নির্বাচনের সময়সীমার শেষলগ্নে পাহাড়ের পাদদেশের চা-বলয়ে ভোট প্রচারের পারদ তুঙ্গে। মঙ্গলবার সাতসকাল থেকেই নাগরাকাটা বিধানসভা কেন্দ্রের বাম মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী দিল কুমার ওঁরাওয়ের সমর্থনে কলাবাড়ি, চেংমারি ও কেরণ চা বাগান এলাকা ছিল লাল ঝাণ্ডায় মোড়া। বর্ষীয়ান বাম নেতৃত্ব তিলক ছেত্রী ও কেদার ছেত্রীকে সাথে নিয়ে দিনভর যে জনসংযোগ চলল, তাতে আক্ষরিক অর্থেই কোণঠাস্য শাসক ও গেরুয়া শিবির।
এদিন প্রচার চলাকালীন বাগান শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আছড়ে পড়ে প্রার্থীর সামনে। ভোটারদের চোখে-মুখে বঞ্চনার ছাপ স্পষ্ট। কলাবাড়ি চা বাগানের দীর্ঘদিনের শ্রমিক অনিতা বাড়াইক ধরা গলায় ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বললেন, ‘‘বাবু, ভোটের সময় সবাই আসে। হাত জোড় করে ভোট চায়। কিন্তু ভোট মিটলে আমাদের কথা কেউ রাখে না। আজও ন্যূনতম মজুরি আমাদের কাছে স্বপ্ন হয়েই থাকল। রেশন পাই তো কাজ পাই না, কাজ পেলে ভালো চিকিৎসা পাই না। আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। এবার আর মিষ্টি কথায় ভুলছি না।’’
আরেক শ্রমিক রতন প্রধানের অভিযোগ আরও তীব্র। কেন্দ্রের বিজেপি এবং রাজ্যের তৃণমূল সরকারকে একাসনে বসিয়ে তিনি বলেন, ‘‘কেন্দ্র বলে আচ্ছে দিন, আর রাজ্য বলে সব দিয়েছি। অথচ বাগানের হাসপাতালগুলোর অবস্থা দেখলে কান্না পায়। ঘরের ছেলেরা পেটের টানে ভিনরাজ্যে পালাচ্ছে। আমরা খাটছি কিন্তু লাভ খাচ্ছে বড় বাবু আর নেতারা।’’ শ্রমিকদের এই হাহাকারই আজ নাগরাকাটার নির্বাচনি ময়দানে বামেদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
শ্রমিকদের আশ্বস্ত করে বর্ষীয়ান বাম শ্রমিক নেতা তিলক ছেত্রী বলেন, এই লড়াই কেবল একটি ভোট পাওয়ার জন্য নয়, এটা চা শ্রমিকদের আত্মসম্মান ও হারানো অধিকার ফেরানোর লড়াই। তিনি সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে বলেন, ‘‘সারদা-নারদা থেকে নিয়োগ দুর্নীতি—পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির পরও রাজ্য সরকার টিকে আছে কেন্দ্রের পরোক্ষ মদতে। ইডি-সিবিআই আসলে মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল। রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে গভীর ‘সেটিং’ চলছে। মানুষের টাকা লুঠ করা চোরদের আড়াল করছে দিল্লির সরকার।’’
এদিন প্রচারে প্রার্থী দিল কুমার ওঁরাও রাজ্য ও কেন্দ্র উভয় সরকারকেই কাঠগড়ায় তোলেন। তাঁর ক্ষুরধার বক্তৃতায় উঠে আসে কয়লা, বালি ও গরু পাচারের প্রসঙ্গ। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘‘বাংলার বুকে গত দেড় দশক ধরে যে দুর্নীতির জাঁতাকল চলছে, তার থেকে মুক্তি পাওয়ার সময় এসেছে। একদিকে যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা রাস্তায় কাঁদছেন, আর অন্যদিকে শাসক নেতাদের ঘরে কোটি কোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছে—এটা বাংলার লজ্জা। আমাদের ডাক স্পষ্ট—চোর ধরো, জেল ভরো, মানুষ মারার সরকার হটাও, বিকল্প গড়ো।’’
বামেদের প্রচারে এদিন প্রাধান্য পেয়েছে চা-বলয়ের বর্তমান জ্বলন্ত সমস্যাগুলি। বক্তারা মনে করিয়ে দেন, গত ১৫ বছরে এলাকায় কোনো নতুন শিল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজ আজ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। ১০০ দিনের কাজের টাকা তছরুপ এবং ন্যূনতম মজুরি আইন কার্যকর না হওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ, তাকেই গণআন্দোলনের রূপ দিতে চাইছে বামেরা। রুটি-রুজির আসল কথা আড়াল করতে মন্দির-মসজিদ নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভাজনের রাজনীতির তীব্র নিন্দা জানানো হয় এদিনের সভাগুলি থেকে।
মঙ্গলবার কলাবাড়ি, কেরণ ও চেংমারি চা বাগানের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও লাল ঝাণ্ডার মিছিলে সাধারণ মানুষের ভিড় প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, উত্তরের চা-বলয় এবার বিভাজনের রাজনীতির বদলে রুটি-রুজি ও হকের লড়াইয়ের বামপন্থী বিকল্পকেই বেছে নিতে মরিয়া। নাগরাকাটার চা-শ্রমিকদের এই মেজাজ তৃণমূল ও বিজেপি—উভয় শিবিরের কপালেই চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
Assembly Elections 2026
অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে উত্তাল নাগরাকাটা, বামেদের প্রচারে দিশাহারা তৃণমূল-বিজেপি
×
Comments :0