BOOK TOPIC | SAVAYSACHI CHATTAPADHAYA | RAJPATHE TRAM | NATUNPATA | 2025 FEBRUARY 26

বইকথা | সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় | চল, রাস্তায় সাজি ট্রামলাইন | নতুনপাতা | ২০২৫ ফেব্রুয়ারি ২৬

ছোটদের বিভাগ

BOOK TOPIC  SAVAYSACHI CHATTAPADHAYA  RAJPATHE TRAM  NATUNPATA  2025 FEBRUARY 26

বইকথা | নতুনপাতা

চল, রাস্তায় সাজি ট্রামলাইন 
সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়


এরকম কখনও শুনেছেন যে, দেড়শো বছর পূর্তি উদ্‌যাপিত হচ্ছে যে পরিষেবার, সেই পরিষেবার মৃত্যুঘণ্টা বাজানো হচ্ছে এই বিশেষ বর্ষ পূর্তির সন্ধিক্ষণে! ঠিক এমনটাই হচ্ছে কলকাতার ট্রামের ক্ষেত্রে। ১৮৭৩-এ চালু হওয়া ট্রামকে আমরা প্রায় বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছি। ট্রামের অপরাধ, সে নাকি ধীর গতির যান; রাস্তা জুড়ে চলে! আর তাই একসময় যে কলকাতা শহরে গোটা পঞ্চাশ রুটে চারশোর কাছাকাছি ট্রাম চলত, সেখানে আজ দুটো রুটে চলে মোটে খান পনেরো ট্রাম! শহরে ট্রামযাত্রার দেড়শো বছর পূর্তির সময়েই, আমরা ট্রামকে একরকম ‘ইতিহাস’ করে ফেললাম!
আর ঠিক এই সময়ই ট্রামের ইতিহাস অনুসন্ধান করার একটা বই হাতে এল। একেবারে হাল আমল পর্যন্ত ইতিহাস সেখানে নেই বটে তবে আছে কলকাতার ট্রামের গোড়ার দিকের ইতিহাস। এই ইতিহাসের শেষ দেশের স্বাধীনতার সময়ে। আর শুরু ট্রাম চালু হওয়ারও আগে। বইয়ের লেখক অভিজিৎ সাহা দেখিয়েছেন ট্রাম চালু হওয়ার আগে কলকাতার যানবাহনের হালহকিকত। ঘোড়ার গাড়ি আর পালকির শহরে ট্রাম প্রথম চালু হলো ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। প্রথম পর্বে অবশ্য এই ট্রামও চালাতো ঘোড়ারা। পরে বিজলি বসল ট্রামে, সেটা ১৯০২ সাল। 
আলোচ্য বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে ট্রাম চালু হওয়ার আগের পর্ব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে; এ যেন প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর পর্ব। ট্রাম চালু হওয়ার পরের সমস্যাও বিশ্লেষণ করেছেন অভিজিৎ; পরিভাষায় যাকে ‘দাঁত ওঠার সমস্যা’ বলা চলে। এই পর্বে লেখক বিভিন্ন সূত্র নির্দেশ করে একটা বিতর্কের ওপর আলো ফেলতে চেয়েছেন, তা হলো ট্রাম চালু হয়েছিল ঠিক কেন? পণ্য পরিবহণের জন্য নাকি যাত্রী পরিবহণের উদ্দেশ্যে? অভিজিৎ যাত্রী পরিবহণের প্রতি পক্ষপাত দেখালেও পণ্য পরিবহণের জন্য ট্রাম শুরু হয়েছিল, এমন মতাবলম্বীদের কথাও বাদ দেননি। যথার্থ গবেষকের মতো বিতর্কটা তুলে ধরেছেন। হয়তো, গোড়ার পর্বে ট্রাম পণ্য ও যাত্রী, দুই পরিবহণেই যুক্ত ছিল। তা না হলে কেন ইংলিশম্যানে লেখা হবে যে ১৮৮০ সালের ১ নভেম্বর কলকাতার রাজপথে যাত্রীবাহী ট্রামের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল! দ্য স্টেটসম্যানের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, তার আগে ২৮ অক্টোবর থেকে ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালানোর একাধিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল। 
দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে কলকাতার ট্রামের বিদ্যুতায়নের ইতিহাস। ১৯০২ সালে বিদ্যুৎচালিত ট্রামের পথ চলা শুরু খিদিরপুরে। আর তার বছর আটেকের মধ্যে বিদ্যুৎচালিত ট্রাম চলতে শুরু করে হ্যারিসন রোড থেকে টালিগঞ্জ, বেলগাছিয়া, রাজাবাজার, বাগবাজার, বেহালা – বিভিন্ন রুটে। তবে এই পর্বেও ছিল নানান চড়াই-উতরাই। বিদ্যুৎ ট্রামকে গতি দিলেও রাজপথে বৈদ্যুতিক ট্রামের আগমন ও ক্রমবিস্তারের ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে লেখক জানিয়েছেন। লেখক কলকাতা পুলিশের একটা বার্ষিক প্রতিবেদনের সূত্র উল্লেখ করে একবছরে ট্রামের চাকায় বারোজনের নিহত আর দুশো চল্লিশ জনের আহত হওয়ার খবর জানিয়েছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয়, সেই বার্ষিক প্রতিবেদনের সাল উল্লেখ করেননি। 
