Assembly 2026 Domkal

আত্মবিশ্বাসী জনপ্লাবনে জয়েরই ইঙ্গিত

রাজ্য জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

সুদীপ্ত বসু: ডোমকল
 

সম্ভাবনার স্তর পেরিয়ে জয়ের লক্ষ্যে আরও একধাপ এগলো ডোমকল। সোমবার দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা, স্তব্ধ হয়ে যাওয়া গাড়িঘোড়া, এলোমেলো হয়ে যাওয়া সব রাস্তা, অলিগলি সেজে ওঠা রক্তপতাকা আর কুল ছাপানো জনস্রোত পরিযায়ী সন্তানের জননী ডলি ইয়াসমিনের যাবতীয় আবেগকে যেন শান্ত করে দিল। 
ডোমকলের রাস্তায় ভেসে যাওয়া স্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে ষাটের গন্ডি পেরোনো ডলি ইয়াসমিনের চোখ তখন ভিজেছে আবেগে— ‘‘লাল পতাকার এমন বড় মিছিল আবার দেখতে পাবো ভাবিনি, হাওয়া দেখে সবার ভয় কেটে গেছে। ডোমকল এবার ফের মানুষের।’’ তাঁর চিবুক বেয়ে তখন নেমে আসছে জল।
প্লাবনের ঢেউয়ের শব্দ শুনতে চাওয়া বৃথা। জন-প্লাবনের আলাদা কোনও বর্ণনাও হতে পারে না। শুধু এটুকুই বলা যথেষ্ট, নির্বাচনী প্রচারের একেবারে শেষ পর্বে সোমবার সিপিআই(এম) প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের সমর্থনে যে মহামিছিলের স্রোতের সাক্ষী থাকলো মুর্শিদাবাদের একেবারের প্রান্তের এই জনপদ, তা লড়তে থাকা অবশিষ্ট সব ঠিকানায় আলো ছড়িয়েছে নিঃসন্দেহে। 
দুপুর তিনটে থেকে রাত সাতটা পর্যন্ত চার কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে শুধু মানুষ, লাল পতাকা, সুসজ্জিত ট্যাবলো, বাজছে গান, উঠছে স্লোগান। কেউ স্লোগানের তালে, গানের সুরে শরীর দোলাচ্ছে, কারও চোখে আবেগের জল। ডোমকল বাজারের সামনে তৃণমূলের পতাকা দিয়ে সাজানো টোটোতে বসে থাকা তৃণমূল কর্মীর আক্ষেপ, ‘‘এই মিছিলের পরে আর ঠেকানো যাবেনা সিপিএমকে’’।
জনপ্লাবনের সামনে পৌছতে পারেননি, মাঝখানেই গাড়িতে থাকতে হয়েছে সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে, সঙ্গে বর্ষীয়ান পার্টিনেতা আনিসুর রহমান, গোটা ডোমকলে জুড়ে ‘রানা’ নামেই পরিচিত মোস্তাফিজুর রহমান, বালিগঞ্জের সিপিআই(এম) প্রার্থী আফরিন বেগমকে।
কিন্তু শুধুই একটা জনস্রোত, কুল ছাপানো প্লাবনই ডোমকলের সব সম্ভাবনাকে সার-বীজ-জলের জোগান দিয়ে গেলো? না। ধারাবাহিক লড়াইয়ের তরঙ্গশীর্ষেই এই জনপদে এখন মহম্মদ ইলিয়াস থেকে সাবিনা খাতুনদের স্বাভাবিক উচ্চারণ, ‘‘নিজের মাটি ফিরে পেতে এবার দেব জান, ডোমকলে এবার রানা, এটা জেনে যান’’।
