Post Editorial

অনেকেরই বড় আশা প্রত্যাশা ছিল

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

জহর সরকার
 

বাংলার ভোটাররা নিশ্চিত খুব আশ্চর্য হয়েছেন এবং একই সঙ্গে দুঃখও পেয়েছেন, যখন তাঁরা দেখলেন, আগের সরকারের অংশ যাঁদের দুর্নীতি ও তোলাবাজির জন্য তাড়িয়েছিলেন, তাঁরাই এখন দল বদলে বহাল তবিয়তে বর্তমান সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় রয়েছেন, বিনা অস্বস্তিতে।
যাঁরা সত্যিই মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন, নবাগত সরকার তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ করুক, তাঁরা এতেই প্রথম ধাক্কা খেলেন। এরসঙ্গে আবার তোলাবাজি শুরু হয়ে গিয়েছে, আর নতুন সরকারের কাছে ভূরি ভূরি অভিযোগ আসছে যে, এই ধান্দায় এখন তাঁদের সমর্থকরাও জড়িয়ে আছেন।
এর ঠিক পর হতভম্ব জনতা দেখল, নতুন সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে হকার উচ্ছেদে। বাংলা অবাক হয়ে দেখল নতুন বুলডোজার রাজ, সে রেলের প্ল্যাটফর্মে হোক বা রাস্তায়, যার ফলে স্বল্পআয়ের বহু মানুষ ভাতে মার খেল। আবার টিভিতে দেখা গেল, এক মন্ত্রী মহোদয়া, ফুটপাত থেকে রোজ হকার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। এই উদ্যমে কোনও ভাটা পড়ার আগেই ঘটল আরেক ঘটনা। ফুটপাতে একজন গরিব মা তাঁর শিশুর জন্য একটু দুধ গরম করছিলেন বলে তাঁকে ভর্ৎসনা করে উৎখাত করে দেওয়ার ঘটনা কিন্তু সাধারণ মানুষ একেবারেই পছন্দ করেনি।
এইসবের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী বকরি ঈদের আগে যে ভাবে মুসলিমদের গোহত্যা নিয়ে কোণঠাসা করেছেন, তার জবাবে সংখ্যালঘুরা গোরুকে জাতীয় পশু হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুললেন। ফলে মার খেল হিন্দুদেরই একটি বড় অংশ, যাঁরা যুগ যুগান্তর ধরে ঈদের আগে তাঁদের বৃদ্ধ গোরুগুলিকে বেচে নতুন বাছুর কিনে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করে এসেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর পরের পদক্ষেপ রাজ্যের ওবিসি তালিকার বিপুল সংশোধন এবং ৭৭টি মুসলিম গোষ্ঠীকে তালিকা থেকে বের করে দেওয়া। আর এক ধাক্কায় ওবিসি সংরক্ষণকে নামিয়ে আনলেন ১৭ থেকে মাত্র ৭ শতাংশে।
তাঁরই নির্দেশে শ’য়ে শ’য়ে মুসলমানদের ধরে হাকিমপুর ও অন্যান্য সীমান্ত চেকপোস্ট দিয়ে জোর করে পার করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার কাজ শুরু হলো। এদিকে বাংলাদেশ নো ম্যান্‌স ল্যান্ডে পুশব্যাক করা এই মুসলিমদের বিনা প্রমাণে তাঁদের নাগরিক হিসাবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করল। তখন এই সব সহায়-সম্বলহীন মানুষরা দিনের পর দিন দুই দেশের মাঝের জমিতে চরম অসুবিধার মধ্যে আটকে পড়লেন। তাঁদের দুর্দশার খবর আন্তর্জাতিক মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল, আর বাংলাদেশকে ঠেলে দিল চীন ও পাকিস্তানের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই কাণ্ডের পর চীন জানিয়ে দিল, বাংলাদেশে মোংলা বন্দরে এবং ভারতের সীমান্তে লালমণিরহাটের বিমানঘাঁটিতে তারা বিনিয়োগ শুরু করবে। ৩ আগস্ট মুখ্যমন্ত্রী দাবি করলেন, পশ্চিমবাংলায় এক কোটি বেআইনি অনুপ্রবেশকারী আছেন এবং তিনি তাঁদের উচ্ছেদ করবেন। কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা করেও মাত্র পাঁচ হাজার বাংলাদেশি মুসলিমকেই ধরা সম্ভব হয়েছে, যাঁরা ভারতে বেআইনিভাবে প্রবেশ করেছেন। এতে কী প্রমাণ হয়, তা সাধারণ মানুষই বুঝে নেবে।
