পরিবর্তন মানে কেবল রঙ পরিবর্তন না। পরিবর্তন মানে ভাঙচুর না। পরিবর্তন মানে জনতার জীবন জীবিকা, গণতান্ত্রিক অধিকার, ন্যায়ের অধিকার। তার পক্ষে লড়াই জারি রাখবে বামপন্থীরা।
শুক্রবার যাদবপুরের জনসভায় এই লক্ষ্য জানিয়েছেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তিনি বলেছেন যে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বুলডোজার-রাজ এনে আইনের শাসনকে ভাঙা হচ্ছে। আমরা আইনের শাসন চাই। বুলডোজার রাজকে প্রতিহত করতে প্রতিবাদে শামিল থাকবে সিপিআই(এম)।
শহীদ কমরেড মৃত্যুঞ্জয় সেনের স্মৃতিতে হয় এই জনসভা। সভাপতিত্ব করেছেন সিপিআই(এম) নেতা উৎপল দত্ত। বক্তব্য রাখেন সিপিআই(এম) কলকাতা জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার, রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ সেনগুপ্ত, ছাত্র আন্দোলনের প্রাক্তন সর্বভারতীয় নেত্রী দীপ্সিতা ধর, আইনজীবী এবং প্রাক্তন সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্য।
এদিন জনসভার মাঝেই প্রবল বৃষ্টি নামে। কিন্তু তার মধ্যেই চলেছে সভা।
সেলিম চীনের উদাহরণ দিয়ে বলেন প্রকৃত পরিবর্তনের মানে কী। তিনি বলেছেন, আজকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দলবল নিয়ে নিয়ে চীনে যেতে হচ্ছে। সমঝোতায় বসতে হচ্ছে। চীন উদাহরণ। সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে একটা দেশ কিভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
সেলিম বলেন, পেট্রোল-ডিজেল, সিএনজি’র দাম বাড়িয়েছে। ভোটের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিল বিজেপি। ওরা যে কোনও সঙ্কটকে সর্বদা জনতার ওপর চাপিয়ে দিতে চায়।
তিনি বলেন, ইরানের ওপর আমেরিকা-ইজরায়েলের আগ্রাসন গোটা বিশ্বে জ্বালানি সংকট এনেছে। আমরা যুদ্ধের বিরোধিতা করি। আমাদের দালাল বলে আক্রমণ করা হয়। কিন্তু বিরোধিতা করি কারণ যুদ্ধ আসলে সাধারণ মানুষের সঙ্কট ডেকে আনে। আর কিছু মানুষের আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়।
এদিনই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আরজি কর হাসাপাতলে চিকিৎসক ছাত্রীকে ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় তিন আইপিএস আধিকারিককে সাসপেন্ড করেন। বিচারের দাবিতে আন্দোলনের সময় এই আধিকারিকদের বিরুদ্ধে বারবার তদন্ত ধামাচাপা দেওয়া এবং ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রসঙ্গে সেলিম বলেন, আজকে সাসপেন্ড করা হয়েছে আইপিএস আধিকারিকদের। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। আমরা তাই আরজি করের ঘটনার প্রকৃত বিচার চাই। প্রকৃত অপরাধীদের বের করতে হবে। সেই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
সেলিম বলেন, সত্তরের দশকে আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস হয়েছিল। শহীদ হয়েছিলেন কমরেড মৃত্যঞ্জয় সেন। মানুষের সংগ্রাম, ঐক্যের মধ্যে দিয়ে সেই আক্রমণকে পরাজিত করা হয়েছিল। তিনি বলেন, যারা মানুষের ঐক্যকে ভাঙে তারা আক্রমণকে প্রতিহত করার শক্তি হয় না। এরাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই চলবে। বুলডোজার রাজ চালিয়ে আইনের শাসনকে ভাঙা হচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যে। এরাজ্যে আমরা তার প্রতিবাদে শামিল থাকব।
