গল্প
মুক্তধারা
--------------------------------------------
রাজা রানি দাবা খেলে
--------------------------------------------
ময়ূরী মিত্র
১
বেলা এগারোটা নাগাদ যখন নলিনীদিদি এল আতা তাকে দুটি ডিমসেদ্ধ খেতে দিল ৷ আসলে নলিনীদিদি ডিম খুব ভালোবাসে ৷ মায়ের কাছ থেকে আতা তাই সকালেই ডিমসেদ্ধ নিয়ে নিয়েছে ৷ কেউ এলে নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত না নিতে দিয়ে অতিথিকে খাবারের প্লেট এগিয়ে দেওয়াটাই আতার স্বভাব ৷ ঠাকুমার কাছে শুনে শুনে আতা শিখে গিয়েছে অতিথি নারায়ণ ৷ নারায়ণরা আতার কাছে এলেই খুব পেটুক হয়ে যায় ৷ ঝন্টু , বিমলি , কেশর , ননী , ফণী , নলিনীদিদি সবকটা ৷ তবে পনেরো বছরের আতার কাছে উনিশ বছরের নলিনীদিদি খুব স্পেশাল নারায়ণ ৷
--খাও নলিনীদিদি ৷ ফের গরম করেছি ডিমসেদ্ধ দুটোকে ! খেয়ে কথা বল ৷ নুনের পাশে গোলমরিচ গুঁড়ো করে দেব ?
বলেই মাথা চুলকে নিল আতা ৷ এই রে ! কোথ থেকে গোলমরিচ গুঁড়ো করবে সে ! ছুটির দিন বলে মা আজ দেরি করেই রান্না বসিয়েছে ৷ পাঁচপদ রান্নাও হবে ৷ আতার দাদা শুভেন্দু কাল বাড়ি ফিরেই নানা রকম মাছ রান্নার অর্ডার দিয়েছে ৷ আর দাদা বলা মানেই মা সেগুলো গুণে গুণে করবেনই ৷ সকালে উঠেই বাবাকে বাজারের থলে ধরিয়েছেন ৷ পার্ষে , পাবদা , ডিম ভরা তোপসে ৷ ধুস ৷ একটা মাছও আতার পছন্দ না ৷ বিকট দাম সবকটার ৷ কিন্তু মা কি তা বুঝবে ! বাবাকে লুকোবে আর একপিস দুপিস হলেও কিনবে ৷ মামার বাড়িটা আতার বড়লোক আছে ৷ তাদের টাকা আর দাদার অর্ডার ! মায়ের খুন্তি নড়বে বিরামহীন ! আজো দেখ ! কী আওয়াজ ! খুন্তির আওয়াজে ফেটে যাচ্ছে রান্নাঘরের টিনের চাল ৷ চোখ বুঁজে মায়ের ঘাম হলুদে ভরা হাতদুটো মনে পড়ল আতার ৷ যদিও খুব মুছিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল মায়ের হাত কিন্তু এখন ওসব করতে গেলে পিঠে দড়াম হবে শিওর ৷
- আনবি বলে আনছিস না কেন রে গোলমরিচ !
আতা চমকে উঠল ৷ নলিনীদি নাকের ডগায়
সেদ্ধ ডিমের প্লেট নাচ্চাচ্ছে ৷
- আজ এমনি খেয়ে নাও গো দিদি ৷ আজ রাতেই
গুঁড়ো সরাব ৷ পুরোনো পেন্সিলবাক্স আছে ,ওতে রেখে দেব ৷ পরদিন থেকে মরিচ মাখা কালো ডিম খাবে এখন ৷
- আতার বাড়াবাড়ি রকম হাসি দেখে গা জ্বলল
নলিনীর ৷ একে তো সামান্য গোলমরিচ এনে দিতে পারল না ! তারপর হ্যা হ্যা হাসি হাসছে ! দিয়েছে দুটো সেদ্ধ ডিম , তাও দেখো গরিব লোকের মতো কেমন পোলট্রির ডিম ধরিয়েছে ! গরিব আছিস বাপু ! তা গরিবই থাক না কেন ! কেউ তো বাধা দিচ্ছে না ! তা না খালি বড় বড় কথা !
