Post editorial

ভাষার লড়াই আজও প্রাসঙ্গিক

উত্তর সম্পাদকীয়​ সম্পাদকীয় বিভাগ

সুমিত দে 


আসামের বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন ভারতে ভাষার জন্য লড়াইয়ে অন্যতম মাইল ফলক। এই আন্দোলন শিক্ষা দেয় মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় মানুষ কতটা ত্যাগ করতে প্রস্তুত। ওপার বাংলার একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদ দিবসের মতো বরাক উপত্যকার উনিশে মে'র আত্মত্যাগ বাংলাভাষী মানুষের কাছে আজও স্মরণীয়।
১৯৬০ সালে আসাম সরকার অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসাবে ঘোষণা করে। বরাক উপত্যকার তিনটি মহকুমা (বর্তমানে জেলা) কাছাড়,করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলায় সেই সময়ে বাঙালি জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। বরাক উপত্যকায় এই বিপুল পরিমাণ বাংলাভাষী মানুষের উপস্থিতির কারণ প্রাথমিকভাবে ভৌগোলিক। মণিপুর থেকে নেমে আসা বরাক নদীর আসামের প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্রের সাথে কোনও সংযোগ ছিল না। এই নদী মেশে  তদানীন্তন পূর্ব বাংলার সুরমা-কুশিয়ার সাথে। 
ফলে খুব স্বাভাবিক কারণেই ব্যবসা, কৃষি, যাতায়াত, যোগাযোগ এবং তাকে ঘিরে মানুষের মেলামেশা সবই ছিল বাংলার সাথে। ব্রিটিশরা তাদের রাজত্বকালে চা বাগানের অজুহাত দিয়ে সিলেট আর কাছাড়কে বলপূর্বক বাংলা  (তদানীন্তন বেঙ্গল) থেকে বাদ দিয়ে আসামের সাথে জুড়ে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই আসামের জনসংখ্যার মধ্যে এক বড় অংশের বাংলাভাষী যুক্ত হয়ে পড়ে। এর সাথেই দেশভাগের অনিবার্য পরিণতিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে আরও বাংলাভাষী মানুষ  উদ্বাস্তু হিসাবে চলে আসে। এছাড়াও চা বাগানের শ্রমিক হিসাবে (এরা মূলত: মালদা মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে) কয়েক লক্ষ বাঙালি এবং আসাম-বেঙ্গল রেল লাইনের কর্মসূত্রে বাঙালিরা বরাক উপত্যকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। ১৯৬১ সালে বরাক উপত্যকায় প্রায় সাড়ে ১০ লক্ষ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা আর অসমীয়া বলত মাত্র এক লক্ষ মানুষ।
রবীন্দ্রনাথের কথায়—'ভাষা মনের দরজা খোলার চাবি।' মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হলো ভাষা। ভাষা মানুষে মানুষে সম্পর্ক গড়ে তোলে। সামাজিক সম্পর্কের বুনিয়াদ হলো ভাষা। একই সাথে ভাষা চিন্তার ক্ষেত্রকে উদ্ভাবনী শক্তিতে মুহুর্মুহু রূপান্তরিত করে চলে। ইতিহাসের পথ ধরে আজকে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছে যা কিনা আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মেলবন্ধন ঘটাচ্ছে তার অন্যতম অবদান হলো ভাষা।
সমস্ত ভাষার মতো বাংলা ভাষাও আকস্মিক সৃষ্টি হয়নি। আনুমানিক প্রায় ১৫০০ বছরের অতীতের পথ ধরে, মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে ক্রমান্বয়ে অন্তর্ভুক্ত করে বাংলা ভাষা চলমান থেকেছে। সময়ের সরণিতে ভাষা বদলায় কিন্তু তার রূপ থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, কখনোই বিচ্ছিন্নমূলক নয়। প্রকৃতিতে যেমন উপ-নদী,নদী,সাগরের মিলন আর মানব সভ্যতায়  তেমন ভাষাগত মিলন অবশ্যম্ভাবী। কখনোই এই সম্পর্ক বৈরীমূলক নয়। যেহেতু ভাষা মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে, ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত— তাই  কোনও ভাষা কখনোই চাপিয়ে দিয়ে সভ্য সমাজ গড়ে তোলা যায় না। পরস্পরের মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে সহজাত ভাবেই ভাষা তার মিলন ঘটিয়ে চলে।
খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালে আর্যরা যে ভাষা নিয়ে ভারতে আসে পরবর্তীতে বৈদিক, সংস্কৃত, প্রাকৃত,বিশেষত পূর্ব ভারতে  মাগধী প্রাকৃত থেকে অপভ্রংশের মধ্য দিয়ে আদি বাংলা ভাষার জন্ম হয়। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত আধুনিক বাংলা ভাষা ক্রমান্বয়ে বিদ্যাসাগর,রবীন্দ্রনাথের অবদানে পরিশীলিত হয়ে আধুনিক বাংলা ভাষার রূপ পেয়ে চলেছে। 
