MUKTADHARA | UTSAV 1433 | PROBANDHA | SHABDORA | ARIJIT MITRA | 21 OCTOBER 2026 | 4th YEAR

মুক্তধারা | উৎসব ১৪৩৩ | প্রবন্ধ | শব্দেরা মরে যায় না | অরিজিৎ মিত্র | ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

MUKTADHARA  UTSAV 1433  PROBANDHA  SHABDORA  ARIJIT MITRA  21 OCTOBER 2026  4th YEAR

মুক্তধারা

উৎসব ১৪৩৩

প্রবন্ধ

শব্দেরা মরে যায় না

অরিজিৎ মিত্র 

২০ অক্টোবর ২০২৬

৪র্থ বর্ষ 

একটি বিস্মৃত শৈশবের শারদীয় উপাখ্যান

১. যে শব্দে পুজো আসতআমাদের ছোটবেলায় দুর্গাপুজো ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আসত না। পুজো আসত বাতাসে—শিউলির গন্ধে, ভোরের কাশফুলে, পাড়ার মোড়ে বাঁশের মাচা ওঠার শব্দে; আর আসত এক আশ্চর্য আওয়াজে।ঠাস!তারপর একটু বিরতি।ঠাস! ঠাস!শব্দটা খুব বড় ছিল না। অথচ আমাদের ছোট্ট পৃথিবীতে তার চেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ কোনও ঘোষণা ছিল না। সে শব্দে রাজা আসত না, যুদ্ধ জয় হতো না, আকাশ থেকে তারা খসে পড়ত না—তবু মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ যেন হঠাৎ আমাদের গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।ক্যাপ বন্দুক।একটি সামান্য খেলনা। হাতে ধরলে যার ওজনের চেয়ে স্বপ্নের ওজন বেশি ছিল; যার দাম হয়তো কয়েকটি পয়সা, অথচ যার জন্য অপেক্ষা করতে করতে একটি শিশুর কাছে আশ্বিন মাস অনন্ত দীর্ঘ হয়ে উঠত।আজ ভাবি, আমাদের শৈশবের সবচেয়ে দামি জিনিসগুলোর দাম আসলে খুব কম ছিল।একটি রঙিন ঘুড়ি। কয়েকটি মার্বেল। পুজোর নতুন জামার পকেটে লুকিয়ে রাখা দুটো টাকা। আর একটি ক্যাপ বন্দুক—যার শব্দে আমরা নিজেদের অজান্তেই ঘোষণা করতাম, পৃথিবী এখনও আমাদের বিস্মিত করতে জানে।

২. লাল বাক্সের ভিতর

আমাদের পাড়ায় হরিপদকাকার একটি ছোট্ট খেলনার দোকান ছিল। দোকান বললে অবশ্য ভুল হবে; পুরোনো বাড়ির সামনের ঘরটুকু, কাঠের তাক, কাচের আলমারি, আর দরজার মাথায় বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটি বোর্ড। তবু পুজোর আগে সেই ঘরটিই আমাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য জায়গা হয়ে উঠত।কাচের ভিতর সারি দিয়ে সাজানো থাকত প্লাস্টিকের বাঁশি, টিনের গাড়ি, রঙিন চশমা, কাগজের মুখোশ। আর একেবারে ডানদিকের তাকে থাকত আমাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি—ক্যাপ বন্দুক।তার পাশেই ছোট ছোট গোল বাক্সে সাজানো ক্যাপের ফিতে।পুজোর আগে বাবার সঙ্গে বাজারে বেরোলে আমি ইচ্ছে করেই সেই দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটতাম। বাবা বুঝতেন। তবু এমন ভান করতেন যেন কিছুই বোঝেননি।—কী রে, দাঁড়িয়ে পড়লি কেন?আমি কাচের দিকে তাকিয়ে বলতাম, “এমনি।”বাবা একটু হাসতেন।সেই হাসির অর্থ তখন বুঝিনি। আজ বুঝি, বাবা আমাদের চাওয়াগুলো চিনতেন; কিন্তু সংসারের সমস্ত চাওয়া পূরণ করা যে সম্ভব নয়, সেই অঙ্কটাও তাঁকে প্রতিদিন কষতে হতো।কোনও বছর ক্যাপ বন্দুক জুটত, কোনও বছর জুটত না। যে বছর জুটত না, সে বছরও পুজো হতো। ঢাক বাজত, ঠাকুর আসত, বন্ধুরা ডাকতে আসত। শুধু আমার বুকের ভিতর কোথাও একটি ছোট্ট অভিমান বসে থাকত।আর যে বছর বন্দুকটি পেতাম, সেদিন মনে হতো, বাবা আমাকে খেলনা দেননি—আমার সমস্ত অপেক্ষাকে দুহাতে তুলে দিয়েছেন।হরিপদকাকা বলতেন, “বাবা, খেলনা ভেঙে যায়, আনন্দটা যেন না ভাঙে।”কথাটা শুনে আমরা হাসতাম। খেলনার দোকানে দাঁড়িয়ে আনন্দের আবার ভাঙা কী!এখন বুঝি, মানুষ কখনও কখনও এমন কথা বলে যায়, যার অর্থ বুঝতে আমাদের অর্ধেক জীবন পেরিয়ে যেতে হয়।