-ও নলিনীদিদি , এস না গো ...তুমি এলে বাগানের সজনে ফুল হাসে ৷ আমার দাদার চোখে সূর্য আসে ৷ এস রবিবার করে ৷ কী খাবে বল।আমার ঠাকুমা বলত , অতিথি নারায়ণ ৷ সে যা খেতে চায় তাই আসন পেতে খাওয়াতে হয় !
আর এখন দেখো মরিচহীন পোল্ট্রি গিলতে গিয়ে গলায় আটকাচ্ছে ! মরিচ নুনে জিভে জল আসে ৷ ডিমের কুসুম লেই হয় ৷ কে বোঝাবে বোকা আতাকে !
-এই আতা জল দে শিগগির ! ন্যাকামি করে বাড়ি ডাকিস ! খাবারের সঙ্গে জল দিতে হয় জানিস না ?
কাচের গ্লাসে আন ৷ যা ...৷ ধুয়ে নিবি ৷ বড্ড নোংরা তোদের গ্লাস ৷ কাচ দিয়ে নিচের ময়লা যদি দেখি আজ ....!
তাহলে ওর বিনুনিটা টেনে খুলে দিবি নলিনী ৷
- দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল শুভেন্দু ৷ কলকাতায় পড়ে ৷ শনিবার করে বাড়ি আসে ৷ রবিবার সকাল থেকে নলিনী আতার সঙ্গে ক্যারাম খেলে ৷ দুপুরে মায়ের পাঁচরান্না খেয়ে পেছনের রাজার বাড়ির দালানে বসে সেতার বাজায় ৷ একটি মাত্তর ল্যাম্প দোলে ৷ বাজাবার সময় দাদার মুখ না দেখে কী যে অস্বস্তি হয় আতার !
বেণীতে টান পড়ল ৷ আতা জানে দাদা এবার বেণী নিয়ে লেচি পাকাবে ৷
-- দাদা ছাড় ৷ বৈকালে দুধভর্তি চা পাবে না কিন্তু !আতা চোখ পাকাল ৷
গলায় ডিম নিয়ে হেসে ফেলল নলিনী -
ঠিক বলেছ শুভেন্দুদা ৷ জানো , গতহপ্তাতেও ও দু বেণী করে স্কুলে গেছে ৷ আজ এসে দেখছি ,ওমা !
একবেণী করে ফুল গুঁজেছে ৷ কী ফুল রে ! ধুতরা না ঘেঁটু ?
-
আতা দেখল নলিনীদিদির পদ্মচোখ গোক্ষুর হয়ে গেছে ৷ গোক্ষুরের চোখ কতবার বাগানে দেখেছে ! আতা হাঁ করে চেয়ে আছে ৷ কুসুম গলায় আটকে এতক্ষণ তো বেশ কষ্টই হচ্ছিল নলিনীদিদির ! শরীরের কষ্টে চোখের দৃষ্টি এমন করে বদলাল কখন !
জল দিয়ে ধীরে ধীরে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় ৷ আজ আর নলিনীদিদির সঙ্গে কথাগুলো বলা হল না ৷ কবে বলবে ! এবার ভাইফোঁটায় তারা দুজন একসঙ্গে দাদাকে ভালো কিছু গিফট করবে ঠিক করেছে ৷ নলিনীদিদি নিতে না চাইলেও সে দামের অর্ধেকটাই দেবে ৷ মাসি এবার পুজোয় জামা না দিয়ে টাকা দিয়েছে ! সেই টাকা মায়ের কাছে জমা রেখেছে আতা ৷ কিন্তু গিফটটা ঠিক করতে হবে তো ! নলিনীদিদির কি কোনো ভ্রূক্ষেপ আছে ৷ দাদা নাহয় কিছু জানে না ৷ একটা ছুটির দিন এসে বাড়ি বাগান সব কথায় ভরিয়ে দিচ্ছে ! কিন্তু তুমি নলিনীদিদি ! তুমি সব ভুলে , এমনকি বিষমটাও ভুলে এখন গল্পে মেতেছ ! পুজো এসে যাচ্ছে ৷
মফস্বলের দোকানে ভালো জিনিস আগে অর্ডার দিতে হয় ! লক্ষ্মীপুজো অব্দি হয়ত দোকানগুলো বন্ধ থাকবে ! তাহলে তো অর্ডার দু একদিনের মধ্যে দিতে হবে ! নাহ ! এখন রাগ করলে চলবে না ৷
--ও নলিনীদিদি ৷ আজ কী বলবে বলেছিলে ...?
