Post Editorial

সেই ফাইলগুলি খোলার গ্যারান্টি মিলবে কবে

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

চন্দন দাস


নরেন্দ্র মোদী ঝাড়গ্রামে ঝালমুড়ি খেয়েছেন। যদি কখনও চট্টগ্রামে তিনি যান সেখানেও ঝালমুড়ি পাবেন। শুধু চট্টগ্রামে কেন, বাংলাদেশের সর্বত্র ঝালমুড়ি পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গেও সর্বত্র পাওয়া যায়। ওপার বাংলার মতো এপার বাংলাতেও ঝালমুড়ি এখনও মূলত রাস্তায় পাওয়া যায়। আর একটি কথা। ঝালমুড়ি সব ধর্মের মানুষ বানাতে পারেন। সবধর্মের মানুষ খেতে ভালোবাসেন। বাংলায় কথা বলা মানেই যেমন বাংলাদেশি নন, কারন দেশভাগের অনেক অনেক বছর আগে থেকে দুই বাংলার মানুষ বাংলায় কথা বলেন, তেমনই ঝালমুড়িও ১৯৪৭-এর অনেক আগে থেকে দুই বাংলায় অত্যন্ত পরিচিত এক খাবার। ঝালমুড়ির কোনও বিভাজন নেই। এটি মানুষের গ্যারান্টি—  নরেন্দ্র মোদীকে।
প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খেয়েছেন। তার আগে পরে, নির্বাচনী সভাগুলিতে অনেক গ্যারান্টিও দিয়েছেন। যেমন তিনি দিয়ে থাকেন। এবার নতুন একটি ‘মোদী কী গ্যারান্টি’ আমরা নির্বাচনী-উপহারে পেয়েছি। তিনি পানিহাটির সভায় বলেছেন,‘‘৪ মে বিজেপি সরকার গঠন করার পর মেয়েদের উপর হওয়া সব অন্যায়-অত্যাচারের ফাইল খুলবে। এটাই মোদীর গ্যারান্টি।’’ বেশ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে বাকিগুলির মতো এই গ্যারান্টি নিয়েও। যেমন,আর জি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় সিবিআই তদন্ত করেছে। সেই তদন্তের ভিত্তিতে বিচারের সময় আদালত রায়ের যে কপি তৈরি করেছে, তাতে লেখা আছে ‘আর জি করের মামলায় কলকাতা পুলিশের তদন্তকেই কেবল অন্ধভাবে অনুসরণ করে গেছে সিবিআই।’ কেন? সিবিআই নিজের ফাইল চালু করলো না কেন? প্রধানমন্ত্রীই বা নতুন ফাইল খোলার নির্দেশ দিলেন না কেন? যে যে পেন ড্রাইভে সেই হাসপাতালের এমারজেন্সি ভবনের চারতলার সেমিনার রুমে ঘটনার দিন, ৮ আগস্ট রাত দশটা থেকে ৯ আগস্ট সকাল দশটা পর্যন্ত যাবতীয় গতিবিধির সিসিটিভি ফুটেজ ছিল, সেই পেন ড্রাইভ সিবিআই সংগ্রহ করারই চেষ্টা করেনি। কেন? সেই বিষয়ে তদন্তের কোনও ফাইল খোলার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী দেননি কেন? আর জি কর হাসপাতালের সেই নৃশংস ঘটনার তদন্তে রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষ ক্ষুব্ধ। তবু সিবিআই কী করে রাজ্য পুলিশের তদন্তের পথেই এগলো, কেন সেই নিহত তরুণী আজও বিচার পেলেন না, সেই ফাইল নরেন্দ্র মোদী কেন খুললেন না? 