৩. আমাদের সাম্রাজ্য

ষষ্ঠীর সকাল থেকে আমাদের রাজত্ব শুরু হতো।আমরা ছিলাম পাঁচ বন্ধু—আমি, বাপ্পা, নীল, সুমন আর টুকাই। আমাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব পরিচয় ছিল। কারও বন্দুকের রং নীল, কারও কালো, কারও আবার পুজোর আগেই ভেঙে যাওয়া পুরোনো খেলনা নতুন করে জোড়া লাগানো।আমাদের কোনও রাজ্যপাট ছিল না, তবু আমরা রাজা ছিলাম। কোনও সেনাবাহিনী ছিল না, তবু আমাদের সৈন্যদল ছিল। কোনও দুর্গ ছিল না, তবু পাড়ার গলিগুলোই ছিল আমাদের দুর্গম সীমান্ত।এক গলি থেকে অন্য গলিতে ছুটে বেড়াতাম। মাঝে মাঝে প্রতিযোগিতা হতো, কার বন্দুকের শব্দ সবচেয়ে জোরে শোনা যায়। ক্যাপ ফুরিয়ে গেলে কারও মন খারাপ হতো, কেউ নিজের শেষ ফিতেটুকু বন্ধুকে দিয়ে দিত। আবার একটু পরেই সব অভিমান উধাও।সেই বয়সে বন্ধুত্বের কোনও সংজ্ঞা ছিল না। ছিল না হিসেব, ছিল না প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খাতা। যার কাছে বেশি ক্যাপ, তারই যে বেশি আনন্দ, এমনও নয়। বরং যার হাতে কিছুই নেই, তার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই যেন খেলাটার আসল মজা ছিল।বিকেলের দিকে মায়েরা বারান্দা থেকে ডাকতেন।“বাড়ি আয়! সন্ধে হয়ে গেল!”আমরা বলতাম, “আর একটু!”সেই ‘আর একটু’ কথাটার মধ্যে কতটা শৈশব জমা ছিল, তা আজ আর মাপতে পারি না। বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল, অথচ বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করত না। সন্ধে নামত, আলো জ্বলত, প্যান্ডেল থেকে গান ভেসে আসত—আর আমরা মনে মনে ঠিক করতাম, কাল আরও আগে বেরোব।আমাদের তখন জানা ছিল না, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোকে সুন্দর বলে চিনতে পারা যায় না। তারা চলে যাওয়ার পরই কেবল তাদের মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৪. যে বিকেলে শব্দ থেমে গেল