ওদের হাসির শব্দ নিজের কথা নিজের কানে পৌঁছল না ৷
শরতের রোদ চড়েছে ৷
ঠাকুমা বলতেন -আতামণি ও আমার আধমনি আতামণি , শরতের রোদ অত
হাঁ করে দেখোনি বাপু ! ও রোদে চোখ কানা হয়ে যাবে গো মণি !
ঠাকুমার অনেক কথাই বুঝত না আতা ৷ কখনো ননী ফণী কখনো নলিনীদিদির সঙ্গে খেলার টানে বুঝতে হয়ত চাইতও না ৷ তারই মাঝে কোনো কোনো দিন আতার হয়ত পাকামি করতে ইচ্ছে করত !
- কেন গো ঠাকমা ? সবাই যে বলে , আলো দেখলে চোখ ভালো থাকে ৷ তোমার যত উল্টোপাল্টা কথা !
সুধাময়ী হাসতেন ৷ আতার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কী যেন বলতেন ! কী যেন ....
নাহ আর কিচ্ছু মনে পড়ছে না আতার ৷ ঠাকুমা গেছে পাঁচবছর ৷ পনেরো বছরে দশবছরের কথা আলাদা ভাবে কিছুতে মনে করতে পারে না আতা ! চোখের জল মুছতে গিয়ে আতা দেখল , পরিমাণ
অল্প ৷ মাত্তর দু ফোঁটা দু কোলে জমেছিল ৷ কার কথায় ,তা ঠিক ধরতে পারল না আতা ৷
যাক ৷ লাইনারটা গলবে না তাহলে ৷
পুজোর জন্য কিনেছে ৷ আজ একটু টেস্ট করার জন্য চোখে লাগিয়েছিল ৷ মা কিনে দিয়েছে ৷
সস্তার লাইনার ৷ ওয়াটার প্রুফ নয় ৷
২
সপ্তমীর চাঁদে দ্রুত পা ফেলছে আতা ৷ গৌরী পিসির পুজোর শাড়িটা পৌঁছে দিতে হবে ৷ এবার পিসির শাড়িটা খুব সস্তার কিনেছে চিন্ময় ৷ টাকার খুব টান ৷ কোভিডের সময় থেকে ফুলওয়ালাদের বাজার সেই যে ডাউন হওয়া শুরু হয়েছে আর বাড়েনি ৷ বাজারে চিন্ময়ের ফুলের দোকান এখন ননী ফণীর বাবা ভাড়া নিয়ে মুদির জিনিসপত্তর রাখে ৷ মাঝে মাঝে পুরোনো মুদিদের সঙ্গে দেদার ঝগড়া করে ননী ফণীর বাবা হরেনকা ৷ চাকরি হারিয়ে হরেনকা এখন মুদি হতে মরীয়া ৷ আতা সেদিন বন্ধুদের খাওয়াবে বলে সত্তরটাকার একটা সেলিব্রেশন কিনতে গিয়েছিল ৷ হাতে পঞ্চাশ মতো ছিল ৷ দিল না হরেনকা ৷ আতা পটানোর শেষ চেষ্টা করেছিল -
ননী ফণীকেও দেব কাকা ৷ নাহয় ওদের দুটুকরো করে দেব ৷ দাও না ! কুড়ি টাকা পরে দেব , প্রমিস ৷ বাবা দিয়ে দেবে ৷
খিঁচিয়ে উঠেছিল ননী ফণীর বাবা -
যা যা তোর বাবা দুটো মেয়েমানুষ নিয়ে এখন কাক হয়ে গেছে ৷ এর ওর খুবলে সংসার চালায় ৷ তোর ক্যাডবেরির দাম যোগাতে ওর হাফপ্যান্ট হলদে হয়ে যাবে ৷
ফণী পাশে ছিল ৷ বাবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিচ্ছিরি করে হাসল -
চ চ আতামণি ৷ স্টেশনের দোকানের লজেন্স কিনি চ ৷ বা চ দত্তপুকুর যাই ট্রেনে ৷ ট্রেনের লজেন্স খেতে খেতে ৷
