বুধবার মণিপুরের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন প্রাক্তন বিধানসভার স্পিকার ও মন্ত্রী ইয়ামনাম খেমচাঁদ সিং। বিজেপি ৬২ বছর বয়সী মেইতেই সম্প্রদায়ের নেতাকে নতুন দিল্লিতে বিধানসভা দলের নেতা হিসেবে ঘোষণা করার একদিন পরই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। লোক ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল অজয় কুমার ভাল্লা নতুন মুখ্যমন্ত্রী, দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী এবং আরও দুই মন্ত্রীকে শপথ বাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণকারী অন্যান্য মন্ত্রীরা হলেন বিজেপির নেমচা কিপগেন এবং গোবিন্দদাস কন্থুজাম, নাগা পিপলস ফ্রন্টের লোসি ডিখো এবং রাষ্ট্রীয় জন পার্টির খুরাইজাম লোকেন সিং। নয়াদিল্লির মণিপুর ভবন থেকে অনলাইনে উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন প্রাক্তন মন্ত্রী নেমচা কিপগেন। নাগা পিপলস ফ্রন্টের বিধায়ক লোসি ডিখো শপথ গ্রহণ করেন। সাতটি মন্ত্রী পদ শূন্য থাকায় খেমচাঁদ সিং-এর নেতৃত্বাধীন সরকার পরে সম্প্রসারিত হবে।
সিং ৬২ বছর বয়সী ইয়ামনাম খেমচাঁদ সিং ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মণিপুর বিধানসভার স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালে তিনি এন. বীরেন সিং-এর মন্ত্রিসভায়ও অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর তিনি নগর প্রশাসন ও গৃহায়ন উন্নয়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং পঞ্চায়েত মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। খেমচাঁদ সিং ইম্ফল পশ্চিমের সিংজামেই বিধানসভা কেন্দ্রের একজন বিধায়ক। সেখান থেকে টানা দুবার জয়ী হয়েছেন তিনি।
প্রসঙ্গত: ২০২৩ সালের মে মাস থেকে মণিপুরে জাতি সংঘর্ষ শুরু হয়। মেইতেই ও কুকিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ইতিমধ্যে তিনশোর বেশি খুন হয়েছেন। শতাধিক মহিলা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দুই লক্ষাধিক মানুষ ঘরছাড়া হন। এখনও ৫০-৫৫ হাজার মানুষ ঘরছাড়া। হিংসা পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠে যে বাধ্য হয়ে বীরেন সিংকে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে মন্ত্রীসভা ভেঙে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে বাধ্য হন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ। গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বীরেন সিং মুখ্যমন্ত্রী পদে ইস্তফা দেন। এর পাঁচদিন পর ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। তবে বিধানসভা ভেঙে দেয়নি। ছয়মাস পর গত আগস্ট মাসে রাষ্ট্রপতি শাসনের মেয়াদ আরও ছয়মাস বাড়ায় কেন্দ্র। এর মেয়াদ আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এর আগে সরকার গঠন করে রাষ্ট্রপতি শাসন তুলে নেয় কেন্দ্র। মণিপুরে হিংসা জিইয়ে রেখে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির এক বছরের মাথায় বিজেপি, মেইতেই ও কুকি বিধায়করা মিলে ফের সরকার গঠন করছে।
জোড়াতালি দিয়ে আবার সরকার গঠন করতেই ফের অশান্ত হয়ে উঠেছে মণিপুর। রাজ্যের কুকি নিবিড় জেলাগুলিতে পথ অবরোধ, অগ্নিসংযোগের ঘটনা শুরু হয়ে গিয়েছে। এমনকি বুধবার রাতে রাজধানী দিল্লিতে মণিপুর ভবনের সামনে নয়া সরকারের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন কুকি ছাত্র-যুবরা।
জানা গিয়েছে, নতুন সরকারের উপ মুখ্যমন্ত্রী কুকি গোষ্ঠীর বিজেপি বিধায়ক নেমচা কিপজেনকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন তাঁরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে মণিপুর ভবনের সামনে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। নেমচা কিপজেনকে নিরাপত্তা রক্ষীরা গোপন স্থানে নিয়ে গিয়েছে বলে খবর। আবার মণিপুরে নেমচা কিপজেন সহ যে দুই কুকি বিধায়ক নয়া সরকারকে সমর্থন করেছেন, রাতে তাঁদের বাড়িতে হামলা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। তাছাড়া, পশ্চিম ইম্ফল, কাঙপকপি, চুরাচাঁদপুর জেলায় পথ অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও আসাম রাইফেলস মোতায়েন করা হয়ছে। নয়া সরকারের বিরোধিতায় সরব হয়েছে সবকটি কুকি সংগঠন।
মুখ্যমন্ত্রী সহ দুই মন্ত্রী মেইতেই গোষ্ঠীর। কুকি ও নাগা গোষ্ঠী থেকে দুই উপ মুখ্যমন্ত্রী পদ দিয়ে দুই গোষ্ঠীকে বাগে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বিজেপি’র কুকি বিধায়কদের অর্ধেকই নয়া সরকারকে সমর্থন করবেন না বলে ঘোষণা করেছেন। একইসঙ্গে, আরেক শরিক কুকি ইনপি নয়া সরকারের বিরোধিতায় সরব হয়েছে।
Comments :0