সেলিম বলেন, আমরা সত্যিকারের পরিবর্তন চাই। আমরা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব চাই। সংবিধানে সামাজিক ন্যায়, গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তার পক্ষে আমাদের সংগ্রাম জারি থাকবে।
কল্লোল মজুমদার সত্তরের দশকে আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ১৩০০ সিপিআই(এম) কর্মীর শহীদ হওয়ার পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, তারপর বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে চৌত্রিশ বছরে প্রায় চার হাজার সিপিআই(এম) কর্মীকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।
মজুমদার বলেন, পশ্চিমবঙ্গে যাদের শক্তি বরাবর কম ছিল তাদের এখানে জল-মাটি দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের বরাবর অবস্থান থেকেছে। জাত দু’টি- খেটে খাওয়া আর মেরে খাওয়া। ধর্ম, জাতের বিভাজন কোনও সমাজকে এগিয়ে নিতে পারবে না। তিনি বলেন, পেট্রোল-ডিজেলের দাম বা রেশন সঙ্কটে হিন্দুরা ছাড় পান না। বামপন্থীদের ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির প্রতিবাদ করতে হয়েছে। মমতা যখন হিজাব পরে ইমাম ভাতা চালু করছিলেন আবার জগন্নাথ মন্দির নিয়ে প্রচার করলেন ততক্ষণে আরএসএস’র শাখা ব্যাপক সংখ্যায় বেড়েছে। আরএসএস কারা? এরা আসলে একচেটিয়া পুঁজি, বড় ব্যবসার স্বার্থরক্ষার শক্তি। শোষিত মানুষের সংগ্রামকে বিভাজিত করে।
বিকাশ ভট্টাচার্য বলেন, সংবিধানে ব্যক্তি মানুষের মর্যাদা, সম্মানের স্বীকৃতি রয়েছে। গণতন্ত্রের মানে নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্র সুরক্ষিত করবে। বিভিন্ন সময়েই তা আক্রান্ত হয়েছে। এই নির্বাচন মানুষ পরিবর্তন চেয়েছেন। এবার সরকারের পরীক্ষা। এরা আসীন হয়ে বুলডোজার নিয়ে এসেছে। অবৈধ নির্মাণ নিশ্চয় কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে আছে। অতীতে আদালতের রায়ে বেআইনি নির্মণ ভাঙতে যাওয়ার সময় তৎকালীন বিরোধী নেত্রী আটকে গিয়েছিলেন। আজকে বেআইনি নির্মাণ ভাঙার কথা বলে একটি নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। এই সরকার শুরু করলেন সেই পদক্ষেপ নিয়ে।
সুদীপ সেনগুপ্ত বলেন, তৃণমূল চুরি করেছে, তৃণমূল তোলাবাজ, কোনও সন্দেহ নেই। মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ খড়কুটোর মতো বিজেপি-কে ধরেছেন। কিন্তু মানুষকে যারা ধর্মের ভিত্তিতে, জাতের ভিত্তিতে, বর্ণের ভিত্তিতে ভাগ করে তারা খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে না।
দীপ্সিতা ধর তৃণমূল সরকারের সময়ে বামপন্থী এবং সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণের তীব্র নিন্দা করেন। সেই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন যে ২০১১ সালের আগে দাঙ্গা হতো না রাজ্যে। আর তৃণমূলের সময়ে নিয়মিত দাঙ্গা হয়েছে। বিজেপি চেহারা তুলে ধরে তিনি বলেন, পদকজয়ী কুস্তিগররা যাঁরা বিরুদ্ধে রাস্তায় বসে আন্দোলনে নামলেন সেই ব্রিজভূষণ শরণ সিং বিজেপি’র সাংসদ। দীপ্সিতা বলেন, এরাজ্যে বিজেপি আসীন হয়েছে। জনবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়াই করবে বামপন্থীরা।
Comments :0