ফণীর গালে দুটো চড় মেরে চলে এসেছিল আতা ৷ ফণীর হাসি তখনো কানে ৷ ছেলেটা জানে ,বাবার
নিন্দে শুনলেই আতার কান লাল হয় ৷ তবু খেপাবে ! গৌরী পিসি আর বাবাকে নিয়ে খেপাবে ! নলিনীদিদি আর দাদাকে নিয়ে খেপাবে ৷ কতবার আতা বলেছে -
ফণী শান্ত হয়ে দাদার সেতার শোন একদিন ৷ দেখবি অঙ্কে মন বসবে ৷
ফণীর সেই এক কথা !
- কেন তোমার নলিনীদিদি তো শোনে ! হ্যাঁ রে আতা তোর দাদা ইচ্ছে করে পেছনের বারান্দার লাইটটা কম পাওয়ারের করে রেখেছে ! তাই না ? আরে বল না ! হাঁদু একদম ! বল না ! আমি তো তোর ক্লোজ !
বার বার চড় খায় ফণী ৷ আর বারবার ফণীর হাসি
জমা হয় আতার কানে !
আতা কাঁদে !
- ফণী তোর এই হাসি কানে নিতে পারি না ৷
ফণী শয়তান ৷ হেসেই যায় -
গাছের খোল ভরে দেব এবার কানে ৷
মনে হতে হেসে ফেলল আতা !
ছেলেটা নোংরা হলেও স্ট্রেন্থ আছে বেশ ৷
নাহ ! গাছের মতো শক্ত হতেই হবে আতাকে !
এই যে বাবা বাঁধা মেয়েমানুষের পুজোর বাজার
আতার হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিল , সে নরম বলেই না ! যে মাসে পিসির খরচ দিতে দেরি হবে কি টাকাটা কম হয়ে যাবে , আতা যা ...আতা এবারটুকু যা !
সুধাময়ীর চিন্ময় গৌরী রাখা শুরু করেছিল মা চলে যাবার পর ৷ গৌরীর পুরু ঠোঁট , কড়া চোখ , লিকারের মতো গায়ের রঙ হঠাৎ খুব টেনেছিল ৷ সেই থেকে গৌরীর ঘরের ভাড়ার অর্ধেক দেয় , শাড়ি ব্লাউজ ব্রা প্যান্টি কিছু কিছু কিনে দেয় আর চোদ্দবার গৌরী গৌরী করে ডাকে ৷ গৌরী চিন্ময়ের ব্যাপারে খুব আত্মবিশ্বাসী ৷ সে জানে দাম্পত্যকে সতেরো বছর ধরে পুরোনো করে যে তার কাছে এসেছে , সে থেকে যাবে ৷ পুরো অনন্ত না হলেও , কিছুদিনের মতো অনন্ত সে হবেই ৷ চিন্ময় চারবার ডাকে , গৌরীর উত্তর একবার ৷
হি হি হি ...
সপ্তমীর অল্প চাঁদ রাস্তায় ছড়িয়েছে ৷ তার মধ্যেই হাসতে লাগল আতা ৷
গৌরীর বারান্দায় ঘরের আলো পড়েছে ৷ বসে বসে চা খাচ্ছিল গৌরী ৷ টোস্ট বিস্কুটের কুড়কুড় আওয়াজ ৷ আতাকে অফার করেছিল ৷ আতা নো
করে দিয়েছে ৷ বাবার বান্ধবীর সঙ্গে চা খাওয়া বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে ! মায়ের চেপে থাকা ঠোঁট খালি চোখে ভাসে ! সবথেকে ভয় ফণী ! আর কেউ কিছু না বলুক , ফণী নেবে একহাত ! ওর দাদাটা যেমন শান্ত ফণীটা তেমনি পাকু !
