে ২০ শতাংশের বেশি অবদান রাখতে পারেনি এবং বর্তমানে তা মাত্র ১২.৫ থেকে ১৭ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। শক্ত শিল্পভিত্তি তৈরি না করে ভারতের এই ঝড়ের গতিতে পরিষেবা খাতের দিকে ঝুঁকে পড়াই হলো ‘স্পিডরানিং ক্যাপিটালিজম’-এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
এই কাঠামোগত দুর্বলতার সরাসরি ফল হলো শিক্ষিত বেকারত্বের হার দ্রুত বেড়ে যাওয়া। ভারতে শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্বের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উন্নয়ন অর্থনীতির প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে অর্থনীতি শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করলেও, তাদের কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। সহজ কথায়, দেশ শিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু উৎপাদন খাতে তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই বৈসাদৃশ্য স্পষ্ট হয়। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ২৯.১শতাংশ, যা নিরক্ষরদের (৩.৪শতাংশ) তুলনায় নয় গুণেরও বেশি। ২০২৩-২৪ সালে মাধ্যমিক ও তার উপরের স্তরের শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৬.৫শতাংশ, যেখানে নিরক্ষরদের জন্য তা ছিল মাত্র ০.২শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়—দেশের আসল সম্পদ, শিক্ষিত তরুণদের কোনও কাজেই লাগানো যাচ্ছে না। কাজের সুযোগ ছাড়া জিডিপি’র এই বাড়বাড়ন্তই হলো অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির আসল ফাঁদ। 
এই পরিষেবা-নির্ভর বৃদ্ধির ধরনটাই চরম বৈষম্যমূলক, যা সমাজকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। পরিষেবা ক্ষেত্রে বেশি আয়ের ও দক্ষতা-ভিত্তিক কাজের জায়গাগুলো হাতেগোনা কয়েকটি শহরে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় কেবল মুষ্টিমেয় শিক্ষিত তরুণই এর সুবিধা পায়, আর অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, মজবুত শিল্পভিত্তি না থাকায় নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে কৃষি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষ সুযোগের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। আর এই সাধারণ মানুষের আয় না বাড়ায় দেশের ভেতরের কেনাকাটার ক্ষমতা কমছে, যা অর্থনীতির ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।
অর্থনীতির পরিভাষায় এই বৃদ্ধি ‘উল্লেখযোগ্যভাবে অসম’, যা শুধু শহুরে বাসিন্দাদের একাংশের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছে। তাই জিডিপি বাড়লেও ‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’-এ ভারতের নিম্ন অবস্থান প্রমাণ করে যে, উন্নয়নের সুফলগুলো ঝা-চকচকে শহরের ‘সার্ভিস বাবল’ বা বুদবুদ ভেদ করে গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। শিল্পায়নের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি না হওয়ায় ভারতের বৃদ্ধি বর্তমানে একটি নড়বড়ে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়ে সামাজিক অস্থিরতাকেই বেশি উসকে দিচ্ছে।
এসআরসি মডেলের অন্যতম বড় বিপদ হলো অটোমেশনের প্রতি এর অসম্ভব ঝোঁক। সাধারণত শ্রম-নিবিড় উৎপাদন শিল্প প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় পেলেও, পরিষেবা খাতের কাজগুলো অত্যন্ত দ্রুত যান্ত্রিকীকরণের শিকার হয়। আজ যখন জেনারেটিভ এআই বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ছবিকে ওলটপালট করে মানুষের কাজের জায়গাগুলো দখল করে নিচ্ছে, তখন এর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসতে চলেছে ভারতের ওপর। আমাদের দেশ মূলত কল সেন্টার বা ব্যাক অফিসের মতো যেসব নিম্ন-মূল্যের পরিষেবা নিয়ে এগচ্ছে, সেগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা দ্রুত প্রতিস্থাপিত হওয়ার মুখে। পরিষেবা খাত যদি এভাবে কর্মসংস্থান হারায়, তবে সেই বিশাল শিক্ষিত জনশক্তিকে আশ্রয় দেওয়ার মতো কোনও বিকল্প শিল্প-কাঠামো ভারতে তৈরি হয়নি। এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ভারত কেন শ্রম-নিবিড় শিল্পায়নের পথ ছেড়ে এই নড়বড়ে পরিষেবা মডেলকেই বেছে নিতে বাধ্য হলো? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতির এক গভীর নীতিগত কৌশলে—যাকে বলা হয় ‘কিকিং অ্যাওয়ে দ্য ল্যাডার’।
