নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
নতুন বারান্দা
যা রে! যা রে উড়ে যা রে পাখি!!!
কৃশানু ভট্টাচার্য্য
২১ অক্টোবর ২০২৬
৪র্থ বর্ষ
আজ সকাল থেকেই প্রীতিসাদের বাড়িতে সবার মুখ ভার। পুজোর ছুটি কাটিয়ে কাকা চলে গেছে ব্যাঙ্গালোর। সকালেও ঘুম থেকে ওঠার আগেই এক প্রস্থ কান্নাকাটি হয়ে গেছে। সেই কারণেই পুজোর অন্যদিনের মতো বাড়ির পরিবেশটা নয়। ইতিমধ্যেই ঠাকুমা আর মা দেবী বরণের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। নতুন সিঁদুর , আলতা, ধান , দুর্বা, মিষ্টি এ সমস্ত নিয়ে আলোচনা চলছে জমজমাট।
কাজেই গল্প করার মত লোক বাড়িতে কেউ নেই। কি কাজ করা যায়? বসার ঘরে টিভি চালিয়ে টিভি দেখা ছাড়া আর তো কিছু করার নেই। হঠাৎ সেখানেই দেখাতে শুরু হল শোভাবাজার রাজবাড়ি থেকে নীলকন্ঠ পাখি ওড়ানো হয়েছে।
আরে এ তো খুব অদ্ভুত ব্যাপার! দুর্গা দশমীর দিনে পাখি ওড়াচ্ছে! ঠাকুমার কাছে জিজ্ঞেস করতে গিয়েই জবাব এলো ঐ পাখিটা নাকি কৈলাসে গিয়ে মা দুর্গার বাড়ি ফেরার খবর পৌঁছে দেবে দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে। এবারে প্রীতিসা ভাবতে বসলো। এখান থেকে কৈলাসে দূরত্ব কত? পাখিটার সেখানে যেতে কতটা সময় লাগবে। আর ওর যতদূর জানা আছে মা দুর্গা তে জলে ভাসিয়ে দেওয়া পরেই মা দুর্গা গুপী গাইন বাঘা বাইন এর মত কৈলাসে পৌঁছে যাবেন। তার আগে পাখিটা ওখানে পৌঁছতে পারবে তো? বলাই বাহুল্য মা কিংবা ঠাকুমাকে এই জাতীয় প্রশ্ন করলে কানমোলা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না। অতএব দুপুর বেলায় বাবার আশা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো।
মন্ডপ থেকে বাবা ফিরে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রীতিসা হাজির প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে। "আচ্ছা, নীলকন্ঠ পাখির ব্যাপারটা কি বলতো? এখান থেকে সকাল দশটায় যদি পাখিটাকে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে পাখিটা কৈলাস পাহাড়ে কখন পৌছবে? আর মা দুর্গাকে যদি সন্ধ্যে আটটা সাড়ে আটটার সময় বিসর্জন দিয়ে দেওয়া হয়, মা দুর্গা তো সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পৌঁছে যাবেন। পাখি কি তার আগে ওখানে পৌঁছতে পারবে?"
প্রশ্ন শুনে বাবার আক্কেল গুরুম। ছোটবেলায় এসি নাগের অংক বইয়ের সমস্ত অংক খুব সহজে সমাধান করার জন্য বাবার একটা নাম ডাকছিল বন্ধু মহলে। কিন্তু এই যে একেবারে ভূগোলের অঙ্ক! কিন্তু নারাজ মেয়ের সামনে বাবার নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে ঠাকুমা মুখে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে রান্নাঘরে চলে গেলেন।
অনেক ভেবে বাবা বললেন, "আরে এগুলো হচ্ছে পুরনো প্রথা। এখানে এসব তোর ঐ সময় গতির অংকের প্রশ্নই ওঠে না। দেবাদিদেব মহাদেবের গায়ের রং নীল। ওই যে তোকে বলেছিলাম না সমুদ্র মন্থনের পর বিষ পান করে মহাদেবের গলা নীল হয়ে গেছিল। আর ওই নীল রং কেই সামনে রেখে এই নীলকন্ঠ পাখিকে মহাদেবের দূত বলে মনে করা হয়। তবে রামায়ণে নাকি আছে রাবণ বধের আগে রামচন্দ্র নাকি এই পাখি দেখতে পেয়েছিলেন। আর সেই কারণেই এই নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে দেবার একটা প্রথা রয়েছে।"
" আচ্ছা বাবা, এই পাখির আসল নাম কি? আর একে নীলকন্ঠই বা বলে কেন?"
" শোন এর নাম হল ইন্ডিয়ান রোলার। পালকের রং এবং তার উপর আলোর বিচ্ছুরণের জন্য একে উজ্জ্বল নীল কিংবা নীলচে বেগুনি দেখতে মনে হয়। আর সেই কারণেই একে নীলকন্ঠ বলা হয়। কিন্তু আসলে এটা একটা বন্য পাখি। বলতেই পারিস এই পাখিটা এখন খুব দুষ্প্রাপ্য।"
বিষয়টা কিছুটা পরিষ্কার হলেও সবটা তার কাছে পরিষ্কার হলো না। তাহলে এই পাখির সঙ্গে এরকম একটা গল্প কি করে চলে এলো এটা বুঝতে প্রীতিসার একটু সমস্যাই হচ্ছিল। তবু আপাতত বাবার বেশ কিছু জরুরী কাজ এসে যাওয়ায় এটা নিয়ে আলোচনাটা এগোনো গেলো না।
তবে এই পাখির গল্প শুনতে শুনতে প্রীতিসার মনে একটা প্রশ্ন এসে হাজির। প্রশ্নটা হল, আমাদের চারপাশে পাখি এতো দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছে কেন? এর জন্য কি আমরাই দায়ী? আমরা কি পারি আমাদের চারপাশে পাখিদের সংখ্যা বাড়াতে?
Comments :0