এখন পশ্চিমবাংলার মানুষ উত্ত্যক্ত হয়ে দেখছে নিরীহ ক্রিশ্চান সম্প্রদায়ের উপর এখানে কী নির্যাতন শুরু হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে কোথাও না কোথাও ভাঙচুর ও মারধরের খবর আসছে। এ তো আগে আমরা দেখিনি। এ বছর আবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দপ্তরের বরাদ্দ ৬২ শতাংশ কেটে দেওয়া হয়েছে।
এই সরকার মমতা ব্যানার্জির লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভরতুকি দ্বিগুণ করে নতুন অন্নপূর্ণা যোজনা প্রকল্পের ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো চরম বিশৃঙ্খলা। আবেদন করার পদ্ধতি বদলে এক বিশাল আর জটিল দরখাস্ত ফর্ম চালু করার ফলে (আর আর্থিক কারণে) তিন-চার মাস ধরে অসংখ্য মহিলা টাকাই পেলেন না। তারপর জনরোষের মুখে সরকার ওই দরখাস্ত ফিরিয়ে নিল, কিন্তু ভাবমূর্তি যথেষ্ট নষ্ট হলো। এখনও পর্যন্ত এক কোটি ৪৮ লক্ষ মহিলা এই ভাতা পেয়েছেন, যা আগের জমানার তুলনায় প্রায় ৫০-৬০ লক্ষ কম। যাঁরা বাদ গেলেন, তাঁরা সকলে অযোগ্য বা বেআইনি অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দিলে, সরকারের নিজের অবস্থা নিরাপদ থাকবে কি! 
এরপর এক অল্পবয়সি পশ্চিম-ভারতীয় বাবাজি এসে বললেন, দুর্গাপুজোর সময় এখানে আমিষ খাওয়া যাবে না। বাঙালি ভণ্ড। এতে বিশাল দ্বন্দ্ব শুরু হলো। বিজেপি’র কিছু নেতা ও মন্ত্রী তাঁকে সমর্থন করায় বাংলায় এক বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হলো। সকলে ওই নিরামিষ-জেহাদিদের নিন্দা করায় খোদ মুখ্যমন্ত্রী বিপাকে পড়লেন। তাঁর নির্দেশেই কিছু প্রতিবাদীদের গ্রেপ্তার করা হলো, যাতে তাঁর ভাবমূর্তির ক্ষতি না-হয়। এতে অবশ্য উত্তর ভারতের বিজেপি নেতারা খুশি হলেন। এই ঘটনার পর থেকে মুখ্যমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীরা আমাদের দুর্গাপুজো নিয়ে কত উপদেশই না দিয়ে চলেছেন। সকলের শারদোৎসবকে সঙ্কীর্ণ করে শুধু হিন্দুদের দুর্গোৎসব করার প্রচেষ্টায় বাংলার মানুষ এখন রাগের চেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। আর এই পরিস্থিতিতে কিছু বড় নামী পুজো কমিটি ঠিক করেছে তারা এ বছর পুজোই করবে না। শেষে, অনেকে এই পুরো ব্যাপারটাকে একটা প্রহসন বা হাস্যরসাত্মক নাটক হিসাবে নিচ্ছেন, যাতে সরকারের নম্বর খুব দ্রুত গতিতে নিম্নগামী হচ্ছে।
আবার দেখা যাচ্ছে, বঙ্গ-বিজেপি’র অনেকেই এখন হিন্দিতে কথা বলা শুরু করেছেন, যা এই রাজ্যের মানুষ খুব একটা ভালো চোখে দেখছে না। হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে আমাদের কিছু বলার নেই, কিন্তু বাংলায় তার আধিপত্য মেনে নেওয়া অসম্ভব। যে নেতারা হিন্দিতে কথা বলছেন, তাঁদের প্রতি শুধু একটি নিবেদন, তাঁরা একটু ঠিক উচ্চারণ করুন এবং কথা বলার সময় ভাষার ব্যাকরণটি মাথায় রাখুন।
কিন্তু সাধারণ শিক্ষিত মানুষ সাংঘাতিক আঘাত পেল, যখন শুভেন্দু অধিকারী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এক কুরুক্ষেত্র কাণ্ড বাঁধিয়ে বসলেন। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আগেও অনেক বাক্‌বিতণ্ডা ও আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ভারতের এক অতি উৎকৃষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে গণ্য করা হয়। ইতিহাসে কখনও দেখা যায়নি, এক মুখ্যমন্ত্রী নিজে দলের একটি উগ্র মিছিল নিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে এত অমার্জিত ভাষায় ছাত্র ও অন্যান্যদের শাসিয়ে চলেছেন। এর ঠিক আগেই তাঁর সমর্থকদের একটি বলবান গোষ্ঠী এই প্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বারে এবং ভিতরে ভাঙচুর করে ও অভদ্র ভাষায় নিছক ভয়-প্রদর্শন করেছে। এই সব ঘটনা সত্যি