অসমীয়া জাতীয়তাবাদের প্রভাবে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে অসম সাহিত্য সভা ও ছাত্র সংগঠনগুলো অসমীয়াকে একমাত্র সরকারি ভাষা করতে হবে বলে দাবি করে। ১৯৫৭ সালে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় 'অসমীয়া ভাষা বাঁচাও আন্দোলন' শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৬০ সালের ১০ই ডিসেম্বর 'Assam official language act, 1960'কার্যকর হওয়া শুরু হয়। বরাক উপত্যকার মানুষ আইনের উপর ভিত্তি করেই আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যার মধ্যে মূলত: যে ধারাটি উল্লেখ্য- 'Assamese shall be the language for all or any of the official purpose of the state of Assam'. যার ফলে সরকারি কাজ, আদালত সহ সর্বত্র অসমীয়া ভাষা ব্যবহার শুরু হয়ে যায়। অথচ জনসংখ্যার ৮০ ভাগই অসমীয়া ভাষা জানতেন না। এখান থেকেই ভাষার প্রশ্নে বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হয়। সমগ্র বরাক উপত্যকা জুড়ে ক্রমশ প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শিলচরে 'গণসংগ্রাম পরিষদ' গঠন করে দাবি ওঠে— 'আইন সংশোধন করো, না হলে সত্যাগ্রহ।' এপ্রিল মাসে ঘোষণা হয় যে উনিশে মে থেকে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে রেল রাস্তা অবরোধ হবে এবং হরতাল চলবে। হরতালের প্রথম দিনেই শিলচর স্টেশনের সত্যাগ্রহীদের ওপর গুলি চলে এবং ১১ জন ভাষার লড়াইয়ে শহীদ হন।। শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে অবরোধ চলাকালীন ঐদিন দশম শ্রেণিতে পাঠরতা মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য সহ যে ১১ জন শহীদ হয়েছিলেন তার মধ্যে শচীন্দ্রচন্দ্র পাল যিনি একজন রিকশাচালক ছিলেন, কানাইলাল নিয়োগী নামক এক রেল শ্রমিক তার কাজ শেষ হওয়ার পর সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করেন। অন্যরা কেউ ছাত্র, শ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন; যার অধিকাংশই ছিল ৩০ বছরের নিচে। স্লোগান উঠেছিল 'জান দেব,তবু জবান দেব না।'সেই সময় বরাক উপত্যকায়  ৬০ শতাংশের কিছু বেশি হিন্দু মানুষ এবং প্রায় ৩৬ শতাংশ ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। দুই সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ছিল মূলত বাংলা। তাই বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার সাথে সাথে উভয় সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন হিসাবে সামনে এসেছিল। সেই সময়ে বরাক উপত্যকার সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ২৮ শতাংশ; এতদ্‌সত্ত্বেও মানুষ ভাষার জন্য রাস্তায় নেমেছিল।
আজ থেকে ৬৬ বছর আগে শিলচর প্লাটফর্মে প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য হাতে বই নিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল তার ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায়। হাতের বই যখন তার বুকের উপর ধরা ছিল পুলিশের গুলি তার বইকে ফুটো করে বুক চিরে বেরিয়ে যায়। রক্ত দিয়ে অর্জিত মাতৃভাষার সম্মান আজও বরাক উপত্যকায় ধ্বনিত হয়ে চলেছে। তদানীন্তন যুগান্তর পত্রিকার ২১মে'র সংখ্যার শিরোনাম ছিল "শিলচরে রক্ত গঙ্গা: ১১ শহীদের আত্মবলিদান।"
কমলা ভট্টাচার্যের পরিবারের ওই দিনে লিখিত পত্রের একটি অংশ ওই সময়কে উপলব্ধি করা যাবে— "সকালে ভাত খেয়ে কমলা বলল—  'দাদা আজ স্কুল বন্ধ। হরতাল। আমি মিছিলে যাব।' মা মানা করল, বলল 'মেয়ে মানুষ গোলমেলে যাস না।' কমলা শুনল না। বলল 'মা বাংলা ভাষার জন্য না গেলে কে যাবে? আমি তো বল বই নিয়ে যাব,ঢিল মারবো না।...কমলার বইটা পাশেই আছে। রক্তে ভিজে গেছে। মলাটে লেখা— কমলা ভট্টাচার্য, ক্লাস টেন। "১৯ মে'র পর তদানীন্তন আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বলতে বাধ্য হন "A 16 year girl died with a book in her hand. That book was not a bomb. We must rethink."

