শরীরের রক্ত জল করে দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনির পর জোটে যৎসামান্য পারিশ্রমিক। না আছে ন্যূনতম মজুরি, না আছে সামাজিক সুরক্ষা। ষাটোর্ধ্ব বয়সে পৌঁছালে ভবিষ্যৎ ঘোর অন্ধকার- পেনশন বা বার্ধক্যকালীন সহায়তার বালাইটুকু নেই। ফালাকাটা বিধানসভার ধনিরামপুর ১ ও ২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ৩০টি ইটভাটার হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন আজ চরম সংকটে। একদিকে শাসকদলের মদতপুষ্ট ‘সিন্ডিকেট’ রাজ, অন্যদিকে মালিকপক্ষের উদাসীনতা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এবার রুখে দাঁড়ানোর শপথ নিলেন ব্রাত্যজনেরা। বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী কমল কিশোর রায়কে কাছে পেয়ে নিজেদের দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে তাঁরা স্পষ্ট জানালেন, "আর নয় বঞ্চনা, এবার লড়াই হবে লাল ঝাণ্ডার তলে।"
ধনিরামপুরের ইটভাটাগুলোতে কান পাতলে আজ কেবল দীর্ঘশ্বাস আর বঞ্চনার কথা শোনা যায়। ধুলো, বালি আর চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়াই এখানে শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী। প্রতিনিয়ত বিষাক্ত পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের ফুসফুসে বাসা বাসা বাঁধছে মারণ রোগ। চর্মরোগ আর পেটের অসুখ তো স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ অভিযোগ, কোনো ভাটায় প্রাথমিক চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকু নেই। অসুস্থ হলে মালিকপক্ষ সাহায্যের হাত বাড়ানো তো দূর, উল্টে মুখ ফিরিয়ে নেয় বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। ইট তৈরির প্রধান উপকরণ—মাটি, বালি আর কয়লা নিয়ে চলছে ব্যাপক কারচুপি। শ্রমিকদের অভিযোগ, শাসকদলের ‘দাদাদের’ মদতপুষ্ট দালাল চক্রের মাধ্যমে চড়া দামে এসব উপকরণ কিনতে বাধ্য হন মালিকরা।
ভাটায় কাজ করা প্রবীণ শ্রমিক বিমল ওঁরাও আক্ষেপের সুরে বলেন,"তৃণমূল জমানায় আমাদের অবস্থা দাসের মতো হয়েছে। পঞ্চায়েত থেকে কোনো প্রকল্পের সুবিধা পায় না শ্রমিকরা। উল্টে মালিকপক্ষের সাথে হাত মিলিয়ে নেতারা আমাদের ন্যায্য পাওনা টুকুও কেড়ে নিচ্ছে। চড়া বাজারে এই মজুরিতে সংসার চলে না। এখন তো কাজও কমছে। আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, তাই এবার আর কোনো ভয় নেই। আমরা কাস্তে মার্কাতেই ভরসা রাখছি।" আরেক মহিলা শ্রমিক রেখা বর্মণ জানান, "কাজের জায়গায় পানীয় জল বা শৌচাগার পর্যন্ত নেই। অসুস্থ হলে ছুটি নেই, উল্টে পয়সা কাটা যায়। গত কয়েক বছরে কোনো নেতা আমাদের খোঁজ নিতে আসেনি। আজ ভোটের আগে সবাই আসছে, কিন্তু আমরা জানি বামপন্থীরাই আমাদের আসল লড়াই লড়বে।"
ধনিরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ইটভাটাগুলিতে জোরদার প্রচার চালান বামফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী কমল কিশোর রায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সিপিআই(এম)-এর আলিপুরদুয়ার জেলা কমিটির সদস্য সুনীল রায়। শ্রমিক মহল্লায় গিয়ে তাঁদের অভাব-অভিযোগ মন দিয়ে শোনেন নেতৃবৃন্দ। আগামী ২৩ তারিখ নির্বাচনে নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান কমল কিশোর রায়। তিনি শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “রাজ্যের সরকার আর কেন্দ্রের বিজেপি—দু পক্ষই শ্রমিকের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছে। একদিকে কয়লার দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় ভাটা বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ। আজ ধনিরামপুরের হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়ে পরিযায়ী হতে বাধ্য হচ্ছেন। এই ধ্বংসলীলা বন্ধ করতে হলে শ্রমিক-কৃষকের জোটবদ্ধ লড়াই দরকার। বিধানসভায় আমরা আপনাদের মজুরি, স্বাস্থ্য এবং বার্ধক্যকালীন ভাতার প্রশ্ন তুলব। লুটেরা রাজ সরিয়ে মানুষের রাজ আনতে কাস্তে মার্কায় ভোট দিন।”
Comments :0