অভূতপূর্ব। তার পর রাজ্যবাসী দেখল তাঁদের মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে দ্বিতীয় বার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এক বিশাল হিন্দু বাহিনী নিয়ে দাঁড়িয়ে অতি আক্রমণাত্মক ভাষায় হুমকি দিচ্ছেন। এই প্রথম রাজ্যের মানুষ দেখল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে বহু সংখ্যক অর্ধনগ্ন নাগা সাধু দাঁড়িয়ে আছেন, আর রাষ্ট্রযন্ত্র কী ভয়াবহ কট্টরবাদী রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় এই যে, বিজেপি সরকার আসার পর এখনও পর্যন্ত এই রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও বড় লগ্নির চিহ্ন নেই। ৪৯ বছর পর একই দল দুই সরকার চালাচ্ছে, যাকে মোদীজি বলেন "ডবল ইঞ্জিন সরকার"। এইটুকু কি এখনও প্রত্যাশা করা যায় না? আর এত দিন ধরে যাদের নেতিবাচক বলা হয়েছে তারা তো কেউ নেই—তবে বৃহৎ পুঁজির লগ্নি নিয়ে তো এখনও কেউ কিছু বলছে না। নিউটাউনের একটি হাসপাতালের কথা বলা হচ্ছে, যার বিনিয়োগের অর্থ ২০০-২৫০ কোটি টাকা, কিন্তু একই আদানি গোষ্ঠী ওডিশায় এই হালে অ্যালুমিনিয়াম প্রকল্পে এক লক্ষ দশ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এ ছাড়া আরেকটি ক্লাস্টারে একগুচ্ছ প্রকল্পের জন্য আদানি গোষ্ঠীর বরাদ্দ হলো ২ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা। আম্বানির তো কোনও সাড়া শব্দই নেই। অবশ্য বাংলার একটি ইস্পাত কারখানা বলেছে, তারা ১৫,০০০ কোটি অতিরিক্ত লগ্নি করেছে, তো দেখা যাক কী হয়। এখন তো সবে পাঁচ মাস হয়েছে: এটা যেমন সত্যি, এটাও ঠিক যে ধর্ম-কর্ম নিয়ে ঝড় ওঠাতে এক মাসও লাগেনি। 
নির্বাচনের আগে শুভেন্দু অধিকারী প্রচুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা পূরণ করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। তাও এই সরকারের বাজেটে প্রায় ৪.৩৯ লক্ষ কোটি টাকার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তার মধ্যে ৫৫ হাজার কোটি তো শুধু আগেকার ঋণ শোধ করতেই খরচ হয়ে যাবে। এই বাজেটের সাফল্য কেন্দ্রের অনুদান বৃদ্ধির উপর বিশেষভাবে নির্ভর করছে। গত বছরের এই  অনুদান ২২ হাজার কোটি ছিল, এবার ৭১ হাজার কোটি টাকার চেয়ে বেশি ধরা হয়েছে। এই বিষয়ে কেন্দ্র কী আশ্বাস দিয়েছে, তা আমরা জানি না, কিন্তু এ বছর ইরান যুদ্ধের পর, কেন্দ্রীয় সরকার শুধু  দেশের তেল, গ্যাস ও রাসায়নিক সারের দাম সামলাতে গিয়ে তার নিজের বরাদ্দের চেয়ে অন্তত ৩ লক্ষ কোটি টাকা বেশি খরচ করেছে। আরও অনেক বাজেট-বহির্ভূত খরচ করতে বাধ্য হবে। 
অতএব, তার পর একটি মাত্র রাজ্যকে অতিরিক্ত ৪৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার সামর্থ্য থাকবে কি না সন্দেহ। এজি বেঙ্গল, মানে এখন যাকে পশ্চিমবাংলার প্রধান গাণনিক বলা হয়, তার মাসিক হিসাব অনুযায়ী এ বছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত এ রাজ্য কেন্দ্রীয় অনুদান বাবদ মাত্র ১৩১৫ কোটি টাকা পেয়েছে, যা গত বছরের ২২০৬ হাজার কোটি টাকার তুলনায় অনেকটাই কম। এটা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়, কিন্তু এর পরেও নিশ্চয় বিজেপি’র কেন্দ্র, বিজেপি’র রাজ্য সরকারের অনুদান বাড়াতে পারে। তবে, গত বছরের তুলনায় সাড়ে তিন গুণের বেশি টাকা বাড়বে বলে মনে হয় না। ১৬ বছর দিল্লিতে কাজ করে এটাই বলতে পারি, কেন্দ্র বড্ড আবেগহীন। দেখা যাক, কিন্তু শুভেন্দুর সরকার যদি মমতা-সরকারের দ্বিগুণ অনুদান না পায়, তাহলে এত প্রতিশ্রুতির অনেকাংশই পূরণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।

Comments :0

Login to leave a comment