গল্প
মুক্তধারা
-----------------------------------------------------
দিদিমা নীলিমা : এক ছায়াময়ী সেবিকা
-----------------------------------------------------
সায়ন সরকার
শহরের কোলাহলপূর্ণ এলাকায় সরকারি হাসপাতালের করিডোর দিয়ে যখন নীলিমা দেবী হেঁটে যেতেন, তখন একটি শান্ত অথচ দৃঢ় ছায়া যেন হাসপাতাল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ত। ষাটোর্ধ্ব নীলিমা, যাকে সবাই 'দিদিমা' বলেই ডাকত, ছিলেন শুধু একজন নার্স নন, তিনি ছিলেন মমতার আধার, শক্তির প্রতীক এবং অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর ২৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি অজস্র মানুষের জীবনে আলো জ্বেলেছেন।
কখনো স্নেহময়ী মা
অনেক সময় হাসপাতালের নির্জন কেবিনে, যখন নবজাতকের মা সদ্যোজাতকে নিয়ে শঙ্কিত থাকতেন, তখন নীলিমা দেবীই হয়ে উঠতেন সেই মায়ের প্রকৃত অবলম্বন। তিনি ধীরে ধীরে মাকে শেখাতেন কীভাবে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হয়, কীভাবে ওর ডায়াপার বদলাতে হয়। একবার এক গ্রাম থেকে আসা মা, যার স্বামী বিদেশে কর্মরত, সদ্য জন্ম দেওয়া যমজ সন্তানকে নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। নীলিমা দেবী নিজের হাতে তাদের যত্ন নিতেন, রাতের পর রাত জেগে তাদের দেখভাল করতেন। সেই মা হাসিমুখে বাড়ি ফেরার সময় নীলিমা দেবীর পা ছুঁয়ে বলেছিলেন, "মা, আপনি শুধু আমার সন্তানদের জীবনই বাঁচাননি, আমার মাতৃত্বকে পূর্ণতা দিয়েছেন।" নীলিমা দেবীর চোখে তখন এক ভিন্ন তৃপ্তি। তিনি যেন সেই মুহূর্তে শুধু একজন নার্স নন, একজন মা হয়ে সেই অসহায় মা ও তাঁর সন্তানদের আগলে রেখেছিলেন।
কখনো বড় বোন, কখনো পথপ্রদর্শক
তরুণ নার্সদের কাছে নীলিমা দেবী ছিলেন একজন বড় বোনের মতো। নতুন যারা কর্মজীবনে ঢুকত, তাদের হাত ধরে ধরে কাজ শেখাতেন। যখন কোনো তরুণ নার্স কাজ করতে গিয়ে ভয় পেত বা হতাশ হয়ে পড়ত, নীলিমা দেবী তাদের কাঁধে হাত রেখে বলতেন, "ভয় পেও না বোন, তোমার হাতেই তো মানুষের জীবন। একটু ধৈর্য ধরো, সব ঠিক হয়ে যাবে।" একবার এক নতুন নার্স ভুল করে এক রোগীকে ভুল ইঞ্জেকশন দিতে যাচ্ছিল, নীলিমা দেবী শেষ মুহূর্তে এসে তাকে থামিয়ে দেন। পরে শান্তভাবে বুঝিয়ে দেন সেই ভুলের গুরুত্ব এবং কীভাবে ভবিষ্যতে তা এড়ানো যাবে। তাঁর সেই সহনশীলতা ও শিক্ষাদানের ক্ষমতাই তরুণ নার্সদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগাত।
কখনো আদর্শ কন্যা
হাসপাতালেরই এক বৃদ্ধা রোগী, যার সন্তানরা বিদেশে থাকে, প্রায়শই একাকীত্বে ভুগতেন। নীলিমা দেবী তাঁর কাছে যেতেন, তাঁর কপালে হাত বুলিয়ে দিতেন, কখনো গান শোনাতেন বা গল্প করতেন। সেই বৃদ্ধা তাঁকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন। নীলিমা দেবী যখন তাঁর পাশে বসতেন, তখন সেই বৃদ্ধা যেন নিজের পরিবারকে ফিরে পেতেন। নীলিমা দেবীর এই পরিচর্যা শুধু রোগের উপশম করত না, তাঁর একাকী মনকেও শান্তি দিত। এই ভূমিকার মধ্যে দিয়ে নীলিমা দেবী শিখিয়েছিলেন যে সেবা শুধু কর্তব্য নয়, এটি এক সম্পর্কের বন্ধন।
এক অনন্য প্রভাব
নীলিমা দেবীর এই বহুমুখী সত্তা শুধু তাঁর সহকর্মী বা রোগীদের মধ্যেই নয়, গোটা নারী সমাজের উপর এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর সেবা, মমতা, ধৈর্য এবং দৃঢ়তা প্রমাণ করে যে একজন নারী চাইলে একইসাথে অসংখ্য ভূমিকায় সফল হতে পারেন। তিনি যেন নারী জাতির প্রতিচ্ছবি, যিনি একইসাথে মা, বোন এবং মেয়ের কর্তব্য পালন করে সমাজের প্রতিটি স্তরকে আলোকিত করেন। তাঁর জীবনই দেখিয়ে দেয়, একজন নারীর হাতে কতটা শক্তি, কতটা মমতা এবং কতটা পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষমতা থাকতে পারে।..........
Comments :0