Secularism and RSS

'ধর্মনিরপেক্ষতা'

সম্পাদকীয় বিভাগ

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত সম্প্রতি বলেছেন, আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতা একটি পশ্চিমী ধারণা, যা ভারতের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। তাঁর মতে, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি মূলত ইউরোপ বা পশ্চিমী দেশগুলোর ইতিহাস থেকে এসেছে, যেখানে রাজা এবং ধর্মীয় গুরুদের মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপ এর উৎপত্তি হয়েছিল। তিনি মনে করেন, ভারতে আধুনিক অর্থে ‘সেকুলার’বা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটির আলাদা করে প্রয়োগের প্রয়োজন নেই, কারণ ভারত জন্ম থেকেই একটি ধর্মপ্রাণ দেশ। মোহন ভাগবতের মতে, ভারতীয় দর্শন অনুযায়ী ‘ধর্ম’এবং পশ্চিমী ‘রিলিজিয়ন’এক নয়। আসলে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটা নিয়েই আরএসএস’র যত মাথাব্যথা। স্বাধীনতার পর দেশের রাষ্ট্রনায়করা সঠিকভাবেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ধারণা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। সংবিধানের মূল মর্মবস্তুই হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ধর্মনিরপেক্ষতা হলো এমন একটি নীতি বা আদর্শ যার মাধ্যমে রাষ্ট্র ধর্মীয় বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মকে আলাদা রাখা হবে। ধর্মনিরপেক্ষতার মূল বৈশিষ্ট্যই হলো ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ, রাষ্ট্র কোনও নির্দিষ্ট ধর্মকে সরকারি ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করে না। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নাগরিকরা আইনগত সমতা ভোগ করেন, আইনের চোখে সব নাগরিক সমান, ধর্মের ভিত্তিতে কোনও ভেদাভেদ করা হয় না। প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের এবং প্রচারের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে। অন্যদিকে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা বা ধর্মবিরোধিতা নয়,বরং সব ধর্মের প্রতি সমান সম্মান প্রদর্শন করা। ধর্মনিরপেক্ষতা হলো ধর্মের সহিত সম্পর্কহীন অথবা নিরপেক্ষ থাকার অবস্থা। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ধারা থেকে সর্বদা বিচ্ছিন্ন থাকা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করা আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি ধর্মনিরপেক্ষতার এই ধারণাকেই আঘাত করতে চায়। সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ দু’টি বাদ দেওয়ার লক্ষ্যেও বিভিন্ন সময় আরএসএস’র পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে। যদিও  ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে চাইলেও এই নীতি বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সঙ্ঘ পরিবারের মূল লক্ষ্য একটি ফ্যাসিবাদী হিন্দুরাষ্ট্র কায়েমের উদ্দেশ্যে সংগঠিতভাবে মুসলমান, খ্রিস্টান সহ দেশের অহিন্দু জনসাধারণের ওপর নানাভাবে আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই কাজ করা হচ্ছে। তবে গত এক দশকের বেশি সময়ে দেশের তরুণ প্রজন্মকে ধর্মচর্চা, অন্ধবিশ্বাস-কুসংস্কারে বিশ্বাসী করে তোলা, সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদে ডুবিয়ে রাখার যে কাজ চলছিল, সেখানে হঠাৎই ব্যতিক্রম ঘটেছে। দেশজুড়ে যখন শিক্ষা, কাজ, নিয়োগের মতো বিষয়গুলি নিয়ে ছাত্র-যুবরা আন্দোলন, বিক্ষোভে শামিল হচ্ছে, সেই সময়ে তাদের ফের অন্ধ ধার্মিকতার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সংগঠিত প্রয়াস শুরু করেছে আরএসএস। সম্প্রতি দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি আন্দোলনকে ঘিরে ছাত্র-যুব আন্দোলনে উত্তাল হয়েছে দেশ। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল, শিক্ষা-কাজ বিষয়েই। সেই আন্দোলন দমনে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের পরিচিত চেষ্টাও সফল হয়নি। এই পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার উজ্জয়নে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত ‘যুবা ধর্ম সংসদ’ করেছেন। সেখানে ১৭০০ জনকে হাজির করা হয়েছে ‘জেন-জি’ বলে। সেখানেই আরএসএস প্রধান বলেছেন, ভারতের ‘ধর্ম’ আর পশ্চিমী ‘রিলিজিয়ন’ পৃথক বিষয়। তিনি ‘জেন-জি’র উদ্দেশ্যে এই বার্তা দিয়ে তাদের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধারণা থেকে দুরে থাকার উপদেশ দিয়েছেন। যদিও আরএসএস’র ‌এই আশা সফল হওয়ার নয়। বরং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সঙ্ঘ পরিবারের ধ্যানধারণাগুলি থেকে দুরে থাকার লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

Comments :0

Login to leave a comment