Post Editorial

খাদের কিনারায় বাংলার স্কুল শিক্ষা

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

কমল দাশ


 সদ্য চালু হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি। স্কুল শিক্ষা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবনার অন্ত নেই। পরিকল্পনা, প্রকল্পের বহর দেখলে রবি ঠাকুরের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে হয়, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ গালভরা কত না পরিকল্পনার কথা নয়া শিক্ষানীতিতে বলা আছে। অথচ বাস্তবে তার কোনও প্রয়োগ নেই। আবার রাজ্যের সরকারি এবং সরকার পোষিত স্কুলগুলোতে  শিক্ষা নিয়ে প্রকল্পের অভাব নেই। কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রী, তরুণের স্বপ্ন, সবুজ সাথী, ওয়েসিস ইত্যাদি প্রকল্পে মোড়া গোটা স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা। অথচ সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা দেখলে আঁতকে উঠতে হয়।  বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার পরিবেশ ও পরিকাঠানো বজায় রাখার ব্যাপারে ততটাই উদাসীন রাজ্য। ফলে রাজ্যের সরকারি স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা একেবারে খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।
  সরকারি স্কুলে পড়াশোনার প্রধান অন্তরায় শিক্ষকের আকাল। ২০০৮ সালের একটি পরিসংখ্যান বলছেসরকারি স্কুলে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ছিল ৩৫:১। বর্তমানে ক্ষেত্রে বিশেষে এই অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৭০:১। সরকারি হিসাব বলছে প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল মিলিয়ে মোট ৩ লক্ষ ৯৮ হাজারেরও বেশি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী পদ শূন্য। শুধু নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে ৩৫,৭২৬টি শূন্যপদ পড়ে আছে। ২০১৬ সালে শেষবার সরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল। দুর্নীতির দায়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সেই ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরিও বাতিল হয়ে গেছে। এখনও পর্যন্ত সেই পদও পূরণ হয়নি। ফলে সরকারি স্কুলে শিক্ষকের অভাবে  স্বাভাবিক পঠনপাঠন কাজ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ স্কুল অতি সামান্য পারিশ্রমিকে আংশিক সময়ের শিক্ষক নিয়োগ করে কোনোরকমে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন।
  শিক্ষকের অভাবের মতো অর্থের অভাব সরকারি এবং সরকার পোষিত স্কুলগুলোকে পঙ্গু করে ফেলেছে। সরকারি স্কুলে আয়ের উৎস প্রধানত দুটো। ভর্তির সময় সরকার নির্ধারিত ২৪০ টাকা ছাত্র পিছু নেওয়া হয়। এই সামান্য  টাকা দিয়ে সারা বছর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপানো, খাতাপত্র কেনা, বার্ষিক ক্রিয়া প্রতিযোগিতার খরচ চালাতে হয়। দুর্মূল্যের বাজারে এই টাকা দিয়ে সব খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব হলেও পড়ুয়ার কাছ থেকে এক পয়সা বেশি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দ্বিতীয় রোজগারের উৎস হলো কম্পোজিট গ্রান্ট। স্কুল পরিচালনার জন্য রাজ্য এবং কেন্দ্র যৌথভাবে এই ফান্ড স্কুলগুলোকে দেয়। কম্পোজিট গ্রান্টের টাকা দিয়ে  চক, ডাস্টার, কাগজ, কালি, স্টেশনারি, প্রিন্টারের কালি, ইন্টারনেট বিল, শৌচাগার পরিষ্কার সহ রোজকার অন্যান্য খরচ চালায় সরকার ও সরকার পোষিত স্কুলগুলি। ২৫১ থেকে ১০০০ জন ছাত্র আছে এমন স্কুলের বছরে ৭৫০০০ হাজার টাকার গ্রান্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫ -২৬ শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের অধিকাংশ স্কুল এক তৃতীয়াংশ গ্রান্টও পায়নি। রাজ্য সরকারের অভিযোগ কেন্দ্র সর্ব শিক্ষা মিশনের বরাদ্দ দিচ্ছে না। এই অভিযোগ সত্য ধরে নিয়ে  আমাদের জিজ্ঞাস্য রাজ্য সরকার কি তার বরাদ্দ ৫০ শতাংশ গ্রান্ট স্কুলগুলোকে দিচ্ছে? উত্তর হলো না। রাজ্য সরকারের বরাদ্দ অংশের যৎসামান্য স্কুলগুলো পায়। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে স্কুলগুলি কম্পোজিট গ্রান্টের মাত্র ২৫ শতাংশ টাকা পেয়েছে। অথচ এই অর্থবর্ষে রাজ্য সরকার একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রদের মোবাইল বা ট্যাব কেনার জন্য ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। ১৬ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দশ হাজার টাকা পৌঁছে দেওয়া জন্য সরকার অত্যন্ত তৎপর। অথচ কম্পোজিট গ্রান্টের টাকা দিতে সরকারের কোনও হেলদোল দেখা যায় না।  অথচ স্কুল বাড়ি মেরামতি সহ পরিকাঠানো উন্নয়নের কাজে সরকার একটি পয়সা খরচ করতে চায় না। ফলে দীর্ঘদিন মেরামতহীন স্কুল বাড়িগুলোর ভগ্নদশা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

