দেবাশিস চক্রবর্তী
ঘর ছাড়িয়েই ঘরের কথা
বার্লিনের প্রাদেশিক নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন বামপন্থীরা। ডাই লিঙ্কে বা দ্য লেফট দলের মেয়রও হতে চলেছেন। ঐতিহাসিক তো বটেই, কেননা ১৯২৯-র পরে বামপন্থীরা কখনও এই মাত্রায় ভোট পাননি। পুরানো কথা বাদ দিলেও বার্লিন প্রাচীর ভেঙে জার্মানির সংযুক্তির পরে বামপন্থীরা কখনও এত ভোট পাননি। এমন সময়ে যখন জার্মানিতে অতি দক্ষিণপন্থারও অগ্রগতি ঘটছে। অন্য দুটি প্রদেশে অতি দক্ষিণপন্থী অলটারনেটিভ ফর ডয়েশল্যান্ড (এএফডি) ভোট-প্রাপ্তির শীর্ষেও আছে। জার্মানির রাজনৈতিক বিন্যাস কী হবে, তা নিয়ে সতর্ক নজর রয়েছে বিশ্বের।
বার্লিনের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিষয় কী ছিল? লক্ষণীয়ভাবে, সাশ্রয়ী ঘর। মাথার ওপরে ছাদ এবং ঘরের ভাড়া। আবাসন সমস্যাই যে এই নির্বাচনে সবচেয়ে উত্তপ্ত আলোচনার বিষয় ছিল তা ডান-বাম সকলেই স্বীকার করছেন। স্বীকার করছে তথাকথিত মূলস্রোতের গণমাধ্যমও, যারা সাধারণত এইসব প্রশ্নকে সযত্নে এড়িয়ে যায়। এএফডি’র যখন প্রধান জোর অভিবাসন-বিরোধিতায়, বার্লিনের বামপন্থীরা তখন সামনে এনেছেন ঘরের কথা।
বার্লিন এক সময়ে ছিল ইউরোপের তুলনীয় শহরগুলির মধ্যে সবচেয়ে সস্তা। এখন ঘরের ভাড়া আগুনে। গত এক দশকে বার্লিনে ঘরভাড়া গড়ে ৭০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ঘরের অভাবও মারাত্মক চেহারা নিয়েছে। যাঁদের বাড়ি আছে এবং ভাড়া দিতে চান, তাঁরা বিজ্ঞাপন দেবার সঙ্গে সঙ্গেই স্রোতের মতো আবেদন আসতে থাকে। জার্মানির বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রকে এক নাগরিক জানিয়েছেন, তিনি ৬ মাস ধরে অন্তত ৬০টি এমন আবেদন করেছেন এবং মাত্র দুটি ক্ষেত্রে উত্তর পেয়েছেন। বার্লিনে ঘরের মালিকদের ৮৪ শতাংশ ঘর ভাড়া দেন। এই ভাড়াই দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে একজন ছাত্রের মাসিক খরচ ৯০০ ইউরো। গড়ে এক ঘরের ভাড়াই ৫০০ ইউরো। তাহলে খাবেন কী, পড়াশোনা করবেন কী করে? পরিবার নিয়ে যাঁরা থাকেন তাঁদের ক্ষেত্রে এক বা দু’ঘরের গড় ভাড়া ১৭২০ ডলার। ‘এই ভাড়ায় কে থাকতে পারে?’, আবাসন নিয়ে সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক মহিলা জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যমকে। বলা বাহুল্য, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে রয়েছেন শ্রমজীবীরা। মাথার ওপরে ছাদ খুঁজতে তাঁরা দিশাহারা। বার্লিনে গত দশ বছরে আবাসিকের সংখ্যা বেড়েছে সাড়ে ৫ লক্ষ— সেই বিচারে তেমন কিছু নয়। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাব করে সরকারের অঙ্ক ২০৪০-এর মধ্যে আরও ২লক্ষ ১১ হাজার ঘরের প্রয়োজন হবে।
আবাসনের এই সঙ্কটের পিছনে অনেক কারণের একটি হলো বেসরকারিকরণ। এক সময়ে, বিশেষ করে বার্লিনের পূর্ব প্রান্তে আবাসনের কোনও অভাবই ছিল না। সরকারি আবাসনই ছিল ঢালাও। এমনকি এখনও আবাসনের সরকারি সংস্থা রয়েছে এবং তারা আকারে বড়ই। কিন্তু ১৯৯০ এবং ২০০০-র দশকে সরকার ২লক্ষের বেশি সরকারি আবাস (ঘর) বিক্রি করে দেয়। ২০২০-তে ভাড়ার ওপরে ঊর্ধ্বসীমা বসানোর জন্য একটি আইন হয়েছিল। ২০২১-এ দেশের কেন্দ্রীয় আদালত সেই আইন বাতিল করে দেয় কেন্দ্রীয় আইনের সঙ্গে তা সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে। ওই বছরেই বার্লিনে একটি গণভোট হয় এই প্রশ্নে যে যেসব বেসরকারি আবাসন মালিক বা সংস্থার ( ওদের ভাষায় প্রাইভেট ল্যান্ড লর্ড) ৩ হাজার ইউনিটের বেশি ঘর রয়েছে তাদের ঘর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা নিয়ে নিক। ৫৯ শতাংশ বার্লিনবাসী এই প্রস্তাবে সমর্থন জানায়। তবে এই গণভোটের রায় প্রয়োগ বাধ্যতামূলক ছিল না, গত পাঁচ বছর ধরে সরকার এই রায় প্রয়োগ করেনি। করলে ২ লক্ষ অতিরিক্ত ঘর সরকারি আবাসনে যুক্ত হতো।