বরাক উপত্যকার ১১ শহীদের আত্মহত্যাগের পর সরকার বাধ্য হয় ১৭ অক্টোবর ১৯৬১ সালে আইন সংশোধন করতে। সংশোধনে নতুন ধারা যুক্ত হয়  'provided that the Bengali language shall be used for administrative and other official purposes upto and including the district level in the district of Cachar"
প্রতিবছর ১৯ মে বরাক উপত্যাকা জুড়ে স্মরণ করা হয় ভাষা শহীদদের। শিলচর রেলওয়ে স্টেশন এখন 'ভাষা শহীদ স্টেশন' নামে পরিচিত। স্টেশনের সামনে এগারোটা শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে আজকের প্রজন্ম অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের অঙ্গীকার করে চলেছে। আজও ভাষার জন্য লড়াই নতুন নতুন আঙ্গিকে প্রাসঙ্গিক। বরাক উপত্যকার লড়াই ছিল ভাষার অধিকার বাঁচানো, আর আজ গুরুত্বপূর্ণ হলো ভাষার ব্যবহার বাঁচানোর। কর্পোরেট শিক্ষা ব্যবস্থা, ডিজিটাল দুনিয়ার আধিপত্য, উদারীকরণের দাপট, কর্মসংস্থানের সঙ্কটের কারণে কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রভাব আর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের ত্রি-ভাষা ফর্মুলাতে সুকৌশলে বিভিন্ন রাজ্যের মাতৃভাষাকে অপ্রাসঙ্গিক করার খেলা চলছে। যে সমস্ত শব্দ বাংলা ভাষায় আত্মিকৃত হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে, চর্চিত হয়েছে সেই ভাষা ব্যবহার না করতে  আরএসএস-বিজেপি ফরমান জারি করছে। শাসক শ্রেণি পুষ্ট বাইনারি রাজনীতির মোড়কে বাঙালি অস্মিতা রক্ষায় নেমে পড়েছে তার এক পক্ষ তৃণমূল কংগ্রেস ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। কোনও ভাষার সঙ্গে কোনও ভাষার বিরোধ নয়।  মাতৃভাষার অধিকার রক্ষাকে নিশ্চিত করেই মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে হবে।  মাতৃভাষাকে অপ্রাসঙ্গিক করার যে কোনও ধরনের কৌশলকে পর্যুদস্ত করে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে প্রাসঙ্গিক রাখতেই হবে একুশে ফেব্রুয়ারি ও ১৯শে মে ভাষা শহীদদের স্মরণে।
 

Comments :0

Login to leave a comment