Farmers Protest

অধিকার আদায়ে কাঁচা চা পাতা ফেলে উত্তরবঙ্গের কৃষকদের পথ অবরোধ

জেলা

উত্তরের ‘সবুজ সোনা’ আজ চাষির চোখের জলে ভিজছে। হাড়ভাঙা খাটুনির পর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নেই, বদলে জুটেছে পাহাড়-প্রমাণ বঞ্চনা। এই বঞ্চনার প্রতিবাদে এবং অধিকার আদায়ের দাবিতে বুধবার সরাসরি পথ অবরোধে নামলেন উত্তরবঙ্গের কয়েকশো ক্ষুদ্র চা চাষি। ডুয়ার্স থেকে তরাই— সর্বত্রই আন্দোলনের আঁচ। বুধবার সকাল থেকেই জলপাইগুড়ি জেলার লাইফ-লাইন বলে পরিচিত ময়নাগুড়িতে যান চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুদ্র চা চাষিরা অভিযোগ করে আসছেন যে, বড় চা বাগান বা 'বটলিফ' কারখানাগুলি তাঁদের উৎপাদিত কাঁচা পাতার সঠিক দাম দিচ্ছে না। চাষিদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়ায় এদিন তাঁরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। সার, তেল এবং শ্রমিকের মজুরি হু-হু করে বাড়লেও কাঁচা পাতার দাম রাখা হয়েছে নামমাত্র। অভিযোগ, বটলিফ কারখানাগুলির মালিকরা একজোট হয়ে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করেছে।  একদিকে টি-বোর্ড, অন্যদিকে রাজ্য বা কেন্দ্র— কোনো পক্ষই ক্ষুদ্র চা চাষিদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের।
বিক্ষুব্ধ চাষি সাদ্দাম হোসেনের গলায় ঝরে পড়ল একরাশ ক্ষোভ। তিনি বলেন, "আমরা রক্ত জল করে চা ফলাই, অথচ আমাদের পাতার দাম নির্ধারণ করে অন্যরা। সব খরচ মেটানোর পর হাতে কিছুই থাকছে না। পেটের তাগিদেই আজ আমরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছি।"
ময়নাগুড়ির পানবাড়ি বাজার এলাকা এদিন কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। রামশাই চা পাতা ব্যবসায়ী সমিতি এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র চা চাষিদের যৌথ উদ্যোগে ময়নাগুড়ি-রামশাই সড়ক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়। ক্ষুদ্র চা চাষি নরেন্দ্র নাথ রায়ের অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি জানান, সকালে যখন বাগান থেকে পাতা তোলা হয়, তখন দাম থাকে প্রতি কেজি ২০-২৫ টাকা। কিন্তু সেই পাতা ফ্যাক্টরিতে পৌঁছালেই সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দাম কমিয়ে ৫-১০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কারখানা মালিকদের এই 'খেয়ালখুশি'র প্রতিবাদে এদিন রাস্তার ওপর বস্তা বস্তা কাঁচা চা পাতা ফেলে দিয়ে বিক্ষোভ দেখান চাষিরা। বিক্ষুব্ধ চাষি শিবেন রায়ের প্রশ্ন, "সকালে যে পাতার দাম ২৫ টাকা, বিকেলে তা ৫ টাকা হয় কী করে? ফ্যাক্টরি মালিকরা আমাদের পরিশ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।"
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এই ক্ষুদ্র চা শিল্প আজ গভীর সংকটে। কয়েক লক্ষ মানুষ এই পেশার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এই স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে সারা ভারত কৃষক সভা। সংগঠনের জলপাইগুড়ি জেলা কমিটির সদস্য ও ক্ষুদ্র চা চাষি খরেন্দ্র নাথ রায় বলেন, "অনেক শিক্ষিত যুবক  অন্য ব্যবসায় সুবিধা করতে না পেরে আশায় বুক বেঁধে চা বাগান করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে কাঁচা পাতার দাম ৮ টাকায় নেমে আসায় তাঁরা চরম সংকটে পড়েছেন। চাষিরা সার ও কীটনাশকের দোকানের পাশাপাশি পাতা ব্যাবসায়ীদের  কাছেও লক্ষাধিক টাকা দেনায় ডুবে আছেন।"
কৃষক সভার অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা টি-বোর্ড এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করছে। তারা কোনো ফ্যাক্টরিতে তদন্ত করছে না বা গুণমান অনুযায়ী সঠিক দাম নির্ধারণের ব্যবস্থা করছে না। টি-বোর্ড কার্যত নিজেদের দায়িত্ব কারখানা মালিকদের হাতে তুলে দিয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। খরেন্দ্র বাবু সাফ জানান, আগামী দিনে এই লড়াইকে ১ নম্বর দাবিতে পরিণত করে তাঁরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন।
যদিও পুলিশ ও প্রশাসনের আশ্বাসে কয়েক ঘণ্টা পর অবরোধ ওঠে, কিন্তু চাষিদের হুঁশিয়ারি স্পষ্ট— শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে চিঁড়ে ভিজবে না। স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলবে। প্রয়োজনে আগামী দিনে আরও জঙ্গি আন্দোলনের পথে হাঁটবেন উত্তরবঙ্গের অন্নদাতারা।

Comments :0

Login to leave a comment