Falta By-election 2026

ফলতা পুনর্নির্বাচন: আপদ গিয়েছে, নতুন বিপদের শঙ্কা ঘিরছে জায়েদা বিবিদের

রাজ্য

সিপিআই(এম) প্রার্থী শম্ভু কুর্মী পৌঁছালে তাঁকে ঘিরে গ্রামবাসীদের ভিড়।

সুদীপ্ত বসু: ফলতা
হালিমা বিবির চোখে জল। কোলে আড়াই বছরের নাতি। পরনে রং উঠে যাওয়া ধূসর শাড়ি। খালি পায়েই কোলে নাতি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এলেন। ‘কতদিন পরে লাল পার্টির মিছিল এসেছে গ্রামে, দেখবো না? কতদিন পরে এবার ভোট দেবো আমরা, লাল পার্টিকে তো গ্রামে আসতেই দিতো না ওই দানবটা’।
ছোট্ট কথোপকথন। ততক্ষণে লাল ঝান্ডা দিয়ে সাজানো টোটো করে গ্রামে এসেছেন ফলতার সিপিআই(এম) প্রার্থী শম্ভু কুর্মি সহ পার্টিকর্মীরা। ফলতার চালুয়াড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের চণ্ডীগড়ের মসজিদ পাড়া। ২০১৬’র পর থেকে এখানে লাল ঝান্ডার প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল তৎকালীন শাসক। দীর্ঘদিন পরে গ্রামে মাইকে সিপিআই(এম)’র প্রচার শুনে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন মহিলারা। ঘিরে ধরেছেন সিপিআই(এম) প্রার্থীকে। ‘এতদিন পরে যখন এসেছেন তখন দুটো কথা বলুন মাইকে’, আরজি গ্রামবাসীদের। 
মসজিদ পাড়ার পুকুর পাড়ের সামনে তখন ভিড়। ওই ভিড়ের মধ্যেই সিপিআই(এম) কর্মীদের কাছ থেকে পোস্টার নিয়ে নিজেদের বাড়ির দরজার সামনে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিলেন রজনী বিবি। বাড়িতে লাগালেন সিপিআই(এম)র পোস্টার, ভয় লাগছে না? রজনী বিবি বলে উঠলেন, ‘ভয় কেটে গেছে এখানকার লোকজনের। ওদের (তৃণমূল) লোকজনকে আর তো দেখতে পাচ্ছি না। এবার অন্তত ভোট দিতে পারবো, লাস্ট তিনটে ভোটে তো বুথে যেতে পারিনি’।  
পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে বছর পঁচিশের ইমারুল মোল্লা হাসিমুখে বলছিলেন, ‘জাহাঙ্গীর বাহিনীর দাপটে এখানে এভাবে একসঙ্গে আমরা দাঁড়িয়ে কথা বলতেও পারতাম না। যে যেখানে ভোট দিক কিন্তু বুথে তো যেতে পারবো এবার’। জাহাঙ্গীর কোথায়, মিডিয়ার এই প্রশ্নও এখন ফলতার মানুষের কাছে অপ্রাসঙ্গিক!
আবার এই বাস্তবতাই কী একমাত্র দস্তুর? ফলতার বেলিয়াডাঙা, চণ্ডীগড়, গোপালপুর, কাঁটাখালি , হরিণডাঙা বলছে অন্য কথাও। ভয় ভাঙার মাটিতেই জন্ম নিচ্ছে আশঙ্কাও।  
ইমারুল, পাশে দাঁড়ানো মিজানুর সবাই দর্জির কাজ করেন। ঘরেই সেলাইয়ের কাজ। তার জন্যও তোলা দিতে হতো জাহাঙ্গীর বাহিনীকে। সিপিআই(এম) প্রার্থীকে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাত মেলানো নারকেলডাঙার যুবক আজিজুল শেখ বলছিলেন, ‘বিশ্বাস করুন নিজের আঙুল দিয়ে যে ইভিএমে ভোট দিতে পারবো তা ভাবতে পারিনি আমরা এখানে। বুথে যেতে পারতাম না। জানের ভোট শেষের পরে বিকালে তৃণমূলের লোকজন এসে হাতে কালি লাগিয়ে দিয়ে যেত। আর এবার? পরিবেশ তো ভালো। ভোট দেবে সবাই। তবে কেন জানি মনে হচ্ছে যারা এতদিন ভোট দিতে দিতো না তারাই আবার পদ্মফুলের হয়ে একই রকম ভয় দেখাবে না তো পরে?’ 
একই সঙ্গে আবার গ্রামেরই গৃহবধূ সায়রা বিবি, জায়দা বিবি একযোগেই বললেন, ‘তৃণমূল গেছে, আপদ বিদায় হয়েছে।  কিন্তু যারা এসেছে তারা তো আসার ক’দিনের মধ্যে বলছে কুরবানি হবে না! এটা নিয়ে আমরা অন্য ভয় পাচ্ছি। কোনদিকেই শান্তি নেই আমাদের।’ প্রৌঢ়া জায়েদা বিবি বলে উঠলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাবো আমরা। আমাদেরও তো মুখ্যমন্ত্রী উনি। জাহাঙ্গীর বাহিনীর সন্ত্রাসের শিকার তো এখানকার মানুষও। এখন শান্তি চাই কিন্তু এমন সব বলা হচ্ছে যেন আমরা ভারতীয় নই’। প্রত্যন্ত এলাকার এক গৃহবধুর এই আশঙ্কা কি নবান্ন পর্যন্ত পৌঁছাবে? তার ওপর অনেকটা নির্ভর করতে এই রাজ্যের ভবিষ্যতের অগ্রগতি। 