বহরমপুর থেকে ইসলামপুর হয়ে ডোমকল যাওয়ার রাস্তাতেই সকালে তখন একের পর এক বাস। প্রতিটি বাসে কেরালার নম্বর প্লেট। হাতিনগর পঞ্চায়েতের সামনে রাস্তার ওপরেই সেই বাস যখন ক্ষণিকের জন্য দাঁড়িয়েছে সেখানে পৌঁছাতেই দেখা গেলো, বাসভর্তি পরিযায়ী শ্রমিকরা। কোথা থেকে আসছেন...প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই বাসের ভিতর থেকে বিদ্যুৎগতিতে এল জবাব,  ‘‘চার রাত ধরে বাসে রয়েছি। ১৬ তারিখ রওনা দিয়েছি আমরা সবাই এর্নাকুলাম থেকে। এত কষ্ট করে এসেছি রানাদাকে ভোট দেব বলে...’’। জানারুল শেখ একথা বলতেই বাসের ভিতর থেকে আবার জলঙ্গীর যুবক সেলিম শেখ বলে উঠলেন, ‘‘আরে তোরা রাণাদাকে দিবি, আমরা তো ইউনুস সরকারকে দেবো’’। হাসির রোল উঠলো বাসে।
একটা বিধানসভা কেন্দ্র। প্রায় ৪৫ হাজার পরিযায়ী শ্রমিক। সোমবার দুপুর পর্যন্ত হিসাব, এখনও পর্যন্ত ৩৪ হাজারের বেশি পরিযায়ী শ্রমিক ফিরে এসেছেন গ্রামে। নজিরবিহীন। স্পষ্ট উচ্চারণে জানালেন, ‘‘শুনুন, এবার আমরা গাঁটের পয়সা খরচা করে এসেছি। মাথাপিছু প্রায় চার হাজার টাকা করে আসতে লেগেছে। বাস এখানেই থাকবে। ২৪ তারিখ আবার ফিরে যাবে বিদেশে (কেরালায়)। শুধুমাত্র ভোট দিতে এসেছি। গ্রামে কোনও কাজ নেই, শুধু কাটমানি। তৃণমূল-বিজেপি ভোট পাবে না কোনও পরিযায়ী শ্রমিকের। করোনার সময় কারা আমাদের পাশে ছিল জানি।’’ 
এমন মেজাজের আরও রঙিন ছবি ধরা পড়ল ডোমকল শহর ছড়িয়ে নদীর করিমপুর সীমান্তে যাওয়ার রাস্তায় গড়াইমারি অঞ্চলের রাজাপুর গ্রামে। গত ৪৮ঘণ্টায় শুধু এখানেই প্রায় ৯০০ জন পরিযায়ী শ্রমিক ফিরেছেন কেবলমাত্র ভোটে অংশ নিতে। সবেমাত্র গ্রামে ফেরা মহতাব শেখের কথায়, ‘‘বাড়ি ফিরে কোনও রেস্ট নেই। আজকেই যাবো মহামিছিলে। ভোটের দিন গ্রাম পাহারা দেবো, এবার আর ভোট লুট করতে দেবো না আমরা।’’ তারপরেই মহতাব, জালাল হোসেন, বক্কর শেখরা বলছিলেন, ‘‘জানেন, আমাদের ওখানে, এর্নাকুলামে, রানাদা গেছিলেন। ওখানে আমাদের মতো পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে মিটিং করেছিলেন। বিদেশে নিজের এলাকার লোক গেলে তো মনোবল বাড়ে। এবার আমাদের পালা, সিপিএমের মনোবল বাড়াবো। ডোমকলে তৃণমূল নেই এখন আর, রানাদা পাশ করবেই, সবার একই কথা।’’ 
রাজাপুর গ্রামের মোড়ে তখন জটলা বাড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে গ্রামেরই প্রৌঢ় নুরুল ইসলাম মণ্ডল হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন তাঁর জরাজীর্ণ টালির চাল দেওয়া বেড়ার ঘরে। ‘‘এই দেখুন আমার ঘর, আজও আবাসের টাকা পাইনি। আবাসের ঘর মিলবে বলে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে তৃণমূল, তবুও আমাদের ঘর বরাদ্দ হয়নি। এই চোরের দলকে এবার ডোমকলে আমরা মাটি ধরাবো এবার।’’ পাশে দাঁড়িয়ে তখন তাঁর একমাত্র ছেলে মোস্তাকিন মণ্ডল। একদিন আগেই কেরালা থেকে ফিরেছে গ্রামে। জানালেন, ‘‘বাবা বলল চলে আয় এবার ভোট দিতে, যত কষ্টই হোক। আমরা ৩০ জনের দল একসঙ্গে ফিরেছি গ্রামে। এরকম আরও ১৫টা দল ফিরেছে। এখানে কোনও কাজ নেই। না হলে এই অবস্থায় বাবাকে রেখে বাইরে যাই কাজ করতে! ১০ দিন অন্তর বাবার ওষুধ লাগে হাজার টাকা, পেটে অসুখ। তারপরও বাবা দেখুন পতাকা নিয়ে মিছিলে যাচ্ছে।’’
এই মেজাজই এখন ডোমকল পৌরসভা থেকে পঞ্চায়েত বিস্তীর্ণ এলাকার রোজনামচা। বামফ্রন্ট সরকারের হাত ধরে, আবদুল বারি থেকে আনিসুর রহমানদের উন্নয়ন আর সংগ্রামের মিলিত ফসল আজকের ডোমকল। গত ১৫ বছর ধরে সেই ডোমকলে স্তব্ধ উন্নয়ন। ভোট লুট আর টাকা লুটই যেন ডোমকলের দেড় দশকের বাস্তবতা। পরিণাম? এখানে বিজেপি খাতায় কলমে বা দৃশ্যত নেই। আছে তৃণমূল, কিন্তু তা ভাঙছে প্রতিদিন। এমন একটিও এলাকা নেই যেখানে রোজ ভাঙছে না তৃণমূল। গতকাল রাতেও একাধিক এলাকায় থেকে প্রায় ৫০০ পরিবার তৃণমূল ছেড়ে সিপিআই(এম) নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়েছেন। আজকের রাতও তার ব্যতিক্রম নয়।
কিন্তু কেন ছাড়লেন তৃণমূল? ঘোড়ামারা অঞ্চলের কামুরদিয়ার বাসিন্দা, ছোট ব্যবসায়ী আহার আলির কথায়, ‘‘আমরা কোনোদিন বিজেপি’কে ভোট দিতে পারবো না। এই সুযোগে, কেবল বিজেপি’র কথা বলে ওরা ভোট নিতো আমাদের। তাও আবার লুটও করতো। কিন্তু এখানে বিজেপি’কে ঠেকাতে তৃণমূলকে লাগবে না। সিপিএমই পারবে। আর ওরা অন্তত কাটমানি খাওয়ার জন্য মিটিং ডাকবে না। এটা একটা দল! গ্রামে দেখুন সব পরিবারেই তৃণমূল ছাড়ার হিড়িক পরে গেছে।’’ আহার আলি বলছিলেন, ‘‘৪০০ কিলোমিটার দূরে সেই ডেবরা থেকে তৃণমূলকে প্রার্থী আনতে হয়েছে কেন? পুলিশ কর্তা গরিবের কষ্ট জানে?’’
প্রথম দফার নির্বাচনী প্রচারের শেষপর্বে এসে ডোমকল জানে, বাংলা বাঁচানোর লড়াই আসলে নিজেকে বাঁচানোরও লড়াই। মোস্তাফিজুর রহমানের কথায়, এই লড়াই এখন আর কেবল সিপিআই(এম)’র নয়, ডোমকলের আপামর মানুষের। আমরা কি চাই, ডোমকলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কি করতে চাই সবই স্পষ্ট মানুষের কাছে।
তা যে স্পষ্ট, রঘুনাথপুর থেকে ডোমকল হাসপাতাল, বাজার হয়ে, সেতু পেরিয়ে কুঠির মোড় চার কিলোমিটার মিছিলের জনপ্লাবনই দিল ইঙ্গিত; সুকান্ত ভট্টাচার্যের কলমে যেন তারই অনুবাদ, ‘‘...উধাও আলোর নিচে সমারোহ/ মিলিত প্রাণের একি বিদ্রোহ!’’
 

Comments :0

Login to leave a comment