--পিসি , শাড়িতে ফলস লাগিয়ে দিয়েছি ৷ তাই সপ্তমী হয়ে গেল গো ! বাবা সেই কবে থেকে বলছে ,যা আতা দিয়ে আয় ৷ তোর গৌরী পিসির এই একটাই শাড়ি হয় ৷ ওই আমি যা দিতে পারি তাই শুধু পরে ! এতো দেরি করলে চলে ! কী বলব বল পিসি ! ফলসের মেয়েটা আজ কাল করতে করতে একেবারে সপ্তমী করে ফেলল ! কালার পছন্দ হল ? দেখো না ভাল করে ...
--ঘরে গিয়ে দেখব ভালো করে ৷ এখন উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না ৷ চা না খাস , দুটো টোস্ট বিস্কুট খা ৷ আজকাল টোস্ট বিস্কুটকে কী বলে জানিস ! ড্রাই কেক ৷ রঙ্গ কত ....লেড়ো আবার কেক ...
আতা উঠে পড়ল ৷ যাওয়ার পথে একটু সাদা তেল নিতে হবে ৷ অষ্টমীতে তারা ভাত খায় না ৷ কাল পরোটা হবে ৷ চলে যেতে গিয়েও থামল আতা ৷
সাইড ব্যাগের চেন টানল ...
-ও পিসি ৷ এই জিনিসটা একটু দেখো তো ! এখনো টাকা দিই নি ৷ তুমি ওকে করলে তবে ...
টেবিল ল্যাম্পটা হাতে নিল গৌরী ৷
- বাহ ! কত বড় রে ! কোথায় লাগাবি ?
- কোথাও না ৷ দাদাকে দেব ভাইফোঁটায় ৷ দাদা যখন বারান্দায় সেতার বাজাবে তখন একটা টুলের ওপর বসিয়ে জ্বালিয়ে রাখবে ! ভালো হবে না পিসি ? বাজনা বাজাবার সময় দাদার মুখটা ভালো করে
দেখতে পাব ৷ একটা গিফট কাগজ এনেছি ৷ মুড়িয়ে দেবে ?
গৌরী দ্রুত হাতে ল্যাম্প প্যাক করে বলল -
মা প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে থাকে তো বার কর ব্যাগ থেকে ৷ তেল আমি দিয়ে দিচ্ছি ৷ আমারও লুচি ৷ তোর বাবাই চালু করেছে ৷ আর দোকানে যেতে হবে না ৷ তেল নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি যা ৷
একগাদা খরচ করে টেবিল ল্যাম্প কিনে মরলি !
মা একটুও দেখে না ...
-আদ্ধেক নলিনীদিদি দেবে ৷ বাকি মাসীর দেওয়া পুজোর টাকা থেকে ...
বোতল টেবিলল্যাম্প নিয়ে গেট পেরোচ্ছে আতা ৷
-অন্ধকার ৷ মাটির দিকে তাকিয়ে চল ৷ রাস্তায় কি টেবিলল্যাম্প জ্বালাবি !
গৌরীর ঝাঁঝালো গলায় উদ্বেগ ৷
বাড়ির একটু দূরে ফণী পাকড়াল ৷ ননী হাসছে মিটিমিটি ৷ মুখ খোলার আগেই টেবিলল্যাম্প ছোঁ ৷
- কার জন্য আতা ? আমার না ননীর ?