তোলবাজি, হুমকি, ভোট লুট আর সন্ত্রাসের ডায়মন্ডহারবার মডেল ভেঙে পড়েছে তাসের ঘরের মতো মাত্র এক সপ্তাহেই। বদলে গিয়েছে গ্রামের চেহারা, এটা বাস্তব। যে ফলতা থেকে দু’বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে অভিষেক ব্যানার্জির ১ লক্ষ ২০ হাজারের বেশি ‘লিড’ নিয়েছিলেন সেই ফলতায় ২৮৩টা বুথে তৃণমূল কটা এজেন্ট বসাতে পারবে তা তা বলতে কর গুণতে হচ্ছে। খাস বেলসিংহ গ্রামে, অভিষেকের স্নেহধন্য জাহাঙ্গীর খাসতালুকে দাঁড়িয়েই শনিবার ভরদুপুরে এক তৃণমূল কর্মীর সটান উত্তর, ‘আরে সব পঞ্চায়েত প্রধানরা নিজেরাই পালিয়ে গেছে। এত চুরি করেছে। আমরা কিন্তু পালাইনি। আর ভোট হবে কী কে? ২৮৩ বুথের মধ্যে আট-দশটা বুথে পোলিং এজেন্ট বসানোর লোক নেই আমাদের’। 
এটা বাস্তব গত প্রায় দশ বছর ধরে মধ্যযুগীয় বর্বরতার সাক্ষী থাকা সন্ত্রাসের এই ভূখণ্ডে তৃণমূলী দাপট কার্যত শেষ। অবরুদ্ধ ফলতায় মানুষের ঘৃণার মুখে তৃণমূল। ২০১৬’র সালের পর থেকে এমন একটা ভোটও হয়নি যেখানে তৃণমূলী অনুমতি ব্যতীত কোনও মানুষ বুথের লাইনে দাঁড়াতে পেরেছে? ইভিএমে বিরোধী সব প্রার্থীদের বোতামে সেলোটেপ লাগিয়ে দেওয়া, তৃণমূলের বোতামে আতর লাগিয়ে রাখা থেকে শুরু করে বুথ দখল, গণনাকেন্দ্র দখল সব কিছুই সাক্ষী ফলতা। গোটা রাজ্যের একমাত্র বিধানসভা যেখানে পঞ্চায়েতে কোন স্তরে কোনও বিরোধী দল নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দিতে পারিনি, আস্ত বিধানসভার সব পঞ্চায়েতে আসন বিনা ভোটে জিতেছে তৎকালীন শাসক। 
গত ২৯ এপ্রিল এখানে একাধিক বুথে ইভিএম কারচুপির অভিযোগ ওঠে। তার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ মে গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে নতুন করে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে কমিশন। সেই ২৯ এপ্রিলের ভোটের প্রচারে ২৮৩ বুথের মধ্যে মাত্র পাঁচটা বুথে সিপিআই(এম) প্রচার করতে পেরেছিল, বাকি জায়গায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। দেওয়াল লেখা তো দূর অস্ত। সেই ফলতায় আজকেই তৃণমূলের পতাকা খুঁজে পেতে গেলে পরিশ্রম করতে হবে। ফতেপুর থেকে হরিণডাঙা, উড়ছে লালপতাকা। 
এই বাস্তবতার মাঝেও আশঙ্কা কেন দেখা দিচ্ছে গোপালপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে? মূলত মুসলিম প্রধান গ্রাম। সেই গ্রামেই গত দু’দিন তৃণমূলের পতাকা বদলে গিয়েছে গেরুয়া পতাকায়। পাড়ায় পাড়ায় বিজেপি’র পতাকা। শুধু তাই নয়, গতকাল রাতেও এই গ্রামে টাঙানো সিপিআই(এম)’র সব পতাকা খুলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কারা করল? দু’দিনেই জার্সি বদলে সেই তৃণমূলই কি নিয়ন্ত্রক হয়ে যাচ্ছে গ্রামে? উঠছে প্রশ্ন। 
তৃণমূলী সন্ত্রাসে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ঘরছাড়া থাকা, সিপিআই(এম) প্রার্থী শম্ভু কুর্মির কথায়, ‘সব ইস্যুকে ছাপিয়ে একটাই দাবি আগে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে হবে ফলতায়। মানুষের আকাঙ্ক্ষা তাই। ফলতায় কাজের আকাল। ফ্রি ট্রেড জোন থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে সব কারখানা।’ পার্টি নেতা প্রভাত চৌধুরির কথায়, ‘তৃণমূল ফলতায় যে সন্ত্রাসের কারবার চালিয়েছে তা শেষ হয়েছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করলেও বাস্তবতা হলো একাধিক জায়গায় তৃণমূলের সেই দুর্বত্তরা গেরুয়া পতাকা হাতে তুলে নিচ্ছে। আক্রমণের লক্ষ্য সেই বামপন্থীরাই।’ 
এদিন সকালে যখন চালুয়াড়ি পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত এলাকায় সিপিআই(এম) প্রার্থীকে প্রচার চলছে, তখন সেখানে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে মহিলাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। সকলের একই সুর, ভোট দিতে চাই এবার, এতদিন দিতে পারিনি। সেই ভিড়ের মাঝেই নাগমা খাতুন তাঁর বোনকে সঙ্গে নিয় এসে বলছিলেন, ‘এখানে প্রাথমিক স্কুলগুলি বন্ধ। লেখাপড়ার সুযোগ নেই আমাদের। স্কুলগুলিকে বাঁচাতে বলুন, মুসলিম পরিবারের মেয়েরা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না’।

Comments :0

Login to leave a comment