Post Editorial

ওরা ভয় পেয়েই ভয় দেখাচ্ছে

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

দেবাঞ্জন দে
 

সরকার গঠনের শুরু থেকেই বিজেপি'র টার্গেট একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ঠিক যেমন টার্গেট করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস, সেই একই পথ ধরে। কিন্তু এখানে মৌলিক উদ্দেশ্য এবং আক্রমণের মাত্রা বহুক্ষেত্রেই অনেক বেশি। ক্যাম্পাসে অপরাধ চক্রের আয়োজন ছিল তৃণমূলের এলাকা কন্ট্রোলের অংশ। এলাকার অপরাধ সিন্ডিকেটের হেডকোয়ার্টার হিসাবে এবং অনেক সময় অপরাধের টাকার ব্যাঙ্ক হিসাবে কাজ করতো ক্যাম্পাসের ইউনিয়ন রুমগুলো। বিপুল অঙ্কের দুর্নীতির টাকা এখান থেকে ছড়িয়ে পড়তো প্রশাসনের নানা ধাপে। কাঁচা টাকা আত্মসাৎ করাটাই তৃণমূল আমলের ক্যাম্পাস সিন্ডিকেটের মৌলিক চেহারা ছিল।
বিজেপি-আরএসএস আরও অনেক বেশি কিছু চায়। ক্যাম্পাসের খোলনলচে বদলে দেওয়া, ক্যাম্পাস যাপনের আমূল পরিবর্তনই ওদের লক্ষ্য। ক্যাম্পাসের পঠন-পাঠনের প্রক্রিয়া, ক্যাম্পাসের সামাজিক চরিত্র, কারিকুলাম, সিলেবাস, ক্যাম্পাস মনন সবটার ওপর আরোপ করতে চাইছে হিন্দুত্বের আগ্রাসী অ্যা জেন্ডা। এবার এই আরোপ করার ওপর স্বাভাবিকতার মোড়ক দিতে দরকার বিপুল অংশের  ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী আর শিক্ষার সাথে যুক্ত মানুষজনের সহমতের বলয়। সেই সহমত নির্মাণ করার ব্যাপক চেষ্টার পরেও সফল হচ্ছে না ওরা। তাই এখন উপায় ভয়, ভীতি, আতঙ্কের আবহে সেই সহমত জোর করে আদায় করে নেওয়া। 
বাংলায় ক্যাম্পাস অর্থেই মুক্ত চিন্তা, গণতান্ত্রিক বোধ, সাংবিধানিক মূল্যবোধ, প্রগতিশীল জীবনচর্চা, বৈজ্ঞানিক চেতনা নির্মাণের প্রাঙ্গণ। ক্যাম্পাস যাপনের অংশ হিসাবেই লেখাপড়া, খেলাধুলা, আড্ডাবাজির সাথে জুড়ে গেছে ক্যাম্পাস রাজনীতির পাঠক্রম। ক্যাম্পাস রাজনীতির এই ধারা থেকে জন্ম ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের বীর বিপ্লবীদের। জন্ম শিক্ষা, শিক্ষা সংস্কার, সমাজ সংস্কার আন্দোলনের। স্বাধীনতার স্রোতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও ফ্যাসিবিরোধী লড়াইয়ে দিকনির্দেশক ভূমিকা গ্রহণ করেছে বাংলার ক্যাম্পাস রাজনীতি। 
সেই ক্যাম্পাস রাজনীতিকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার ফতোয়া, হুমকি বারংবার আসছে শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের মুখ থেকে। ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক চরিত্র ধ্বংস করার মাধ্যমে মুখ্য উদ্দেশ্য হলো ক্যাম্পাসের সামাজিক চরিত্রকে দুর্বল করা। ক্যাম্পাস যে আসলে পরিপূর্ণ মানুষ গঠন করার কেন্দ্র, সেই মৌলিক ধারণাকে নষ্ট করা। ক্যাম্পাসের স্বাধিকার ধ্বংস করে, সরকারি, প্রশাসনিক ও দলীয় নিয়ন্ত্রণে লেখাপড়ার মৌলিক কেন্দ্রবিন্দুকে বিনির্মাণ করা। 
সেই লক্ষ্যেই তাণ্ডব চলছে একের পর এক ক্যাম্পাসে। শিলিগুড়ি কলেজ, জলপাইগুড়ি এসি কলেজ, মেদিনীপুর কলেজ, ভাঙড় কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, সত্যজিত রায় ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট হয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে আক্রমণ নামছে রাস্তাঘাটেও। বিরাটির বণিক মোড়ে এসএফআই'র সভার ওপর হামলা তার নবতম উদাহরণ। প্রতিটা ক্ষেত্রেই হামলার পরিকল্পনায় যুক্ত কোনও না কোনও বিজেপি বিধায়ক। হামলার বয়ানে দেশদ্রোহী, দেশবিরোধী তকমা। হামলার প্রেক্ষিতে পুলিশের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তা। হামলার পরে যাদের ওপর হামলা তাদের নামেই একের পর এক মিথ্যা মামলা রুজু করা। যথারীতি শাসক দলের পক্ষ থেকে হামলাকে অস্বীকার করা। এই নির্দিষ্ট ছকে প্রতিটা হামলাকে সাজানো হচ্ছে। 