নিঃসন্দেহে বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ এর তৃতীয় অধ্যায়। আর তা হলো কলকাতার সমাজ ও সংস্কৃতিতে ট্রামের প্রভাব। সেই ছোটবেলায় পড়া রবীন্দ্রনাথের ‘স্বপ্ন’ কবিতার কথা মনে পড়ে যায় এই প্রসঙ্গে, যে স্বপ্নে রাস্তাগুলো যেন হয়ে গিয়েছিল অজগর সাপ; আর ‘‘পিঠে তার ট্রামগাড়ি পড়ে ধুপধাপ’’। অভিজিৎ অনেক সাহিত্যিকের লেখায় ট্রামের অনুষঙ্গ উঠে আসার কথা উল্লেখ করেছেন এই অধ্যায়ে। এই তালিকায় কে নেই? ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, পুণ্যলতা চক্রবর্তী, প্রতিভা বসু, লীলা মজুমদার, তারাপদ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ট্রাম হলো কলকাতার এমন এক গণ পরিবহণ যেখানে ‘মহিলাদের জন্য’ আসন সংরক্ষণ চালু হয়েছিল। ট্রামে মহিলারা উঠতেন। তবে পুণ্যলতা চক্রবর্তী লিখে গেছেন তিনি আর তাঁর তিন বোন যেবার প্রথম ট্রামে চেপেছিলেন, সেবার, অন্যান্য যাত্রীদের কাছে নতুন প্রযুক্তির আকর্ষণের চেয়েও তাঁরাই হয়ে উঠেছিলেন ‘বিশেষ দ্রষ্টব্য’। লীলা মজুমদারের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। তিনি ট্রামে করে কলেজ যেতেন আর যেতে যেতে দেখতেন সহযাত্রীদের সন্দেহ আর কৌতূহল। 
অভিজিতের বইতে সমাজের কথায় উঠে আসে পুরুষতন্ত্র, লিঙ্গ বিভেদের মতো বিষয়। তবে এই বই ১৯৪৭-এ শেষ হয়ে যাওয়ায় কেমন যেন এক অস্বস্তি হতে থাকে। ১৯৫৩ সালে ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়ার বিরুদ্ধে কলকাতার উত্তাল হয়ে ওঠার ইতিহাস পড়া হলো না যে! জানা হলো না, কিভাবে ক্ষমতায় আসীন লোকেরা পৃথক থাকা ট্রামলাইনকে উড়িয়ে দিয়ে ট্রামকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে যানজট বাড়িয়ে দিয়ে বললেন ‘ট্রাম ধীর গতির যান’! বিচার করা হলো না ট্রাম কোম্পানির বাস চালানোর যুক্তি! আজ কলকাতার ট্রামের দেড়শো বছর পূর্তিতে ট্রামের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য যে আর্তি চোখে পড়ছে তাতে অতীতের জন্য হা-হুতাশ যতটা দৃশ্যমান, ততটা কি দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য এক পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণের পুনরুজ্জীবনের জন্য কোনও সুষ্ঠু পরিকল্পনা? কলকাতার ট্রাম কেমন যেন এক পেলব রোমান্টিকতাতেই মোড়া। সেজন্যই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লেখেন, “ময়দানের মধ্য দিয়ে ছুটে চলেছে ট্রাম। দু’পাশে বড় বড় গাছ, ফাঁকে ফাঁকে পড়েছে ধপধপে শীতের রোদ…।’’ শ্রীজাতের লেখা গান বলে ওঠে, ‘‘চল, রাস্তায় সাজি ট্রামলাইন…’’! 
রাধাপ্রসাদ গুপ্ত বছর তিরিশ আগে একবার লিখেছিলেন, ‘‘তবু ট্রামের কোনও ইতিহাস নেই’’। সত্যিই ট্রামের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। শিশির মিত্র, সিদ্ধার্থ গুহরায়রা ট্রাম আর তার শ্রমিকের যে ইতিহাস লিখেছেন তার সময়সীমাকে হালনগদ করা খুব জরুরি। সংগ্রামী ট্রামশ্রমিকের লড়াই, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কলকাতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই শহরের ঘুম ভাঙত ট্রামের ঘণ্টি শুনে আর শহরকে ঘুম পাড়াতো শেষ ট্রাম চলে যাওয়ার শব্দ। এরকম এক জাগরূক পরিবহণের ইতিহাস অনুসন্ধানের কাজ তাই ইতিহাসকারের কর্তব্য। সেজন্যই, এই ইতিহাসের পরের পর্ব রচনা করবেন, অভিজিতের কাছে এমন প্রত্যাশা রইলো। 
 

রাজপথে ট্রাম : বিবর্তন, অভিঘাত ও কলকাতার সমাজজীবন (১৮৭৩-১৯৪৭) 
অভিজিৎ সাহা। বুকপোস্ট পাবলিকেশন, ৭ নবীন কুণ্ডু লেন, কলকাতা – ৭০০০০৯। মূল্য- ২৬০ টাকা।

Comments :0

Login to leave a comment