তারপর একদিন বড় হয়ে গেলাম।বড় হয়ে যাওয়া কোনও নির্দিষ্ট ঘটনা নয়। কেউ একদিন এসে বলে না, আজ থেকে তোমার শৈশব শেষ। কোনও ঘণ্টা বাজে না, কোনও দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হয় না। শুধু একদিন দেখবে, যে গলিতে পাঁচজন মিলে ছুটতে, সেখানে এখন তোমার হাঁটার সময় নেই। যে বন্ধুর জন্য বিকেল গুনতে, তার ফোন নম্বরটাও আর মনে পড়ে না। যে খেলনাটির জন্য সারাবছর অপেক্ষা করতে, দোকানের কাচে তার জায়গায় অন্য কিছু এসে গেছে।আমাদেরও তাই হলো।বাপ্পার বাবা বদলি হয়ে চলে গেলেন অন্য শহরে। নীল পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সুমনের নতুন বন্ধু হলো। টুকাইয়ের হাতে এল নতুন ধরনের খেলনা। আর আমি—আমি শুধু একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম।প্রথমে ক্যাপ বন্দুক কম কিনতাম। তারপর আর কিনতাম না। একসময় দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও চোখ তুলতাম না।তখন মনে হতো, এ তো স্বাভাবিক। সবকিছুরই তো একটা সময় আছেকিন্তু কিছু জিনিসের সময় শেষ হয় না। শুধু আমাদের জীবনে তাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গাটা ছোট হয়ে আসে। তারপর একদিন আমরা নিজেরাই ভুলে যাই, সেই জায়গাটা একসময় কতখানি ছিল।বহু বছর পরে এক শরতে পাড়ায় ফিরে আমি প্রথম বুঝলাম, আমাদের গলির নীরবতা আসলে শব্দের অভাব নয়; সে আমাদের অনুপস্থিতির শব্দ।

৫. হরিপদকাকার দোকানে শেষবার

সেবার পুজোর ছুটিতে বাড়ি ফিরেছিলাম অনেক দিন পরে। শহর বদলে গেছে। নতুন আলো, নতুন দোকান, নতুন মুখ। প্যান্ডেলের উচ্চতা বেড়েছে, মণ্ডপের সাজে এসেছে বিস্ময়কর কারুকার্য। মানুষের হাতে মোবাইল, চোখে ছবি তোলার ব্যস্ততা।সবকিছু আছে। শুধু সেই ছোট্ট দোকানটির সামনে এসে আমার পা থেমে গেল।হরিপদকাকার দোকান এখনও আছে। তবে কাচের আলমারির রং উঠে গেছে, কাঠের তাকে ধুলো জমেছে। দরজার কাছে বসে থাকা মানুষটিকে প্রথমে চিনতে পারিনি। চুল প্রায় সাদা, চোখের কোণে বয়সের রেখা। আমাকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।তারপর বললেন, “তুই কি অরিন্দম?”বহু বছর পরে নিজের নামটি সেই পুরোনো স্বরে শুনে কেমন যেন লাগল।“হ্যাঁ, কাকু। চিনতে পেরেছেন?”তিনি হেসে বললেন, “তোদের ভুলব কী করে? পুজোর আগে তোরা দোকানের সামনে এসে এমন দাঁড়িয়ে থাকতিস, মনে হতো ক্যাপ বন্দুকগুলো বুঝি তোদেরই জন্য অপেক্ষা করছে।”আমি হাসলাম। তারপর না ভেবেই জিজ্ঞেস করলাম, “কাকু, এখন আর ক্যাপ বন্দুক রাখেন না?”হরিপদকাকা দোকানের ভিতরের দিকে তাকালেন।“রাখব কেন বল? এখন আর কেউ চায় না। নতুন জিনিস এসেছে। বাচ্চাদের পছন্দ বদলেছে। আমিও আর আগের মতো মাল তুলি না।”কথাগুলো খুব সাধারণ। অথচ সেগুলো শুনে মনে হলো, আমার ভিতরের কোথাও একটি পুরোনো দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।কিছুক্ষণ পরে তিনি নিচের তাকে হাত ঢুকিয়ে একটি ছোট্ট বাক্স বের করলেন। লাল রং একেবারে ফিকে হয়ে এসেছে। ঢাকনার কোণে ধুলো।“এই দেখ।”বাক্সটি খুলতেই আমার বুকের ভিতর কী যেন কেঁপে উঠল।কয়েকটি পুরোনো ক্যাপের ফিতে। আর তার পাশে একটি ছোট্ট ক্যাপ বন্দুক।আমি সেটিকে হাতে নিলাম। খেলনাটি খুব হালকা। এত হালকা যে একসময় যার জন্য এত আবেগ ছিল, তাকে হাতে নিয়ে বিশ্বাসই হচ্ছিল না।“এগুলো এখনও রেখে দিয়েছেন?”হরিপদকাকা মৃদু স্বরে বললেন, “ফেলে দিতে পারিনি। ভাবতাম, কোনও দিন হয়তো কেউ এসে চাইবে।”আমি কিছু বললাম না।বাইরে তখন পুজোর আলো জ্বলছিল। ঢাক বাজছিল দূরে। আর দোকানের ভিতরে, একটি পুরোনো বাক্সের পাশে, দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

