গল্প
নতুনপাতা
--------------------------
ফিরতি পথের গল্প
--------------------------
সায়ন সরকার
শহরের পাথুরে জীবন আর অফিসের কাজের চাপে ইরফান ভুলেই গিয়েছিল শেষ কবে সে গ্রামের বাড়িতে নিজের আপনজনদের সাথে ঈদ করেছে। প্রতিবারই ভাবে যাবে, কিন্তু কাজের দোহাই দিয়ে শহরেই একা একা দিন পার করে দেয়। কিন্তু এবার তার মা ফোনে কেঁদে ফেললেন। মা বললেন, "বাবা রে, তোর বাবা অসুস্থ, আমি বুড়ো হয়েছি। তুই না আসলে এবার আমাদের ঘরে ঈদের চুলা জ্বলবে না।" মায়ের সেই কান্নার শব্দে ইরফানের বুকটা কেঁপে উঠল। সে ঠিক করল, এবার সে বাড়ি যাবেই।
ঈদের আগের রাতে বাসের ছাদে করে ভিড় ঠেলে যখন ইরফান গ্রামের স্টেশনে নামল, তখন রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটছে। মাটির সেই চেনা মিষ্টি গন্ধ নাকে আসতেই ইরফানের চোখে জল এসে গেল। সে ভাবল, "এতদিন এই শান্তি ছেড়ে আমি কোথায় ছিলাম?"
বাড়িতে ঢোকার মুখেই দেখল বাবা লাঠি হাতে গেটে দাঁড়িয়ে আছেন। ইরফানকে দেখেই বাবার হাতটা কাঁপতে লাগল। মুখে কিছু না বললেও বাবার ভেজা চোখ বলে দিচ্ছিল তিনি কতটা খুশি হয়েছেন। ইরফান নিচু হয়ে সালাম করতেই বাবা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। বাবার খসখসে হাতের ছোঁয়ায় ইরফান এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পেল।
ঘরে ঢুকে ইরফান দেখল মা জায়নামাজে বসে দোয়া করছেন। ইরফান গিয়ে চুপিচুপি মায়ের পাশে দাঁড়াতেই মা তাকে দুই হাতে বুকে টেনে নিলেন। মা বললেন, "তোর জন্য জর্দা সেমাই আর পায়েস রেঁধেছি। তুই হাত-মুখ ধুয়ে আয়, নাস্তা করবি।" ইরফানের মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার বুঝি এই মায়ের হাতের সেমাই।
ঈদের নামাজ পড়তে ইরফান যখন ছোটবেলার সেই ঈদগাহে গেল, তখন দেখল পুরনো সব বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরেছে। নামাজ শেষে সবার সাথে কোলাকুলি করার সময় ইরফানের মনে হলো, সে যেন আবার সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে ফিরে গেছে। বাড়ি ফিরে সে দেখল উঠোনে পাড়ার ছোট ছোট বাচ্চারা 'ঈদ সেলামি'র জন্য ভিড় করেছে। ইরফান পকেট থেকে নতুন টাকার নোট বের করে তাদের হাতে দিতেই তাদের মুখে যে হাসি দেখল, তাতে তার কলিজা জুড়িয়ে গেল।
দুপুরে মা নিজের হাতে ইরফানকে খাইয়ে দিলেন। অনেক বছর পর ইরফানের মনে হলো সে পেট ভরে ভাত খাচ্ছে। বিকেলের দিকে ইরফান তার পুরনো বন্ধুদের সাথে নদীর পাড়ে গিয়ে বসল। সেখানে আড্ডা আর হাসাহাসির মাঝে সে তার সব শহরের ক্লান্তি ভুলে গেল।
রাতের বেলা যখন চারদিকে নিঝুম শান্তি, ইরফান আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবল—আমরা কত বোকা! সারা জীবন টাকার পেছনে ছুটি, কিন্তু আসল সুখ তো লুকিয়ে আছে মা-বাবার দোয়ায় আর নিজের ভিটেমাটির টানে। ইরফানের চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছিল, কিন্তু সেটা কষ্টের নয়, চরম সুখের। এই ঈদ ইরফানকে নতুন করে বাঁচতে শেখাল।
দ্বাদশ শ্রেণী, কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা, পাতুলিয়া, খড়দহ
Comments :0