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাশকতার ছক নিয়ে হামলা হয়েছে কিছুদিন আগেই। গভীর রাতে স্থানীয় বিজেপি বিধায়কের নেতৃত্বেই এই হামলা হয়। গোটা রাত তাণ্ডব চালানোর নিদানও দেন তিনি প্রকাশ্যেই। ঐতিহ্যশালী অরবিন্দ ভবনে আগুন লাগিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্রোতে স্বদেশি আন্দোলনের গর্ভজাত, সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা আন্দোলনের মধ্যে থেকে উঠে আসা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলার প্রশ্ন তৈরি হওয়ার অন্যতম মূল কেন্দ্র। ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের মুক্ত চিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস করার লক্ষ্যে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুরু করেন ঘৃণা ভাষণ। 
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, অধ্যাপকদের সম্পর্কে সর্বত্র ঘৃণা ভাষণ শুরু হয় বিজেপি'র পক্ষ থেকে। গুন্ডাদের হাতে নষ্ট হয় নন্দলাল বসু'র হাতে গড়া ঐতিহ্যশালী ফলক, যা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মারক নয়, স্বাধীনতার, সমাজ সংস্কারেরও জ্বলন্ত শিখা। যে মবতন্ত্র কায়েম করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দখলের চেষ্টা হয়, সেই মবতন্ত্রই ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার প্রতিটা ক্যাম্পাসে। দেশের স্বাধীনতার লড়াই থেকে যে ক্যাম্পাসের জন্ম, সেই ক্যাম্পাসকে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশবিরোধী তকমায়! প্রশ্ন করলেই, সংশয় প্রকাশ করলেই, তর্ক করলেই দেশবিরোধী। অন্ধ আনুগত্য ভারত ভাবনার বৈশিষ্ট্য নয়। ভারত সকল অর্থেই বহুত্ববাদী তার্কিক ভাবনার প্রতিফলন। প্রতিটা ক্যাম্পাসই সেই মিনি ইন্ডিয়ার আবাদ স্থল। 
সেই তার্কিক ভারতের পরিপন্থী আরএসএস-বিজেপি। ওদের মূল লক্ষ্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে একটা বিশেষ ধরনের অন্ধ প্রজন্ম গড়ে তোলা যারা কর্পোরেট-কমিউনাল অ্যা জেন্ডায় মস্তিষ্ক, শিরদাঁড়া, চেতনা বন্ধক রাখবে ফ্যাসিবাদের কাছে। ফ্যাসিবাদের চরিত্রই এটা। নিষ্ক্রিয় মগজ, নিষ্ক্রিয় চেতনা গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। সেই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ অন্ধ আনুগত্যের নিষ্ক্রিয় ক্যাম্পাস গঠন।
সত্যজিত রায় ফিল্ম অ্যা ন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট শুধু বাংলার নয়, ভারতের গর্ব। সত্যজিত রায়ের নামে নামাঙ্কিত এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় গত ত্রিশ বছর ধরে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তের ছাত্র-ছাত্রীরা চলচ্চিত্র নিয়ে লেখাপড়া করতে আসে। ভারতীয় সিনেমার ফিল্ম ফ্রেটার্নিটির বড় অংশ এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকেছেন কোনও না কোনও সময়ে। যাদবপুরের পর আক্রমণের নিশানা এই প্রতিষ্ঠানও। একই ধাঁচায় আরএসএস'র তাণ্ডব। ক্যাম্পাসকে দেশবিরোধী তকমা। ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর লাগাতার জাতিগত ঘৃণা ভাষণ। বিজেপি'র নেতা-মন্ত্রীদের মুখে ভস্মে ঘি ঢালার উত্তাপ। এক সপ্তাহের মধ্যেই দু'বার আক্রমণ এই ক্যাম্পাসে।