মূলত ‘কিকিং অ্যাওয়ে দ্য ল্যাডার’ বা ‘উন্নয়নের মই সরিয়ে দেওয়া’ নীতি হলো উন্নত দেশগুলোর এক ধরনের কৌশলগত অবস্থান। আজকের ধনী দেশগুলো যখন নিজেদের শিল্প গড়ার প্রক্রিয়ায় ছিল, তখন তারা চড়া শুল্ক চাপিয়ে বিদেশি পণ্য আটকেছিল এবং নিজেদের কারখানায় ঢেলে সরকারি সাহায্য দিয়েছিল। কিন্তু উন্নতির চূড়ায় পৌঁছেই তারা সেই সাফল্যের মইটি লাথি মেরে ফেলে দিয়েছে—যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলো একই পথ ধরে ওপরে উঠতে না পারে। আজ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নানা নীতি ও আন্তর্জাতিক চুক্তির দোহাই দিয়ে আমাদের মতো দেশকে সেই একই সুরক্ষানীতি ব্যবহারে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক চাপকে দোষ দিলে আসল সত্যিটা ঢাকা পড়ে যায়; মূল দায়টা আমাদের নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক ব্যর্থতারই। বিশ্ব বাণিজ্যের কঠিন নিয়মকে অজুহাত বানিয়ে তারা শিল্পভিত্তিক প্রকৃত উন্নয়নের শ্রমসাধ্য পথটি এড়িয়ে গেছেন। শক্ত ম্যানুফ্যাকচারিং ভিত গড়ার বদলে বেছে নিয়েছেন কম ঝক্কির ‘পরিষেবা মডেল’-এর শর্টকাট। তাই ভারতে পরিষেবা খাতের এই বৃদ্ধি কোনও দূরদর্শী সাফল্য নয়; বরং শিল্পায়নের আসল ব্যর্থতা ঢেকে দ্রুত জিডিপি’র চমক দেওয়ার এক নড়বড়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কৌশল মাত্র।
এই বিশ্লেষণই স্পষ্ট করে দেয়, আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির গোড়াতেই গলদ রয়েছে। এই মডেল সাময়িকভাবে জিডিপি’র বৃদ্ধি ঘটালেও, শেষ পর্যন্ত তা বেকারত্ব, তীব্র সামাজিক বৈষম্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তির ঝুঁকির সামনে অসহায়। এই বিভ্রান্তিকর পথ থেকে বেরিয়ে আসাই এখন প্রাথমিক কাজ।
উন্নয়নের এই পরিসংখ্যানভিত্তিক শর্টকাট পথ ছেড়ে একটি সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কেবল জিডিপি বাড়ানো নয়, কর্মসংস্থান তৈরিকেই অর্থনীতির মূল অগ্রাধিকার দিতে হবে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ বা ‘পিএলআই’-এর মতো উদ্যোগগুলোকে শুধু উৎপাদন বাড়ানের কাজে না লাগিয়ে, যে ক্ষেত্রগুলোতে বেশি মানুষের কাজ হয়—সেই শ্রম-নিবিড় শিল্প ও ছোট-মাঝারি উদ্যোগগুলোর (এমএসএমই) সাথে সরাসরি যুক্ত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, যুবসমাজকে শুধু ডিগ্রি নির্ভর না করে শিল্পের চাহিদামতো দক্ষ ও কর্মসংস্থানমুখী করে গড়ে তুলতে হবে; পাশাপাশি বাড়াতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ। তৃতীয়ত, এআই ও অটোমেশনের যুগে কর্মীদের চাকরি বাঁচানোর জন্য দ্রুত পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি, যাতে তারা উন্নত প্রযুক্তির নতুন পেশায় যুক্ত হতে পারেন। আর চতুর্থত, বিশ্ববাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে নিজেদের নীতিগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে, যাতে প্রয়োজনে দেশীয় উদীয়মান শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়।
এই নীতিগত পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারলে ভারতের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ শেষ পর্যন্ত এক বড়সড় সামাজিক সঙ্কটে পরিণত হবে। তাই কেবল দ্রুত বৃদ্ধির মোহ কাটিয়ে একটি মজবুত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দীর্ঘস্থায়ে অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করাই আগামী দিনের আসল চ্যালেঞ্জ।
শেষে যে কথাটা বলার— ভারত ‘বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি’, প্রধানমন্ত্রীর এই দাবিকে প্রশ্নচিহ্নে ফেলে দিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রীর পেশ করা পরিসংখ্যানই। সম্প্রতি সংসদের রাজ্যসভায় এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে আইএমএফ’র  পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানিয়েছেন—  নমিনাল জিডিপি’র নিরিখে ভারত কিন্তু এখনও বিশ্বের পঞ্চম স্থানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রকারান্তরে তিনি কৌশিক বসুর বক্তব্যকেই সমর্থন জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক স্বার্থে তৈরি করা পরিসংখ্যানের চমক দিয়ে সাময়িকভাবে নজর ঘোরানো সহজ, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবিকার সঙ্কট, বেকারত্বের তীব্রতা আর প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াইকে আড়াল করা কঠিন। পরিসংখ্যানের গালভরা প্রচার বন্ধ করে দেশের সাধারণ মানুষের হাতে কাজ এবং পেটে ভাত সুনিশ্চিত করাটাই হোক যেকোনও অর্থনৈতিক মডেলের শেষ কথা।

Comments :0

Login to leave a comment