৬. নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন

ঠিক সেই সময় দোকানে এল একটি ছোট্ট ছেলে। তার হাতে আধুনিক একটি খেলনা। কৌতূহলী চোখে সে আমার হাতে থাকা বন্দুকটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাকু, ওটা কী?”আমি উত্তর দেওয়ার আগে হরিপদকাকার দিকে তাকালাম।তিনি বললেন, “ওটা একসময় খুব চলত। পুজোর সময় সবাই কিনত।”ছেলেটি আরও কাছে এগিয়ে এল।“ওটা দিয়ে কী করতে হয়?”আমি বললাম, “ওটা ছিল আমাদের ছোটবেলার খেলনা। পুজোর দিনগুলোতে বন্ধুরা একসঙ্গে বেরোতাম। হাতে থাকত এই বন্দুক, আর মনে হতো আমরা যেন একটা বিরাট অভিযানে বেরিয়েছি।”ছেলেটি কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “তোমরা শুধু এটা নিয়েই খেলতে?”প্রশ্নটা শুনে আমার হাসি পেল। আবার কেমন একটা কষ্টও হলো।কী করে বোঝাই তাকে—আমরা শুধু খেলতাম না, আমরা একসঙ্গে বড় হতাম। একটা খেলনাকে কেন্দ্র করে আমাদের বন্ধুত্বের কত গল্প তৈরি হতো। কে কার জন্য অপেক্ষা করল, কে নিজের শেষ ক্যাপটা বন্ধুকে দিল, কে বাড়ি থেকে বকুনি খেয়ে আবার গলিতে ফিরে এল—এসবই ছিল আমাদের খেলাটার অংশ।খেলনাটি ছিল সামান্য। কিন্তু সেই সামান্য জিনিসকে ঘিরে আমাদের পৃথিবীটা ছিল বিশাল।ছেলেটি আবার জিজ্ঞেস করল, “এখনও কি এটা পাওয়া যায়?”হরিপদকাকা উত্তর দিলেন না।আমিও না।দোকানের বাইরে তখন ঢাকের তালে তালে মানুষ হাঁটছে। পুজো এগিয়ে চলেছে তার সমস্ত জাঁকজমক নিয়ে। অথচ সেই ছোট্ট প্রশ্নটি আমাদের দুজনকে যেন অন্য এক সময়ে নিয়ে গিয়েছিল।যে সময়ে ফিরে যাওয়ার কোনও রাস্তা নেই।