গ্যারান্টি এমন আরও অনেক কিছুই দাবি করে।
ধরুন মুড়ি। মুড়ি চাল থেকে বানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই জানেন। চাল আসে ধান থেকে। ধান উৎপাদন করেন কৃষক। কৃষক ধান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিক্রি করেন ফড়েকে। যে মমতা ব্যানার্জিকে আমেদাবাদ থেকে নরেন্দ্র মোদী ‘প্রথম রাতে বেড়াল মেরে’ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ২০১১-র মে’তে, সেই মুখ্যমন্ত্রী ওই ২০১১-তেই কথা দিয়েছিলেন ফড়েদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করবেন। সেই দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়নি। বরং বেড়েছে। কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়া ভুলতে বসেছে। ন্যায্য মূল্য তো দূরের কথা, কেন্দ্রীয় সরকার যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঠিক করে ফসলের, তাও কৃষক পান না। আমরা আশা করতেই পারি যে, এই বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর একটি ফাইল থাকা উচিত। আমরা ধরে নিতেই পারি মমতা ব্যানার্জির পাঠশালায় ‘কৃষক দরদী’ হতে শেখা শুভেন্দু অধিকারী নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীকে ধানের হালচাল জানিয়েছেন। 
কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য, ইশ্‌তেহার জানালো কৃষকের ফসলের ন্যূনতম মূল্য নিয়ে তাঁর কোনও ফাইল নেই। প্রধানমন্ত্রীর দল তাদের ইশতেহারে জানিয়েছে, ধানের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য করা হবে ৩১০০ টাকা। এখনই তো ধানের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ২৩৬৯ টাকা। অর্থাৎ তারা কেজিতে বাড়াবেন ৭টাকা ৩১ পয়সা। মাত্র! আরও কী মজা আছে? পাঁচ বছর আগে, ২০২১-২২-এ ধানের সহায়ক মূল্য ছিল ১৯৪০টাকা প্রতি কুইন্টাল। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে মোদীর সরকার ধানের সহায়ক মূল্য বাড়িয়েছে কেজিতে ৪টাকা ২৯পয়সা। অর্থাৎ ৩১০০টাকা স্বাভাবিক প্রবণতাতেই হবে। দ্বিতীয় কথা ধানের সহায়ক মূল্য শুধু একটি রাজ্যের জন্য বৃদ্ধি করা যায় না। অর্থাৎ সারা দেশের জন্য বৃদ্ধি করবেন। তার জন্য বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গের সরকারে আনতে হবে কেন?  
এর মধ্যে ডিজেল, পেট্রোলের দাম বাড়াবেন না নির্মলা সীতারামন, এমন গ্যারান্টি কোথায়? দাম বাড়বে না সারের, কীটনাশকের—  কে দেবে গ্যারান্টি? সেচের জলের জন্য যে বিদ্যুৎ খরচ হয়, সেই খরচ কমানো হবে—  এমন গ্যারান্টি প্রধানমন্ত্রী দিলেন কোথায়? 
মমতা ব্যানার্জিও একবারের জন্য এই প্রসঙ্গ কোনও সভায় তোলেননি। কৃষক সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারলে মমতা ব্যানার্জি বাড়তি দেন কেজিতে ২০পয়সা। তিনিও একবারও বলেননি ধানের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যর সঙ্গে তিনি কৃষকদের বাড়তি টাকা অনেক বেশি দেবেন। যেমন বামফ্রন্ট সরকার দিত। যেমন বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি বলেছে যে, তারা সরকার গড়লে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যর দেড় গুণ দাম দেবে। প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খেতে গিয়ে দোকানদারকে জানিয়েছেন যে, তিনি পেঁয়াজ খান,‘দিমাগ’ খান না। অথচ তিনি পেঁয়াজচাষী কিংবা ধান উৎপাদনকারী কৃষকদের বিষয়ে কোন খবর নিলেন না। মুর্শিদাবাদ সহ রাজ্যের কিছু জায়গায় পেঁয়াজের দাম না পেয়ে কৃষক খেতে পেঁয়াজ নষ্ট করে দিয়েছেন কিংবা বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাঁদের বিষয়ে খবর নেননি। প্রমাণ তাঁদের ইশতেহার, ভাষণগুলি। মমতা ব্যানার্জির মতোই আপনার ভাষণেও কৃষকদের জন্য কোনও ফাইলের নাম গন্ধ নেই। 
তাহলে নরেন্দ্র মোদীর ঝালমুড়ি খাওয়ায় আমাদের কোন লাভের কী গ্যারান্টি রইলো?  