-ইয়ার্কি করবি না ৷ দে ..ভেঙে যাবে বলছি ৷
ফণী লুকিয়ে গেছে রাজবাড়ির পাঁচিল টপকে ৷ এ বাড়ির শরিকরা ছড়িয়ে গেছে গয়া ,কাশি , হিউজটন ৷ তবে গতবছর থেকে উত্তরের চাতালে
খেলাধুলোর অধিকার পেয়েছে পাড়ার ছেলেমেয়েরা ৷ ননী ফণীর সঙ্গে কেশর বিল্টু ঝিমলি সবাই খেলে এখানে ৷ জায়গাটা পালা করে পরিষ্কার রাখে ৷ আজ ফণী আতার চাতাল ঝাঁটাবার ডেট ছিল ৷
কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে কোথায় লুকোল ফণী ! সাপ খোপ থাকলে ....!
আতা আর ননী চাতালে এল ৷
ফণীর সাড়া নেই ৷ আকাশ দেখল আতা ! ওমা ! চাঁদ তো যে কে সেই ৷ সরু হয়ে আলো দিচ্ছে ৷ এখানে পৌঁছচ্ছে না কেন !
-- এই ফণী ৷ আয় না বেরিয়ে ৷ আমাদের ভয় করছে ৷
শক্ত করে ফণীর দাদার হাত চেপে ধরেছে আতা ৷ পেয়ারা আর পেঁপের গুঁড়িতে দড়ি
বেঁধে টানটান নেট ৷
ওহ ! বড় গাছের পাতায় আটকে গেছে নেট ৷ তাই বলি ! আকাশের চাঁদ গেল কোথায় ! ননীদা তোর ভাই এত বকে ! তুই ওকে বকতে পারিস না ! ফণী কি তোর দাদা যে তুই ছোট ভাই সেজে থাকিস ! ডাক ওকে ...জোরে জোরে ডাক ..ধমক মার !
উম্মহ ...!
একদলা গরম চুমু আতার গালে ৷
শান্ত চোখে ননী ৷
এই মুহূর্তে ভাইকে খোঁজার তাড়া নেই ৷
আতা দেখতেই চাইল না ,চুমু দিল কে !
ইচ্ছে করছিল না আরকি !
৩
বোন নেই বলে ভাইফোঁটার দিন চিন্ময়ের কোনো চাপ নেই ৷ বড়লোক শালাগুলো বোনটাকে ডেকে নেয় বাড়িতে ! আতা কতবার বলেছে মামাদের -
এবার ভাইফোঁটা আমাদের এখানে হোক না মামা ৷ আমি আর নলিনীদিদি তো দাদার জন্য রান্না করিই ৷ তোমাদের জন্যও করব ৷ মা নাহয় সারাদিন তোমাদের সঙ্গে গল্প করবে ! আমরা তোমাদের পাত সাজিয়ে ডাকব একেবারে !
ফোনের ওপারে মামার হাসি পায় আতা ৷ আর যথারীতি ভোর হতে না হতে চান টান করে মা হাঁটা দেয় মামার বাড়ি ৷ আতা একটু দুঃখ পেলেও চিন্ময় হাঁফ ছাড়ে ৷ এ দিন সে শুধু আতার ৷ মেয়ের পছন্দমতো বাজার করে ৷ মেয়ের কূটনো কাটায় ছুরি নিয়ে বসে যায় ৷ পিঁয়াজ সুধাময়ীর নাতনি
সহ্য করতে পারে না ৷ চিন্ময় চূড়ো করে পিঁয়াজ কেটে লাল করে ভেজে দেয় ৷ বাকি কিছু নলিনী কখনো বাড়ি থেকে আনে ৷ কখনো এবাড়িতে এসে ফের গ্যাস জ্বালে ৷ চিন্ময়ের ছেলেটার খাওয়ার খুব জুত ৷ ভাইফোঁটায় দু বোন শুধু পরস্পরকে সারপ্রাইজ দিয়ে যায় ৷ কী
যে সারপ্রাইজের ঝোঁক এদের ৷ ফোনে মেনু ঠিক হয়ে গেল ! তারপরও নলিনী এসে টিফিনকৌটো
খুলে বলে -
এই দ্যাখ আতা ! আমড়া পোস্তর টক করেছি ৷ শুভেন্দুদার খুব পছন্দ ! তোর তো মনেই ছিল না !
কেমন সারপ্রাইজ দিলাম !