ডাই লিঙ্কের কর্মসূচিতে আবাসন সমস্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা রয়েছে। প্রথমত, বার্লিনের সরকার নিয়ন্ত্রিত ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বাড়িতে আগামী এক বছর কোনও ভাড়া বৃদ্ধি হবে না। তারপর থেকে বছরে ১ শতাংশ হারে ভাড়া বাড়বে। দ্বিতীয়ত, সরকারি আবাসন বৃদ্ধি করা হবে। তাছাড়াও অন্তত ৫০টি ঘরের মালিকদের একাংশের ঘর নিম্নবিত্তদের জন্য ভাড়া দিতে হবে। প্রত্যেক বছরে এভাবে ১৭ হাজার ঘর পাওয়া যাবে যা নিম্নবিত্তের সাধ্যের মধ্যে। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি হলো বৃহৎ রিয়াল এস্টেট কোম্পানিগুলির আবাসন জাতীয়করণ করে নেওয়া হবে। এর জন্য আইন লাগবে, হয়ত সময়ও লাগবে। কিন্তু ২০২১-র গণভোটের রায় কার্যকরী করা হবে। আসল প্রশ্ন হলো, আবাসনের সমস্যাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিয়ে ডাই লিঙ্কে বিপুল জনসমর্থন টানতে পেরেছে।
আর্বান-২০’র সম্মিলিত আশঙ্কা
বার্লিনে যখন নির্বাচন হচ্ছে, ঠিক তখনই, ১৯ সেপ্টেম্বর, নিউ ইয়র্কে বসেছিল আর্বান- ২০’র সম্মেলন। এই মঞ্চটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহরের প্রধান বা মেয়রদের একটি মঞ্চ। এবার নিউ ইয়র্কের মেয়র মামদানির আয়োজনে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় ৩০টি শহরের মেয়ররা। ছিলেন আমস্টারডাম থেকে বার্সেলোনা, শিকাগো থেকে জাকার্তা, ইস্তানবুল থেকে মেক্সিকো সিটির মেয়র অথবা গভর্নররা। সম্মেলন শুরুর আগেই সমবেত বিবৃতিতে তাঁরা জানান, সম্মেলনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার শহরের আবাসন (প্রায়োরিটি ওয়ান)। অন্য দুটি আলোচ্য বিষয় ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অভিবাসন।
আবাসন নিয়ে কী বলা হয়েছে যৌথ ঘোষণায়? পৃথিবীতে সাধ্যের মধ্যে আবাসনের সঙ্কট ক্রমশ গভীর হচ্ছে, যথাযথ আবাসনের অধিকারকে মৌলিক মানবিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। জি-২০ দেশগুলির শহরে আবাসনের খরচ শ্রমজীবী মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী মানুষকে স্থানচ্যুত করছে, গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, অ-প্রাতিষ্ঠানিক বসতি বাড়ছে (ইনফর্মাল সেটেলমেন্ট)। একে ‘বিশ্বজোড়া জরুরী পরিস্থিতি’ হিসাবে চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, এর ফলে জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক সংহতি, জনপরিষেবার বিপদ বাড়ছে এবং সরকারের ওপরে আস্থা কমছে। যথেষ্ট সংখ্যায় এবং সাধ্যের মধ্যে আবাস না থাকা অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরোন্নয়নের পথে প্রত্যক্ষ বাধা। যখন শ্রমিকরা যে শহরে কাজ করছে সেখানে তারা বাস করতে পারে না, বৈষম্য গভীর হয়, জীবন আরও দুর্দশাগ্রস্ত হয়। আবাসনের আর্থিকীকরণ, ঘর ও জমিকে থাকার জায়গার বদলে বিনিয়োগের জায়গা বলে বিবেচনা করার প্রক্রিয়ায় আবাসন সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে, একেকটি প্রজন্মের কাছে শহরে থাকাই দুঃসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। বলা হয়েছে, গৃহহীনতা কাঠামোগত সামাজিক সঙ্কট। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় স্তরে, স্থানীয় স্তরের নাগরিক পরিকল্পনায়।