তিনি ২০১৪-র মার্চে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ধ্বংস প্রাপ্ত সিঙ্গুরে নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছিলেন। বলেছিলেন যে, সিঙ্গুর নিয়ে আপনার ‘ভাবনা’ আছে। গত ১২ বছরে সেই ‘ভাবনা’র কোন ফোঁটা সিঙ্গুরে পড়েনি। এবার নির্বাচনেও তিনি সিঙ্গুর নিয়ে একটি বাক্যও উচ্চারণ করেননি। যে তথাকথিত ‘জমির আন্দোলন’-এর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর দলের নেতা, এমনকি ‘মার্গদর্শক’ও সেই জমির বিষয় সমাধান করে রাজ্যে তাঁরা কীভাবে শিল্প গড়ে তুলবেন, তা তিনি এবারের নির্বাচনের কোনো সভায় বলেননি। সেদিন কেন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতি করতে মমতা ব্যানার্জির সহায়ক ছিলেন, আজ কেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক সম্মেলনে বলছেন,‘সিঙ্গুরের ঘটনায় রাজ্যের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়েছে’—  বোঝা গেল না। 
প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দোসর অমিত শাহ নির্বাচনী সভাগুলিতে দাবি করেছেন যে, রাজ্যে তাঁরা সরকার গড়লে শিল্প হবে। অথচ তিনি রাজ্যে বন্ধ সার কারখানা খোলার গ্যারান্টি দেননি। রাজ্যে বন্ধ কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থাগুলি খোলার কোন বাক্য তিনি উচ্চারণ করেননি। তাঁর পূর্বসূরি অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন, ২০০১-র বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির শরিক তৃণমূলের নেত্রী মমতা ব্যানার্জি একটি ফ্যাক্সের কাগজ দেখিয়ে দাবি করেছিলেন যে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার এমএএমসি কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও সেই কারখানা কখনও খোলেনি। সেই বন্ধ কারখানা খোলার ফাইল খোলার কোনও গ্যারান্টি মোদীর থেকে মেলেনি। গত দশ বছরে ২৪টি কয়লা খনি বন্ধ হয়েছে। রয়েছে হিন্দুস্তান কেবলস-এর মতো বেশ কয়েকটি কারখানা। বন্ধ হয়েছে দুর্গাপুর পাওয়ার প্ল্যান্টের তিনটি ইউনিট। এই সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনিই। কোনও গ্যারান্টি সে সব নিয়ে? নেই।
কোন ‘ঘুসপেটিয়া’দের জন্য সেই কারখানাগুলি বন্ধ হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তাও বলেননি। এমনকি তাঁর সঙ্গে মিডিয়া মারফত জোরালো যুদ্ধ চালানো মমতা ব্যানার্জিও বন্ধ কারখানা খোলার দাবি তোলেননি। কোনও সন্দেহ নেই সেই কারখানাগুলি বন্ধ হওয়ায় অনেক শ্রমজীবী মানুষ ঝালমুড়ি সহ বিভিন্ন খাবারের ফেরির উপর জীবনধারনে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হয়েছেন। সেই দলে অনুপ্রবেশকারী নেই। সেই দলে মুসলমান আছে। হিন্দুও আছে। 
প্রধানমন্ত্রী কী বলেছেন? বলেছেন, আপনাদের সরকার হলে সব দুর্নীতিগ্রস্তর শাস্তি হবে আইন মেনে। এও এক গ্যারান্টি। কিন্তু এ’ কোন নতুন কথা হলো? এর জন্য ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার লাগে? তদন্ত করছে কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা। রাজ্যে তাঁদের সরকার হলো কী না হলো, কী যায় আসে? ইডি, সিবিআই তো রাজ্যের সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। অর্থাৎ তিনি ১২ বছরে যা করেননি, এখন বলছেন করবেন। তার জন্য রাজ্যে তাঁদের সরকার চাই? কোন যুক্তি হলো এটা? 
তিনি আর কী বলেছেন? 