এসআরএফটিআই ক্যাম্পাসের নিজস্ব রাজনৈতিক, সামাজিক চরিত্র আছে। সেই কারণেই ভয়? যে ক্যাম্পাসে প্রতি বছর নিয়ম করে ২৫ডিসেম্বর মনুসংহিতা দহন করা হয় তাকে তো ফ্যাসিবাদ ভয় পাবেই। যেখানে মুক্তমঞ্চে সাপ্তাহিক নাটক মঞ্চস্থ হয় আম্বেদকর, সাবিত্রী ফুলে, পেরিয়ার, বিবেকানন্দের জীবন বিষয়ক, সেখানে ফ্যাসিবাদ ভয় পাবেই। যেখানে ছাত্র সংসদের প্রেসের নাম প্রলেতারিয়ান প্রেস, সেখানে ফ্যাসিবাদ দুরমুশ হবেই। এসআরএফটিআই’র ছাত্ররা নিয়মিত সিনেমার রাজনীতি, রাজনীতির সিনেমা চর্চা করে। চর্চা করে ভগৎ সিং, মাস্টারদা, প্রীতিলতা, বেগম রোকেয়া সাথে বাটেলশিপ পোটেমকিনের ষ্ক্রিনপ্লে। এটাই অনন্যতা ঐ ক্যাম্পাসের। এই অনন্যতাকেই ভয় পায় আরএসএস। এই বহুত্বের অনুশীলন ফ্যাসিবাদের যম। 
এই রাজ্যে একের পর এক ক্যাম্পাসে আক্রমণের মৌলিক সূত্র এখানেই। মুক্ত চিন্তা, মুক্ত মন, মতামতের আদান-প্রদানের মাধ্যমে নতুন, উদ্ভাবনী ভাবনার উন্মেষ-এসব বাংলায় ধ্বংস করা না গেলে, এখানে ফ্যাসিবাদের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এটা আরএসএস-বিজেপি জানে খুব ভালো করে। বাংলার সামাজিক শেকড়ের সফল বিক্রিয়া বাংলার ক্যাম্পাসে, ছাত্র সমাজে। যুগ যুগ বাংলার সমস্ত ক্যাম্পাসে এই বহুত্ববাদী, তার্কিক চেতনা গঠনের কাজ চলেছে। সেই কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর সবচেয়ে সহজ উপায় ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ কায়েম করা।
ক্যাম্পাস পেরিয়ে এই আক্রমণ নেমেছে রাস্তাতেও। জলপাইগুড়িতে ভাঙচুর করা হয়েছে এসএফআই'র দপ্তর। বিরাটিতে এসএফআই'র সভায় হামলা চালিয়েছে বিজেপি'র গুন্ডারা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটা নির্দিষ্ট ছক ধরে পরিকল্পিত আক্রমণ হয়েছে। আশপাশের চত্বর থেকে মব সংগ্রহ করে, সেই মবের হাতে অস্ত্র ধরিয়ে মব সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করে হামলা চালানো, তারপর সেই মবের মধ্যে থেকেই মিথ্যে অভিযোগ দায়ের করে, যাদের ওপর হামলা তাদেরকেই মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো। সেই অভিযোগের সিরিজও পূর্ব পরিকল্পিত সেটাও স্পষ্ট হয়েছে প্রতিদিন। ছাত্রনেতা অরিন্দম, ছাত্রনেতা আকাশদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোও আসলে ছাত্রদের মধ্যে ভয়ভীতির একটা সামগ্রিক আবহ তৈরি করার পরিকল্পনা। 
এই পরিকল্পিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ছে ছাত্ররা। হাতিয়ার সংবিধান, আম্বেদকর, গান্ধী, নেতাজী, মৌলানা আজাদ, প্রীতিলতা সহ বাংলা সামাজিক শেকড়ে সাথে জড়িয়ে থাকা বিপ্লবী, মনীষীরা। হাতিয়ার ক্যাম্পাস গণতন্ত্র, ক্যাম্পাস শৃঙ্খলা, ক্যাম্পাস যাপন। বহুত্ববাদী বাংলার সমাজভাবনা সমস্ত আইকন এখন আক্রমণের মুখে। এই আক্রমণ সর্বগ্রাসী, বর্বর, হিংস্র, উন্মত্ত, একনায়কতান্ত্রিক, নৈরাজ্যবাদী আস্ফালন। এই আক্রমণ ফ্যাসিবাদী। একে প্রতিহত করতে দরকার লেখাপড়ার সাথে যুক্ত, লেখাপড়া নিয়ে চিন্তিত সমস্ত মানুষের ঐক্য। ভয়ের বিরুদ্ধে ঐক্যের ব্যারিকেডই ফ্যাসিবিরোধী লড়াইয়ের শিক্ষা। 
ওরা ভয় পেয়েই, ভয় দেখাচ্ছে— এই বিশ্বাসে অটুট থাকাই এখন সময়ের ডাক। সেই ডাক ঐক্যবদ্ধ করছে গোটা রাজ্যের লাখো ছাত্র-ছাত্রীকে। বাংলার সংস্কৃতি, সামাজিক ভিত্তি, ক্যাম্পাস, সিলেবাস, লেখাপড়া, প্রজন্ম বাঁচানোর এই পবিত্রতম লড়াইতে জুড়ে যাচ্ছে গোটা বাংলার ছাত্র, শিক্ষক, অধ্যাপক, শিক্ষাকর্মী সহ শিক্ষার সাথে যুক্ত বা ভাবিত সকল অংশের মানুষ। গড়ে উঠছে ফ্যাসিবিরোধী গণ ঐক্যের কুচকাওয়াজ। ক্যাম্পাসে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে ছাত্রনেতা আকাশের জেল ফেরত বার্তা— আমরা ভয় পাই না! সাথে যুক্ত হচ্ছে বাংলার ক্যাম্পাসের হাজার হাজার কন্ঠ- ইতিহাস সাক্ষী, ফ্যাসিবাদকে আমরা ভয় পাওয়াই, ফ্যাসিবাদকে আমরাই দুরমুশ করেছি, হারিয়েছি, প্রতিহত করেছি, আবার করবো, বারবার করবো।

 

Comments :0

Login to leave a comment