প্রতীম দে
কসবা এলাকার একটি ফ্ল্যাটে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করেন দিলীপ সাহা। তিন বছর আগে এসডি ৮ রুটে বাস চালাতেন। কেন এই কাজ ছাড়লেন?
তাঁর জবাব,‘‘প্রথম কথা লকডাউনের পর থেকে ব্যবসা ভালো নেই। তারপর গাড়ি কমে গিয়েছে। আয়ের কোনও ঠিক নেই।’’
ইউনিয়ন কিছু বলেনি কাজ ছাড়ার সময়? ‘‘ওদের জন্যও তো কাজ আরও ছাড়লাম। একেই কাজ নেই। ভালো টিকিট বিক্রি হয় না। তার ওপর ইউনিয়নকে টাকা দেওয়া। প্রতিদিন ২০ টাকা করে তো দিতে হতোই, তার সঙ্গে আজ এই খাওয়া কাল ওই খাওয়া লেগেই আছে।’’ একটু থেমে তিনি আরও বলেন,‘‘সব থেকে বড় কথা গাড়ি বন্ধ করিয়ে মিটিং মিছিলে নিয়ে যেতো। যেতেই হবে, না হলে সাসপেন্ড। ওদের ঝান্ডা ধরতেই হবে না হলে সাসপেন্ড।’’ পুলিশ ধরলে ইউনিয়ন কিছু করতো? দিলীপ সাহার পালটা প্রশ্ন,‘‘ভাবলেন কী করে যে ওরা পাশে থাকবে?’’
পুলিশের জ্বালায় শহরের রাস্তায় বাস, গাড়ি নামাতে চাইছেন না অনেকে। শুনে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। পুলিশের বিরুদ্ধে বাস মালিক, চালক, কন্ডাক্টরদের অভিযোগ, হয় কোনও কারণ ছাড়াই ফাইন। আর যদি ছোট গাড়ি হয় তাহলে তো কথাই নেই, সরাসরি থানায় গাড়ি তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। কলকাতা থেকে জেলা রাজ্যের সর্বত্র একই ছবি।
কলকাতার এক বেসরকারি বাস মালিকের কথায়, আগে প্রতিদিন অন্তত ৩০০টি টিকিট বিক্রি হতো। এখন সেই বিক্রি এসে দাঁড়িয়েছে ১২০-১৩০- এ। ফলে আয় অর্ধেক হয়েছে। এছাড়া রয়েছে টায়ার ভাড়া, মোবিল সহ সব জিনিসের দাম বেড়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশের জুলুম।
ওই বাস মালিকের কথায়,‘‘আমরা ধরেই রাখি যে পুলিশকে ফাইন প্রতিদিন দিতেই হবে। রাস্তায় বেরোলেই ফাইন। আগে সার্জেন্টরা ফাইন করতো, এখন সিভিকরাও সেই কাজ করছে।’’
কোনও রসিদ দেয়?
‘‘না, না। তবে একটা মজা আছে। একটা ছোট কাগজে লিখে দেয়। ওইদিন যদি আর কোথাও ধরে ফাইন চায় তখন ওই কাগজটা দেখালে ছেড়ে দেয়।’’
যাদের প্রতিদিন এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন সুভাষ দাস। তিনি কসবা – হাওড়া মিনিবাসের একজন কন্ডাক্টর। তিনি বলেন,‘‘যখন তখন যেখানে সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে টাকা আদায় করা হয়। যার ঘরে টাকা আছে তিনিই টাকা দিয়ে রাস্তায় বাস নামাতে পারছেন। যিনি পারছেন না তার রোজগার বন্ধ। এখন যা পরিস্থিতি তাতে তেলের দাম ওঠে না, একদিন চালালে তিন দিন বাস বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’’
পুলিশের জুলুম কেমন? সুভাষ দাসের কথায়,‘‘কোনও কারণ ছাড়াই রাস্তার মাঝে গাড়ি দাঁড় করিয়ে টাকা নেয় পুলিশ। টাকা না দিলে লাইসেন্স আটকে রাখবে। সেটা ছাড়াতে আরও বেশি টাকা লাগবে। তার থেকে যা চাইছে তা দিয়ে দেওয়াই ভালো।’’সেই টাকার পরিমাণ নেহাতই কম নয়। ৫০০ টাকা কম করে। অনেক সময় হাজার।
কলকাতা শহরের আসা মানুষদের বা শহরবাসী অন্যতম নির্ভরযোগ্য বাস হচ্ছে ৪৫ নম্বর বাস। এয়ারপোর্ট, উল্টোডাঙা, পাক সার্কাস সেভেন পয়েন্ট, গড়িয়াহাট, যাদবপুর, গড়িয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে এই বাস চলে। এই রুটে ৮০টা বাস থাকলেও এখন রোজ ৫০-৬০টি বাস চলছে। কারণ সেই একই। আয় কম ব্যয় বেশি। তারপর আবার অনেক ক্ষেত্রে অনেক চালক, কন্ডাক্টর রুট ছেড়েছে, পেশা ছেড়েছেন।