আরবান-২০’র প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে আবাসনের জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আবাসনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক কোটা, সমষ্টির জন্য আবাসন, সমষ্টিগত ভাড়ার ব্যবস্থা, সমবায়ের মাধ্যমে আবাসন, বাণিজ্যিক জমিকে আবাসনের জমিতে পরিণত করা (যার ঠিক উলটো হচ্ছে আমাদের চারপাশে)। সরকারি ও পৌর জমিকে সাধ্যের মধ্যে আবাসন গড়ে তোলার জন্য ব্যবহার করা। স্থায়ী আবাসের মধ্যে দিয়ে গৃহহীনতার সমস্যার সমাধান করা। একই সঙ্গে আবাসনের বাজারে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা, ভাড়া স্থির করা, গৃহহীন মানুষের জন্য (বসতি ইত্যাদি) অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ছাদের ব্যবস্থা করা। এইসবের জন্য জাতীয় ও আঞ্চলিক স্তরে নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকেও ভূমিকা পালনের জন্য বলা হয়েছে।
এবং কলকাতায়
প্রথম বিশ্বের বার্লিন, বা আর্বান-২০’র শহরগুলিই হোক, শহরের আবাসন সমস্যা মৌলিক। চরিত্রের পার্থক্য আছে কিন্তু মাথার ওপরে সাধ্যের মধ্যে ছাদের জোগান যে নেই— তা মানছেন সকলেই। বার্লিনের এক সমস্যা, কলকাতার গঙ্গাপাড়ের জ্যোতিনগর কলোনির আরেক। জ্যোতিনগর কলোনি আসলে বস্তি, সুভদ্র তো নয়ই, প্রায় অসহনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক শত পরিবার বাস করেন। যার কোনোরকম জীবিকা আছে, তার শোয়ার জায়গা নেই; যার রান্না করার জন্য দেড় ফুটের অস্থায়ী জায়গা আছে তার সন্তানের স্কুল নেই। এহেন জ্যোতিনগরকেও বলা হচ্ছে কলকাতার মধ্যে তোমার ঠাঁই নেই। বস্তি উচ্ছেদের নোটিসের সঙ্গেই এসেছে পানীয় জল বন্ধ করার নির্দেশ। প্রায় দু’মাস সেখানে কোনও জল নেই।
শহরে এত বস্তি কেন বলে শাসকের ভ্রুকুঞ্চন দেখা আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। শুধু শাসকই বা কেন, বিত্তে আরও উঁচুতে থাকা এবং স্বাভাবিক নিরাপত্তার আগলে থাকা অনেকেরও একই প্রশ্ন। আসলে উত্তরটা খুব সোজা: থাকার জায়গা নেই। এদেশে, এখন এ রাজ্যে বস্তি উচ্ছেদ বা তার চেষ্টা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নটি শুধু বস্তিবাসীদের নয়, শহরের জমির দাম বাড়াতে গেলে নিম্নতর বিত্তের থেকে উচ্চতর বিত্তের কাছে হাতবদল জরুরি। মধ্য ও নিম্নবিত্তের স্বাধীন বাসের ঠিকানা কমবে, ভাড়া উত্তরোত্তর বাড়বে, পরিষেবা ব্যয়সাপেক্ষ হবে, পুরো শহর সর্বার্থে একটি আস্ত বাজার হয়ে উঠবে। আর, ঠিক এই কারণেই আবাসনের সমস্যা একটি শ্রেণি-সমস্যা।
আপাতত এই প্রক্রিয়ার উত্তর: ‘এই শহর সকলের’। তার জন্য, শহরের অধিকারের জন্য প্রয়োজন সমবেত লড়াই।
Highlights
প্রথম বিশ্বের বার্লিন, বা আর্বান-২০’র শহরগুলিই হোক, শহরের আবাসন সমস্যা মৌলিক। চরিত্রের পার্থক্য আছে কিন্তু মাথার ওপরে সাধ্যের মধ্যে ছাদের জোগান যে নেই— তা মানছেন সকলেই। বার্লিনের এক সমস্যা, কলকাতার গঙ্গাপাড়ের জ্যোতিনগর কলোনির আরেক। জ্যোতিনগর কলোনি আসলে বস্তি, সুভদ্র তো নয়ই, প্রায় অসহনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক শত পরিবার বাস করেন।
Comments :0