৭. শব্দের ওপারে

সেদিন অষ্টমীর রাতে বাড়ি ফিরে পুরোনো আলমারিটা খুলেছিলাম। বহু দিনের অব্যবহারে দরজার কবজা শব্দ করল। ভিতরে স্কুলের খাতা, কিছু পুরোনো ছবি, কয়েকটি চিঠি। একেবারে নিচে একটি ছোট্ট টিনের বাক্স।খুলতেই দেখলাম, তার মধ্যে পড়ে আছে আমার শৈশবের একটি পুরোনো ক্যাপ বন্দুক।কবে রেখেছিলাম, মনে নেই।সম্ভবত কোনও এক পুজোর শেষে। হয়তো ভেবেছিলাম, পরের বছর আবার খেলব। শিশুরা তো জানে না, কিছু কিছু ‘পরের বছর’ একদিন চিরকালের জন্য অতীত হয়ে যায়।বন্দুকটি হাতে নিয়ে জানালার পাশে বসলাম। বাইরে পূর্ণিমার কাছাকাছি চাঁদ, দূরে মণ্ডপের আলো। ঢাকের শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে। শহর উৎসবে মগ্ন।আমি খেলনাটিকে দেখছিলাম।একদিন এই ছোট্ট জিনিসটির জন্য আমার কী ব্যাকুলতা ছিল! এর শব্দে কী অপরিসীম আনন্দ পেতাম! অথচ আজ এত বছর পর তাকে হাতে নিয়ে কোনও শব্দ শুনতে পাচ্ছি না। শুধু মনে পড়ছে সেইসব মুখ, যাদের সঙ্গে এই খেলনাটির সম্পর্ক ছিল।বাপ্পা। নীল। সুমন। টুকাই।কোথায় তারা এখন? কে জানে, তাদের কারও পুরোনো আলমারিতেও এমন একটি খেলনা পড়ে আছে কি না। কেউ কোনও পুজোর রাতে হঠাৎ সেটিকে হাতে তুলে নিয়ে আমাদের কথা ভাবে কি না।জীবন আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। বড় হওয়ার গর্ব, নিজের পরিচয়, নতুন দায়িত্ব, নতুন পৃথিবী। তবু কোথাও যেন একটি ছোট্ট ঘর রয়ে গেছে—যার দরজা আমরা নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছি। সেই ঘরের ভিতর এখনও কয়েকটি শিশু দৌড়ে বেড়ায়। তাদের পায়ে ধুলো, চোখে বিস্ময়, হাতে ক্যাপ বন্দুক।তারা জানে না, পৃথিবী একদিন তাদের বড় করে দেবে।তারা জানে না, একদিন তাদের কাছে সময় থাকবে না।তারা জানে না, যে খেলনাটিকে তারা সামান্য মনে করে, বহু বছর পরে সেটিই তাদের কাছে হয়ে উঠবে একটি সম্পূর্ণ যুগের স্মারক।আমি বন্দুকটিকে আবার বাক্সে রেখে দিলাম।তারপর অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে রইলাম।বাইরে ঢাক বাজছিল।কিন্তু আমার কানে ভেসে আসছিল অন্য এক শব্দ।ঠাস!একটু বিরতি।ঠাস! ঠাস!শব্দটি বাস্তবে ছিল না। তবু সে আমার ভিতরে বেজে চলেছিল—অবিরাম, অনন্ত।