আতাও কম যায় না ৷ সঙ্গে সঙ্গে পিঁয়াজ দিয়ে পোস্তভাজা ঢেলে দেয় দাদার পাতে
আমারও আছে নলিনীদিদি ৷ আমারও পোস্ত সারপ্রাইজ !
চিন্ময় দুটোই পায় ৷ খাওয়ার শেষে জর্দা পান চিবোয় ৷ পানের দায়িত্ব নলিনীর ৷ নলিনীর পানে দামি জর্দা ভুরভুর করে ৷ নলিনীর বাবা প্রফেসর ৷ শুভেন্দুর খারাপ রেজাল্টের পর তিনি শুভেন্দুকে নিজের কলেজে ভর্তি করেছেন ৷
আজো পান চিবোতে চিবোতে ওঘরে নলিনী শুভেন্দুর গলা পেল ৷ কী নিয়ে যেন খুব হাসছে ওরা ! ছেলেমানুষের মতো তিনটে কিশোরের খেলায় ঢুকতে চাইল চিন্ময় !
ঘরে শুধু নলিনী আর শুভেন্দু ৷ নতুন একটা শার্ট
গায়ে ফেলে মাপছে নলিনী ৷
-কী গো শুভেন্দুদা ? আরেক সাইজ বড় নেব তাহলে ....
চেঞ্জ করলে ভালো হয় নলিনী ৷ এতো দামি ব্র্যান্ড ..
ঠিকঠাক সাইজ না হলে ...
--ওকে ডান ৷ চল বিকেলে দুজনে মিলে পাল্টে আনব ! আতা ...কই গেলি ...আরে টেবিলল্যাম্পের আদ্ধেক যা দেব বলেছিলাম দেব তো ...শোন এদিকে ...
নলিনী খুঁজছে আতাকে ৷ আরে পায়েসটা এবার দিতে হবে তো শুভেন্দুদাকে !
চিন্ময় দেখল ,খাটের একপাশে টেবিলল্যাম্প।মোড়ক খোলা হয়নি অবশ্য ! শুভেন্দু আরো একবার জামার মাপ দিতে শুরু করেছে !
৪
বিশুদা বিরক্ত হল -
দামের ট্যাগ খুলেছ কেন ? ট্যাগ খুললে ফেরত হয় না জানো না !
-প্লিজ বিশুদা ৷ আমি তো টাকা চাইছি না ৷ ওই দামে তিনটে দোলানো ল্যাম্প কিনব ৷
আতার গলা ঝকঝকে ৷
বিশুর বিরক্তি কাটেনি -
ওতে কিন্তু বেশি পাওয়ারের বাল্ব খাটবে না ৷ আবার ফেরত দিতে আসবে না তো ?
-না ফাইনাল এবার ৷ তুমি বাল্ব গুলো ফিট করে দাও একেবারে ৷
তিনটে ঝোলানো ল্যাম্প নিয়ে বেরিয়ে এল আতা ৷ একটা লাগাবে পিছনের বারান্দায় ৷ ওদিকে কুয়ো আছে ৷ একটা এক্সট্রা আলো থাকা ভালো ৷ মা রাতের দিকে কুয়োর জলে একবার চান করবেই ৷
আরেকটা লাগাবে রাজবাড়ির চাতালে ৷ শীত আসছে ৷ ওহ ! সকাল সন্ধে শুধু ব্যাটমিন্টন আর ব্যাটমিন্টন ৷ কী মজা !কীইই মজা ! ভাবতে গিয়ে ছোট্ট ছোট্ট লাফ দিচ্ছে আতা ! আর কেশর ফণী বিল্টুরা যা চালু , ঠিক পাশের বাজার থেকে লাইন টাইন টেনে ব্যাপারটা করে ফেলবে ৷ আর একটা বাবাকে দিয়ে দেবে ৷ বাবা ঠিক দিয়ে আসবে ৷ সবার আগে তিনটে ল্যাম্পের সঙ্গে একটা সেলফি ৷ খিচিক ...!
ভাগে ব্যস্ত সুধাময়ীর নাতনী ৷
Comments :0