যাদের শ্রমের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে বিকশিত ভারতে ইমারত রাজধানী দিল্লির আশপাশে শিল্পতালুকগুলিতে সেই শ্রমিকরা কীভাবে বেঁচে আছেন তার কিছুটা টের পাওয়া গেল নয়ডায় উত্তাল শ্রমিক বিক্ষোভ এবং তাকে দমন করার জন্য উত্তর প্রদেশের যোগী সরকারের হিংস্রতার মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ যখন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত, বাংলার মানুষের জন্য উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তখন দিল্লি লাগোয়া উত্তর প্রদেশের নয়ডা শিল্পাঞ্চলের হাজার হাজার শ্রমিক তাদের কারখানা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় বসে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। কেননা, গত দশ বছর ধরে মোদী ও যোগী সরকারের অনেক বক্তৃতা শুনেছেন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও মেলেনি। মূলত মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের সময় কমানোর দাবিকে সামনে রেখে দিল্লি সংলগ্ন হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের গুরগাঁও, ফরিদাবাদ, নয়ডা শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা অনেক দিন ধরেই ক্ষোভে ফুঁসছেন।
দিল্লির মতো অত্যন্ত ব্যয় বহুল অঞ্চলে মাত্র দশ-এগারো হাজার টাকা মজুরিতে কাজ করেন লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। এদের কেউই প্রায় কারখানার স্থায়ী শ্রমিক নন। ঠিকাদারের মাধ্যমে নিযুক্ত অস্থায়ী শ্রমিক। কাজ করতে হয় ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি। অনেক সময় সাপ্তাহিক ছুটিও মেলে না। এই দুর্মূল্যের বাজারে এই সামান্য মজুরিতে তাদের সংসার চলে না। সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কার্যত উঠে যাবার মুখে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে পারছেন না। চিকিৎসার খরচও তাদের সাধ্যের বাইরে। যে হারে জিনিসের দাম বাড়ছে তাতে তাদের দু’বেলা খাবারের সংস্থানও হয় না।
মোদী সরকার শ্রমকোড চালু করে শ্রমিকদের সংগঠিত হবার অধিকার, দাবি জানানোর ও দরকষাকষির অধিকার কেড়ে নিয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করেছে। মালিকদের স্বার্থে সরকার শ্রমকোড করে শ্রমিকদের শোষণের রাস্তা এনেছে। বিজেপি সরকারের শ্রমিকবিরোধী এবং মালিক তোষণ নীতির পরিণতিতে দিল্লির আশপাশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক চরম শোষণের শিকার। দিনের পর দিন শোষণে জর্জরিত, অত্যাচারে নিষ্পেষিত শ্রমিকদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। তাদের দমন করতে পুলিশ ব্যাপক লাঠি, জল কামান, টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেছে। গেরুয়া যোগী অস্তিত্বের সঙ্কটে বিপন্ন শ্রমিকদের বিক্ষোভকে নকশালদের উসকানি বলে নিজেদের শ্রমিকবিরোধী অবস্থানকে আড়াল করছে। দলীয় তহবিলে শত শত কোটি টাকা পাবার জন্য মালিকদের মুনাফা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেয় মোদীর সরকার।
শ্রমিকদের অবস্থা শুধু দিল্লিতে এমন নয়, গোটা দেশেই। স্থায়ী শ্রমিক নেই। সর্বত্র ঠিকা, অস্থায়ী শ্রমিক। তাদের মজুরি যৎসামান্য। ৮ ঘণ্টার জায়গায় ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। সংসার চলে না। শিক্ষা-চিকিৎসার অর্থ নেই। সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। লক্ষ কোটি শ্রমজীবী মানুষকে সীমাহীন শোষণের জাঁতাকলে পিষে বিকশিত ভারতের ভাঁওতা বিলি করছেন মোদীরা।
Editorial
বিকশিত ভারতের শ্রমিকদের হাল
×
Comments :0