   সরকারি বা সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে মোটামুটি একটা গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল দীর্ঘদিন বজায় ছিল। স্কুল পরিচালন সমিতি ছিল। নিয়মিত নাহলেও, তার নির্বাচন হতো। শিক্ষক ও অভিভাবকদের স্কুল পরিচালনায় সক্রিয় অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। গ্রামাঞ্চলে ছিল গ্রাম শিক্ষা কমিটি যারা স্কুল এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে স্কুলছুট আটকানোর চেষ্টা করত। ২০১৪ সালের পর পরিচালন সমিতির গঠনতন্ত্রে আমূল পরিবর্তন এনে, স্কুল পরিচালনের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। সেই পরিচালন সমিতির নির্বাচনও হয় না। গ্রাম শিক্ষা কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ স্কুলের মাথায় প্রশাসক বসিয়ে সমস্ত  ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে স্কুলগুলোতে রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে চাইছে শাসক দল।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং সরকারি ঔদ্যাসিন্যের কারণে সরকারি স্কুলেরর গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। আর্থিকভাবে একটু সক্ষম অভিভাবকরা আর সরকারি স্কুলের উপর ভরসা করছেন না। একমাত্র সুযোগবঞ্চিত শ্রমজীবী পরিবার বাধ্য হয়ে সরকারি স্কুলে ছেলেমেয়েদের পাঠান অথচ সেখানে পড়াশোনার কোনও পরিবেশ নেই। 
    ফলস্বরূপ স্কুলছুটের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। সাংসদে  এক প্রশ্নের উত্তর কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী সাবিত্রী ঠাকুর সংসদে জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে সারা দেশে ৬৫.৭লক্ষ শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। এদের মধ্যে ২৯.৮ লক্ষ কিশোরী। স্কুল ছুটের তালিকায় গুজরাট, আসাম, উত্তর প্রদেশের নাম প্রথম সারিতে থাকলেও আমাদের রাজ্যের অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক নয়। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে স্কুলছুটের শতকরা হার ১৮.৭৫ শতাংশ। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের হিসাব অনুযায়ী গত শিক্ষাবর্ষে ২,৪৬,৩২৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসেনি। এবারও বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেনি। এখন প্রশ্ন হলো এই বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া পড়াশোনার ছেড়ে কোথায় যাচ্ছে? ছাত্রদের একটা অংশ পরিবারের চাপে রোজগারের জন্য ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। কিন্তু বাকিরা কোথায় যাচ্ছে, তার হিসাব সরকারের কাছে নেই। জোমাটো, সুইগিতে খাবার সরবরাহ করে বা অন্য উপায়ে কিছু পয়সা তারা রোজগার করছে।   একটি সরকারি স্কুলের জনৈক শিক্ষকের মতে, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির কিছু ছাত্র স্কুল কামাই করে র্যাহপিডো চালিয়ে, ক্যাটারিংয়ে কাজ করে কিছু পয়সা রোজগার করে। তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ, মূলত শ্রমজীবী পরিবারের ছেলেমেয়েরা এইভাবে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে কিনা, সেটা গবেষণার বিষয়।
  কেন্দ্র অথবা রাজ্য সরকার শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ দিন দিন কমাচ্ছে। নতুন পরিকাঠানো গড়ে তোলা দূরের কথা, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থাকেই সরকার সচেতনভাবে ধ্বংস করছে। সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতা যাতে তলানিতে এসে ঠেকে তার জন্য সরকার যতটা তৎপর সরকারি স্কুলকে রক্ষা করার জন্য সরকারের কোনও তৎপরতা দেখা যায় না। এর একমাত্র কারণ শিক্ষার বেসরকারিকরণ। শিক্ষাকে পুরোপুরি বাজার ব্যবস্থার হাতে তুলে দেওয়াই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। আর এই অভিসন্ধিকে মাথায় রেখে তৃণমূল সরকার আইন প্রণয়ন করে ২০১৫ সাল নাগাদ সরকার পোষিত স্কুলগুলিকে কনভারশন করে রাতারাতি গভমেন্ট স্পনসর্ড করে নিয়েছে, যাতে স্কুলগুলোর সম্পত্তি বেসরকারি হাতে তুলে দিতে আর কোনও আইনি বাধা না থাকে। এইভাবে দীর্ঘদিন ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা এ রাজ্যের স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থাকেই সরকার ধ্বংস করে সাধারণ মানুষের শিক্ষার অধিকারকে কেড়ে নিচ্ছে। এর বিরুদ্ধে এখনই রুখে না দাঁড়াতে পারলে খেটে খাওয়া গরিব মানুষ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

Comments :0

Login to leave a comment