Corporate Job Post Retirement

অবসর নিয়েই কর্পোরেটে মোটা মাইনের চাকরি নিচ্ছেন মোদী সরকারের শীর্ষ কর্তারা

জাতীয়

 শাসক দল ও কর্পোরেট যোগসাজশে লাগামছাড়া দুর্নীতির বহু খবর প্রকাশ হয়েছে। তার সঙ্গে সরকারি প্রশাসনের শীর্ষে থাকা বহু সরকারি আধিকারিকের তাতে জড়িয়ে পড়ার নানা খবর সামনে এসেছে। কিন্তু যে খবর সামনে আসেনি, তা হলো সরকারি প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে থাকা আধিকারিকরা কীভাবে চাকরি থেকে অবসরের পরপরই সেই সব কর্পোরেটের শীর্ষ স্থানে নিযুক্ত হয়েছেন। কেউ কেউ নিয়োগ পেয়ে বিদেশে কর্পোরেট দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। সরকারি প্রশাসনের দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিকদের অবসরের পর তাঁদের ঢালাও কর্পোরেটের শীর্ষ পদে নিয়োগে কি স্বার্থের সংঘাত কাজ করছে না? কর্পোরেটের শীর্ষ পদের চাকরিতে যোগ দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিকদের নামের দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করে এই মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ।
তিনি তালিকা প্রকাশ করে এক এক্স পোস্টে বলেন, অবসরপ্রাপ্ত সিভিসি প্রধান, সিএজি প্রধান, স্টেট ব্যাঙ্কের প্রধান, রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থার প্রধান, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরাও কর্পোরেট রিলায়েন্স ও আদানির সংস্থায় যোগ দিয়েছেন—যাঁরা প্রশাসনের কর্পোরেট নানা বেনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন। সেই দায়িত্ব পালন করে তাঁরা অবসরের পর সেই অভিযুক্ত কর্পোরেটের চাকরিতে নিযুক্ত হচ্ছেন। তাঁর প্রশ্ন, এটা কি স্বার্থের সংঘাত নয়? যা কার্যত দুর্নীতি নয় কি? এই জাতীয় নিয়োগ নিষিদ্ধ করা উচিত নয়?
এদিকে দেখা গেছে, মোদীর আমলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে কর্পোরেট ঋণের নামে জালিয়াতিতে বিপুল টাকা লোপাটের ঘটনায় সাড়াজাগানো আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শীর্ষ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে বেনিয়মের নানা অভিযোগ ওঠে। তার কোনও ফয়সালা হয়নি; তবে অনেকে অবসরের পর কর্পোরেট সংস্থার শীর্ষ পদে যোগ দিয়েছেন। প্রশান্ত ভূষণ রিলায়েন্স এবং আদানি গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়া প্রধানদের পৃথক তালিকা প্রকাশ করেছেন।
যেমন, সরকারি শীর্ষ পদের চাকরি থেকে অবসর নিয়েই রিলায়েন্সের নানা শীর্ষ পদে চাকরি পেয়েছেন অরুন্ধতী ভট্টাচার্য। তিনি স্টেট ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ছিলেন; ২০১৭ সালে স্টেট ব্যাঙ্ক থেকে অবসরের পর ২০১৮ সালে রিলায়েন্সের বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের সদস্য হন। সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের চেয়ারম্যান এবং পরে সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্সের দায়িত্বে থাকা জে ভি চৌধুরি অবসরের পর ২০১৯ সালে রিলায়েন্সের বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের সদস্য হিসাবে নিযুক্ত হন। রিলায়েন্স পেট্রোলিয়াম শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ভারত পেট্রোলিয়ামের চেয়ারম্যান সার্থক বেহুরা অবসরের পর রিলায়েন্সে পরামর্শদাতার চাকরি করছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েলের চেয়ারম্যান সঞ্জীব সিং অবসরের দুই মাস বাদে ২০২০ সালে রিলায়েন্স গোষ্ঠীর প্রেসিডেন্ট পদে চাকরিতে যোগ দেন। প্রভাত সিং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা গেইল’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর ২০২০ সালে রিলায়েন্স-বিপি সংস্থায় চাকরিতে যোগ দেন। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা সাধারণ বিমা নিগমের চেয়ারম্যান ডি সেনগুপ্ত অবসর নেওয়ার পর ২০০৫ সালে রিলায়েন্সে যোগ দেন। স্টেট ব্যাঙ্কের আরেক চেয়ারম্যান এ কে পুরওয়ার ২০০৬ সালে অবসর নেওয়ার পর রিলায়েন্স কমিউনিকেশন্সে যোগ দেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণ মুরারী অবসর নেওয়ার পর ২০২৩ সালে রিলায়েন্সের 'বনতারা' কাউন্সিলে সদস্য পদে যোগ দেন। রাজীব মহর্ষি সিএজি প্রধানের পদ থেকে অবসরের পর ২০২৩ সালে রিলায়েন্স জিও ফাইন্যান্সের ডিরেক্টর পদে যোগ দেন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নর এম কে জৈন ২০২৩ সালে অবসর নিয়ে রিলায়েন্সের পরামর্শদাতা পদের চাকরিতে যোগ দেন।
অন্যদিকে কর্পোরেট আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শেয়ার জালিয়াতি সহ বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা ঘটনা থাকলেও, তাদের সংস্থায় চাকরি থেকে অবসর নিয়ে যোগ দিয়েছেন বহু শীর্ষ আধিকারিক। প্রশান্ত ভূষণের তালিকায় তাঁদের নাম এসেছে। যেমন, আইএএস অফিসার ভি সুব্রহ্মণিয়ম সরকারের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন; তিনি অবসর নিয়ে আদানির পুনর্নবীকরণ শিল্পে ২০১৬ সালে যোগ দেন। গুজরাট সরকারের আইএএস অফিসার বিজয়লক্ষ্মী যোশী অবসর গ্রহণের পর ২০১৬ সালে আদানির কোম্পানিতে যোগ দেন। ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান নরেন্দ্র মেয়ারপাডি অবসর নিয়ে ২০১৪ সালে আদানির কোম্পানিতে যোগ দেন। আইআরএস অফিসার এম ভি ভানুমতী ২০২৪ সালে অবসর গ্রহণের পর আদানি পোর্টের ডিরেক্টর পদে চাকরিতে যোগ দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিশ্বস্ত জি কে পিল্লাই স্বরাষ্ট্র সচিব পদে অবসরের পর আদানি পোর্টের ডিরেক্টরের চাকরি করেছেন। শশী শঙ্কর ওএনজিসি’র চেয়ারম্যান পদে অবসর নিয়ে ২০২২ সালে আদানি টোটাল গ্যাস কোম্পানির ডিরেক্টর পদে যোগ দেন। আইএএস উপেন্দ্র কুমার সিনহা সেবি’র দায়িত্বে ছিলেন; অবসর নেওয়ার পর আদানি কোম্পানিতে যোগ দেন। আদানির মিডিয়া সংস্থা এনডিটিভি’র চেয়ারম্যান পদে তাঁকে পরে নিয়োগ করে আদানি গোষ্ঠী। উল্লেখ্য, আদানির শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হওয়ার সময় তিনি কেন্দ্র থেকে সেবির দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় সেবি আদানি গোষ্ঠীকে শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় ‘ক্লিন চিট’ দেয়।

Comments :0

Login to leave a comment