তিনি দাবি করেছেন, অনুপ্রবেশকারীদের জন্য কাজ পাচ্ছেন না রাজ্যের বৈধ নাগরিকরা। এমনকি মাছও পাচ্ছেন না মৎস্যজীবীরা অনুপ্রবেশের জন্য। অর্থাৎ তাঁর কথা অনুসারে নদী, সমুদ্রর মাছরা পুকুরের মাছদের চরিত্র নিয়ে চলাফেরা করে। তারা বাংলাদেশে যাতায়াত করে না। কিন্তু সুন্দরবনের মাছরা বিএসএফকে মানলেও বাংলাদেশের মুসলমানরা মানে না। তারা সরল, সাধাসিধে বিএসএফ-দের ধোকা দিয়ে রাজ্যের জলসীমায় ঢুকে দেদার মাছ নিয়ে চলে যায়। সুন্দরবনের নদী, খাঁড়িতে মাছ কমে যাওয়ার পিছনে দূষণ, তৃণমূলের মদতে দেদার বেআইনি নির্মাণ, ম্যানগ্রোভ-খুনের কোনও সম্পর্ক নেই! এই জন্যই মুখ্যমন্ত্রী আপনাকে ধুতি-পাঞ্জাবী পাঠান। আপনার বক্তব্য অনুসারে পরিযায়ী শ্রমিকরা অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন, যেতে বাধ্য হচ্ছেন, কারন এই রাজ্যের কাজ গিলে নিচ্ছে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারী মুসলমানরা। তিনিও কী মমতা ব্যানার্জির মতো নিজের সরকারের রিপোর্ট দেখেন না? আপনার সরকারের পরিসংখ্যান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন দপ্তরের সাম্প্রতিক রিপোর্ট জানিয়েছে, অস্থায়ী শ্রমিকদের দৈনিক মজুরিতে পশ্চিমবঙ্গ আছে ৩৪তম স্থানে। পিছনে আছে শুধু ছত্তিশগড়, ওডিশা। ছত্তিশগড়ে অস্থায়ী কর্মীদের গড় দৈনিক মজুরি ৩০৩টাকা। ওডিশায় ৩৬৮টাকা। দুটিই বিজেপি শাসিত রাজ্য। সামান্য ওপরে গুজরাট। সেখানে অস্থায়ী কর্মীদের গড় মজুরি ৩৮২। পশ্চিমবঙ্গে ৩৭৪টাকা। শীর্ষে? কেরালা। সেই রাজ্যে অস্থায়ী কর্মীদের দৈনিক গড় মজুরি ৯২৪টাকা—  পশ্চিমবঙ্গের প্রায় আড়াই গুণ। মূলত এটিই কারণ রাজ্যের শ্রমজীবীদের এক বড় অংশের কেরালায় কাজের সন্ধানে যাওয়ার।
‘ঘুসপেটিয়া’রা রাজ্যের কাজ দখল করায় তাহলে কী পশ্চিমবঙ্গের যুবকদের লাভ হয়েছে? তারা কেরালা, তামিলনাডু, মহারাষ্ট্রে যেতে পেরেছে। আপনাদের ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার মজুরি বাড়াবে বলেনি। মমতা ব্যানার্জিও আপনার মতো সেই কথা বলছেন না। তাহলে সেই যুবকরা ফিরবেন কেন? 
প্রধানমন্ত্রী যা বলছেন তা আসলে ঝালমুড়ির মতো। লঙ্কা, নুন, সামান্য তেল, মশলা, অল্প চানাচুর, বাদাম, পেঁয়াজের ছোট ছোট টুকরো কমদামী মুড়ির সঙ্গে মিশিয়ে এক খাবারের মতো। শরীর গঠনে যার কোনও ভূমিকা নেই। এমন গ্যারান্টিও সে দেয় না।
মমতা ব্যানার্জিও আমাদের গত ১৫ বছর এমন শুধু ঝালমুড়িই খাইয়েছেন। নরেন্দ্র মোদী আর তৃণমূল নেত্রীর মধ্যে কোনও তফাৎ নেই—  এই বিষয়ে গ্যারান্টি হান্ড্রেড পারসেন্ট।
 

Comments :0

Login to leave a comment