MANDA MITHAI — SOURAV DUTTA — WOMEN IN SCIENCE — NATUNPATA | 1 MARCH 2026, 3rd YEAR

মণ্ডা মিঠাই — সৌম্যদীপ জানা — দীপ্তিময়ী ভারতীয় নারী বৈজ্ঞানিক ও ভারতীয় বিজ্ঞান চর্চায় তাঁদের অবদান — নতুনপাতা — ১ মার্চ ২০২৬, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

MANDA MITHAI  SOURAV DUTTA  WOMEN IN SCIENCE  NATUNPATA  1 MARCH 2026 3rd YEAR

মণ্ডা মিঠাই

নতুনপাতা

দীপ্তিময়ী ভারতীয় নারী বৈজ্ঞানিক ও ভারতীয় বিজ্ঞান চর্চায় তাঁদের অবদান

সৌম্যদীপ জানা

১ মার্চ ২০২৬, বর্ষ ৩

 

বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সাক্ষী, তা মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এক অভিনব যুগান্তরের সূচনা করেছে। সত্যিই, আজকের সময়কে ‘বিজ্ঞানের যুগ’ বললে কোনো প্রকার অতিশয়োক্তি হয় না। আদিম মানবের আগুন আবিষ্কার থেকে শুরু করে কৃষিবিপ্লব, শিল্পবিপ্লব, বিদ্যুতের প্রয়োগ, বেতার যোগাযোগ, কম্পিউটার প্রযুক্তি এবং আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এই সমগ্র অভিযাত্রা মানবমস্তিষ্কের নিরন্তর অনুসন্ধিৎসা ও সৃজনশীলতার ফসল। বিজ্ঞান আমাদের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজতর করেছে, তেমনি জ্ঞানের দিগন্তকে প্রসারিত করেছে অসীমের দিকে।

কিন্তু ইতিহাসের পাতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বৈজ্ঞানিকদের তালিকায় অধিকাংশ নামই পুরুষদের। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সমাজব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে জ্ঞানচর্চার অধিকার নারীদের জন্য প্রায় অবারিত ছিল না। বহু প্রতিভাবান নারী সামাজিক বিধিনিষেধ, শিক্ষাবঞ্চনা এবং কুসংস্কারের কারণে নিজেদের মেধা বিকাশের পূর্ণ সুযোগ পাননি। তবুও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও নারীরা বিজ্ঞানের জগতে নিজেদের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করেছেন। আধুনিক ভারতে সেই ধারারই এক গৌরবময় বিকাশ আমরা প্রত্যক্ষ করি।

নিম্নে কয়েকজন বিশিষ্ট ভারতীয় নারী বিজ্ঞানীর জীবন ও অবদান পৃথকভাবে আলোচনা করা হলো, যাঁদের কর্মনিষ্ঠা ও সাফল্য ভারতীয় বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

 


আন্না মানি

ভারতের আবহাওয়াবিদ্যার ইতিহাসে আন্না মানি এক পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব। ১৯১৮ সালের ২৩ আগস্ট কেরলের তৎকালীন ত্রিবাঙ্কুর অঞ্চলে তাঁর জন্ম। অল্পবয়স থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল বিজ্ঞানচর্চার প্রবল আগ্রহ। তিনি প্রথমে পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরে যোগ দেন। সেই সময়ে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের অধিকাংশ যন্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। আন্না মানি এই নির্ভরতা দূর করার সংকল্প নেন।

তিনি সূর্যরশ্মি পরিমাপক, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাত নির্ণায়কসহ বিভিন্ন আবহাওয়া-সংক্রান্ত যন্ত্রের মানোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ভারতে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র দেশীয়ভাবে প্রস্তুত হতে শুরু করে। তিনি সৌরশক্তি গবেষণার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে সৌর বিকিরণ পরিমাপের তথ্যসংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও সংগঠকসুলভ দক্ষতা তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরেও স্বীকৃতি এনে দেয়।

 


কল্পনা চাওলা

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহাকাশচারী কল্পনা চাওলা আধুনিক ভারতের এক গৌরবময় নাম। ১৯৬২ সালের ১৭ মার্চ হরিয়ানার কর্নালে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি আকাশের বিস্তৃত নীলিমার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার পর তিনি উচ্চতর পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং পরবর্তীকালে নাসার মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত হন।

