চারদিনের দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে সাতদিন আগে থেকে রাজ্য রাজনীতিকে সরগরম করে রেখেছিল তৃণমূলের প্রচারবাহিনী ও তাদের সহযোগী সংবাদমাধ্যম। দিল্লিতে পৌঁছে চলে নাটকের পর নাটক। কখনো আটপৌরে পোশাক, কখনো কালো চাদর মুড়ি দিয়ে রাজধানীর রাজপথে বিস্তর রঙ্গ তামাশা দেখিয়েছেন। কখন কি কাণ্ড ঘটান, কি ভাষণ দেন, তা নিয়ে রীতিমতো তটস্থ ছিল দিল্লির সাংবাদিকমহল।
কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী দিল্লি গেলেন কেন? তাও এসআইআর’র একেবারে শেষ পর্বে? এক সময় প্রতিদিন হুঙ্কার দিতেন বাংলায় তিনি বেঁচে থাকতে এসআইআর করতে দেবেন না। বাস্তবে এখানে এসআইআর হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সীমাহীন হয়রানি, দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক এবং নির্যাতনের মধ্যদিয়ে দিব্যি এগিয়েছে। বহু মানুষের মৃত্যু ও যন্ত্রণা তিনি কমাতে পারেননি। প্রতিদিন নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণের পর আক্রমণ করেছেন। নির্বাচন কমিশনও নিজেদের মতো করে এসআইআর চালিয়ে গেছে। এখন যখন খসড়া তালিকা প্রকাশের পর লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে ১.৩৬ কোটি ও আনস্যাপড বলে ৩২ লক্ষকে নোটিস পাঠানো হয়েছে এবং শুনানি পর্বও প্রায় শেষের মুখে তখন তিনি দিল্লি গেলেন নির্বাচন কমিশনে অভিযান করতে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন করলেন এক গুচ্ছ দাবি জানিয়ে। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বিশেষ কোনও সুবিধা করতে না পেরে বাইরে এসে বিস্তর গালমন্দ করলেন। উদ্ধত, মিথ্যাবাদী ইত্যাদি কতকি বললেন। সংবাদমাধ্যমে, সমাজমাধ্যমে প্রচারের ঝড় উঠলো। নেত্রীর দম আছে। নির্বাচন কমিশনকে শাঁসাচ্ছেন, হুমকি দিচ্ছেন।
অতঃপর সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে নিজের দাখিল করা মামলায় নিজেই সওয়াল করলেন। মিডিয়ায় ধন্য ধন্য রব উঠলো। ভাবা যায় একজন মুখ্যমন্ত্রী সর্বোচ্চ আদালতে সওয়াল করছেন। দেখারজন্য ভিড় জমে যায় কৌতূহলী লোকের। অভিনতা-অভিনেত্রী তথা সেলিব্রিটিদের দেখার জন্য যেমন ভিড় হয় অনেকটা তেমন।
আদালতে তিনি আরজি জানিয়েছেন যাতে ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী ভোট হয়, নামের ভুলের জন্য নোটিস না পাঠানো ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কোনও দাবিই আপাতত আদায় হয়নি। আদালত কেন পরবর্তী একটি শুনানির তারিখ ধার্য করেছে মাত্র। যখন পরবর্তী শুনানি হবে তখন কার্যত ভোটারদের শুনানি শেষ হয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময় ঘনিয়ে আসবে। অর্থাৎ কোনও দাবিই কার্যত আদায় হবার সুযোগ থাকবে না। তাহলে মুখ্যমন্ত্রী দলবল নিয় সাড়ম্বরে দিল্লি অভিযানে গেলেন কেন? তিনি কি জানতেন না শেষ মুহূর্তে গিয়ে কোনও কাজই হবে না।
তাহলে মমতা জানেন তাঁর দৌড় কত দূর। এসআইআর নিয়ে তার আদৌ কোনও মাথাব্যথা নেই। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য যেভাবেই হোক ভোটে জেতা। তাই তিনি চান মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট ভোটারদের নাম থাকুক। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন পুরানো লিস্টে ভোট হোক। এসআইআর হোক ভোটের পর। কার নাম বাদ গেল, কত নাম বাদ গেল, কত লোকের হয়রানি হলো, যন্ত্রণায় জেরবার হলো মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সেটা বড় কথা নয়। মুখ্যমন্ত্রী মানুষের দুর্ভোগ, যন্ত্রণা, হয়রানি ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফয়দা তুলতে। আর বিভাজনের রাজনীতিকে আরও তীব্র করতে।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে ও সর্বোচ্চ আদালতে হম্বিতম্বি, চমক-নাটক করে প্রচারের আলোয় ঝলমল করছেন। কিন্তু আসলে প্রাপ্তিযোগ শূন্য। তিনি ভোটের আগে নিজের ভাবমূর্তিকে একটু উজ্জ্বল করতে চেয়েছিলেন। তার জন্য ব্যবহার করেছেন দিল্লির মঞ্চকে। রাজ্যের জন্য, রাজ্যের মানুষের জন্য শূন্য হাতে ফিরলেও নিজের প্রচারটা তো হলো।
Editorial
দিল্লির লাড্ডু
×
Comments :0