৮. শেষ ক্যাপের শব্দ

পরদিন নবমীর সকালে আবার হরিপদকাকার দোকানে গেলাম। লাল বাক্সটি তখনও তাকের উপর রাখা। আমি তাঁকে বললাম, “কাকু, বাক্সটা আমাকে দেবেন?তিনি অবাক হয়ে তাকালেন।“কী করবি ওটা দিয়ে?”আমি একটু হেসে বললাম, “রেখে দেব। যাতে কোনও দিন ভুলে না যাই।”হরিপদকাকা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বাক্সটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, “ভালো করে রাখিস। জিনিসটা পুরোনো হয়েছে, কিন্তু এর সঙ্গে তোদের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে।”বাক্সটি নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম।সামনে পুজোর ভিড়। শিশুদের হাসি, ঢাকের আওয়াজ, আলোর ঝলকানি। পৃথিবী তার নিজের মতো সুন্দর। কোনও কিছুই থেমে নেই।শুধু আমি জানি, আমার জীবনের একটি ছোট্ট সময় চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে।তবু তাকে হারিয়ে যেতে দেব না। কারণ স্মৃতি মানে অতীতকে ফিরিয়ে আনা নয়; স্মৃতি মানে অতীতের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা। যে দিনগুলো আমাদের আনন্দ করতে শিখিয়েছে, যে বন্ধুত্ব আমাদের ভাগ করে নিতে শিখিয়েছে, যে সামান্য খেলনা আমাদের অপেক্ষার মূল্য বুঝিয়েছে—তাদের ভুলে যাওয়া মানে নিজেদেরই এক অংশকে অস্বীকার করা।আজকের শিশুরা হয়তো ক্যাপ বন্দুক চিনবে না। তারা অন্য খেলনা নিয়ে বড় হবে, অন্য স্বপ্ন দেখবে। এটাই সময়ের নিয়ম। নতুনের জন্য জায়গা তৈরি করতে পুরোনোকে সরে দাঁড়াতেই হয়।তবু আমি চাই, কোনও এক শরতের বিকেলে তারা যেন জানতে পারে—একসময় এমন একটি খেলনা ছিল, যার শব্দে একটি পাড়া আনন্দে ভরে উঠত। এমন কিছু শিশু ছিল, যাদের কাছে কয়েকটি কাগজের ক্যাপও ছিল উৎসবের সম্পদ। এমন কিছু বাবা ছিলেন, যাঁরা নিজেদের সামর্থ্যের ভিতর থেকে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করতেন। এমন কিছু দোকান ছিল, যেখানে খেলনা বিক্রি হতো ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে বিনামূল্যে দেওয়া হতো অসংখ্য শৈশবের স্মৃতি।বাড়ি ফিরে লাল বাক্সটি আলমারির ভিতর রাখলাম। জানি, আর কোনও দিন হয়তো সেটি বাজবে না। তবু তার নীরবতার মধ্যে আমি শুনতে পাব আমার ছোটবেলার সমস্ত উল্লাস।কারণ সময় খেলনাকে পুরোনো করে, দোকানকে ফাঁকা করে, বন্ধুদের দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু যে আনন্দ একদিন সত্যি ছিল, তাকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়ার ক্ষমতা সময়েরও নেই।দুর্গাপুজো প্রতি বছর ফিরে আসে। আলো ফিরে আসে, ঢাক ফিরে আসে, শিউলি ঝরে পড়ে আবার। শুধু আমাদের শৈশব ফিরে আসে না। সে থেকে যায় স্মৃতির এক নির্জন উঠোনে, যেখানে আজও কয়েকটি শিশু ছুটে বেড়ায়, আর তাদের হাতে একটি ছোট্ট বন্দুক।সেখানে কোনও বহুতল ওঠেনি। কোনও গলি হারিয়ে যায়নি। হরিপদকাকার দোকানের কাচে এখনও ঝুলছে সেই পুরোনো খেলনাগুলো। আর পাঁচ বন্ধু, যারা বাস্তবের পৃথিবীতে কত দূরে ছড়িয়ে পড়েছে, তারা আজও একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।ঠাস!তারপর একটু বিরতি।ঠাস! ঠাস!শব্দেরা মরে যায় না। তারা শুধু একদিন কানে শোনা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর বেঁচে থাকে মানুষের ভিতরে—কোনও পুরোনো বাক্সে, কোনও বিস্মৃত বিকেলে, কিংবা দুর্গাপুজোর রাতে হঠাৎ ফিরে পাওয়া এক টুকরো শৈশবে।আর আমরা, যারা একদিন সেই শব্দে বড় হয়েছিলাম, তারা জানি—কিছু খেলনা হারিয়ে যায়, কিছু পুজো পেরিয়ে যায়, কিছু বন্ধুত্ব সময়ের ভিড়ে দূরে সরে যায়। তবু একটি ছোট্ট শব্দ, যদি একদিন সত্যি আনন্দ দিয়ে থাকে, তবে সে কোনও দিন সম্পূর্ণ নীরব হয় না।সে বেজে চলে।আমাদের ভিতরে।আমাদের ফেলে আসা শৈশবের ভিতরে।চিরকাল।

দশম শ্রেণী
কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা কল্যাণনগর খড়দহ 

Comments :0

Login to leave a comment