১৯৯৭ সালে স্পেস শাটল কলম্বিয়ায় তাঁর প্রথম মহাকাশযাত্রা সমগ্র ভারতকে গর্বিত করে। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় নারী, যিনি মহাকাশে পাড়ি দেন। ২০০৩ সালে দ্বিতীয় অভিযানে অংশগ্রহণের সময় কলম্বিয়া দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা তাঁকে অমর করে রেখেছে। কল্পনা চাওলা প্রমাণ করেছেন—স্বপ্ন যদি অটল হয়, তবে ভৌগোলিক সীমানা কোনো বাধা নয়। তাঁর জীবনকাহিনি অসংখ্য তরুণীকে বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণায় আগ্রহী করে তুলেছে।

 


ড. টেসি থমাস

ড. টেসি থমাস ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণার ইতিহাসে এক অনন্য নাম। কেরলে জন্মগ্রহণকারী এই বিজ্ঞানী ছোটবেলা থেকেই গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। তিনি প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও)-তে যোগ দিয়ে অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

‘মিসাইল ওম্যান অফ ইন্ডিয়া’ নামে পরিচিত টেসি থমাস অগ্নি-৪ ও অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেন। তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতা ভারতের কৌশলগত প্রতিরক্ষা শক্তিকে সুদৃঢ় করেছে। একটি দীর্ঘদিনের পুরুষপ্রধান ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো ক্ষেত্রই নারীর জন্য অজেয় নয়।

 


ড. ইন্দিরা হিন্দুজা

ভারতের প্রজননবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ড. ইন্দিরা হিন্দুজার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি দেশের প্রথম টেস্ট টিউব শিশুর জন্মদানে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তাঁর গবেষণা বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় ভোগা অসংখ্য দম্পতির জীবনে আশার আলো জ্বালিয়েছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল ও সংবেদনশীল ক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে নানা সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবুও তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও মানবকল্যাণের আদর্শে অবিচল থেকেছেন। আধুনিক সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ভারতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে।

 


ড. অসীমা চট্টোপাধ্যায়

ড. অসীমা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট জৈব রসায়নবিদ। ১৯১৭ সালে কলকাতায় তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় নারী, যিনি বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। জৈব যৌগ ও ঔষধি উদ্ভিদের রাসায়নিক বিশ্লেষণে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

ম্যালেরিয়া ও মৃগী রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ উদ্ভাবনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ক্যানসার প্রতিরোধী কিছু যৌগ নিয়েও তিনি গবেষণা পরিচালনা করেন। দীর্ঘ গবেষণাজীবনে তিনি বহু ছাত্রছাত্রীকে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করেছেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—নীরব সাধনাই প্রকৃত সাফল্যের ভিত্তি।

 


উপরিউক্ত বিজ্ঞানীদের জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। সুযোগ, শিক্ষার পরিবেশ এবং মানসিক সমর্থন পেলে নারীও সমান দক্ষতায় বিজ্ঞানের জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে। বর্তমান সময়ে মহাকাশ গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবেশবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতীয় নারীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন।

তবুও সমাজের কিছু অংশে এখনো কন্যাশিশুর শিক্ষা ও স্বাধীন চিন্তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, কুসংস্কার ও সামাজিক সংকীর্ণতা অনেক সময় তাদের অগ্রগতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হলে পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজকে একযোগে উদ্যোগী হতে হবে। কন্যাশিশুর মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রশ্ন করার সাহস জাগিয়ে তুলতে হবে ছোটবেলা থেকেই।

শেষে বর্তমান সময়ের সকল নারীর উদ্দেশে আমার আন্তরিক বার্তা—নিজের মেধা ও সামর্থ্যের উপর বিশ্বাস রাখো। কোনো প্রতিবন্ধকতাই তোমার স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারবে না, যদি তোমার লক্ষ্য দৃঢ় হয়। বিজ্ঞানচর্চা কেবল পেশা নয়, এটি এক সাধনা; আর এই সাধনায় নারী ও পুরুষের সমান অধিকার। আগামী দিনের বিজ্ঞানভুবনে তোমাদের চিন্তা, গবেষণা ও উদ্ভাবনই রচনা করবে নতুন ইতিহাস।

নারী যখন শিক্ষিত ও আত্মবিশ্বাসী হয়, তখন একটি পরিবার নয়, সমগ্র জাতিই আলোকিত হয়ে ওঠে। তাই এগিয়ে চলো জ্ঞানের পথে—কারণ ভবিষ্যতের বিজ্ঞান তোমাদের হাত ধরেই আরও সমৃদ্ধ ও মানবিক হয়ে উঠবে। 
       

Comments :0

Login to leave a comment