তবে এই সমস্যা শুধু বেসরকারি বাসের ক্ষেত্রে নয়। অটোর ক্ষেত্রেও এই সমস্যা রয়েছে। পুলিশের টাকার জুলুম যেমন আছে তেমন রয়েছে। ইউনিয়নের জুলুম।
‘পশ্চিমবঙ্গের সার্টিফাইড তোলাবাজ হলো পুলিশ।’ গড়িয়াহাট চেস ক্লাবের সামনে থেকে অটো ঘোরাতে ঘোরাতে এক লহমায় বললেন প্রদীপ মণ্ডল।
প্রদীপ মণ্ডল কসবা নিউ মার্কেট থেকে গড়িয়াহাট পর্যন্ত যেই অটো রুট সেই রুটে তিনি গাড়ি চালান। কেন একথা বললেন? তাঁর কথায়,‘‘কেন বলবো না? যেখানে সেখানে রাস্তায় ধরে এরা টাকা নেয়। ফাইন করে। আমরা পেটের দায়ে গাড়ি চালাই।’’
গাড়ি কি নিজের? তাঁর জবাব,‘‘না, না মালিকের। এতো পয়সা কোথায়? যে কিনবো!’’ কত ঘরে নিয়ে যান রোজ? ‘‘৫০০ টাকা।’’ মালিকের ঘরে? ‘‘৮০০-১০০০।’’ একটু থেমে বললেন,‘‘যেদিন যেমন আয় তেমন টাকা ঘরে আসে। কিন্তু কমপক্ষে ৫০০ টাকা ঘরে নিয়ে যাই। এবার পুজো, সেলের বাজারে আরও বেশি হয়।’’
দক্ষিণ কলকাতার একটি রুটের চালক রাসবিহারীর বাসিন্দা পূর্ণ চন্দ্র প্রধান জানান,‘‘শুধুমাত্র পুলিশের জুলুম নয় ইউনিয়নের চাপও রয়েছে। যেমন প্রতিমাসে নিয়ম করে দিতে হবে ৩০০ টাকা। তা ছাড়া মিটিং মিছিলে যাওয়া এবং অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দিতে হয় টাকা। আর মিটিং মিছিলে না গেলে সাসপেন্ড। গাড়ি বন্ধ পেটে টান...’’
অটো চালিয়ে যা হয় তাতে সংসার চলে? তাঁর জবাব,‘‘কারুর যদি নিজের গাড়ি থাকে তাহলে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু কেউ যদি ভাড়ায় গাড়ি চালায় তাহলে সেই ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। তাদের সংসার চালাতে একাধিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়।’’
এখন কলকাতা শহরে দুই ধরনের অটো চলে। এক ব্যাটারি চালিত। দুই এলপিজি চালিত। পূর্ণ চন্দ্র প্রধানের কথায় এলপিজি অটোর মালিক চার্জের খরচ প্রতিদিন বহন করে। কিন্তু যে ভাড়ায় খাটছে তাকে ৭০০ টাকা দিতে হয় মালিককে প্রতিদিন। এলপিজি গাড়ির ক্ষেত্রে সেই অঙ্কটা ৪০০-৪৫০। তিনি বলেন,‘‘দশ থেকে বারো ঘণ্টা কাজ করলে তবে মালিককে টাকা দিয়ে কিছু টাকা ঘরে নিয়ে যেতে পারি। তার থেকে যদি পুলিশ এবং ইউনিয়নকে দিতে হয় তাহলে কিছু আর বলার নেই।’’
একই পরিস্থিতি জেলাগুলোয়। যেমন জলপাইগুড়ি। সেখানে পুলিশি জুলুমে নাজেহাল টোটো চালকরা। ওই জায়গার টোটো চালক সুবর্ণ সরকার। তার কথায়,‘‘রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হবো আর পুলিশের জুলুমের মুখে পড়বো না তা হয় নাকি।’’ ফোনের ওপার থেকে হাসতে হাসতে তিনি বলেন,‘‘আচ্ছা কখনও দেখেছেন পুলিশ গাড়ির চাবি নিয়ে চলে যাচ্ছে?’’ জলপাইগুড়ি সহ বিভিন্ন জেলায় টোটো চালকদের সাথে এই ধরনের ঘটনা নিত্য দিনের সঙ্গী।
গাড়ির চাবি নিয়ে চলে গেলে কী করতে হয়? থানায় যেতে হয়। ওরা কেস করে তারপর সেই গাড়ি ছাড়াতে তারপর কোর্টে যেতে হয়। অনেক টাকা খরচ। একই ওই সময় গাড়ি বন্ধ থাকে তার ওপর টাকার খরচ। সিভিক পুলিশদের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ,‘‘ওরা রাস্তায় গাড়ি আটকে টাকা নেয়। ১০০, ২০০ তো নেবেই।’’
পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত সবারই প্রশ্ন— আয় কম, ব্যয় বেশি। তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় প্রতিদিনের ফাইনের চাপ, তাহলে কীভাবে টিকবে এই পরিষেবা?
Comments :0