অরিজিৎ মণ্ডল
অনুদান বাড়ছে ক্লাবে। তবে কুমারটুলির শিল্পীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে আর্থিক সুবিধা। বরং পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের সময় যে সুবিধা মিলত এখন তা-ও নেই। উপরি বলতে তৃণমূলের তোলাবাজি, মাটি আনতে বাড়ছে খরচ।
কুমারটুলি উত্তর কলকাতার প্রাচীন জনপদ গঙ্গা সংলগ্ন এলাকা মূলত পটুয়াপাড়া। শারদীয় উৎসবের আগে এই কুমারটুলি এলাকায় পরে মানুষের ব্যস্ততা। চৈত্র মাস থেকেই শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। বিভিন্ন পুজো কমিটি বৈশাখে আসে প্রতিমার বায়না দিতে।
শুরু হয় প্রস্তুতি। অনেক শিল্পী আসেন বাইরে থেকে। প্রতিমা তৈরির জন্য জোগাড়ের কাজেও আসেন অনেকে। শিল্পীরা জানাচ্ছেন যে মূলত কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান থেকে এখানে কাজে এসেছেন তাঁরা।
পুজো কমিটিকে অনুদানের টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরাসরি কোনো প্রভাব পড়েছে আপনাদের পেশায়?
শিল্পী সুজিত পাল বলছেন, ‘‘আমাদের কোনও সুবিধা হয়নি। বরং তৃণমূলের কাটমানির প্রভাব পড়েছে আমাদের পেশায়।’’
কেমন কাটমানি?
শিল্পীরা বলছেন, প্রতিমা তৈরিতে মূলত দুই ধরনের মাটি লাগে। এঁটেল মাটি ও বেলে মাটি। বেলে মাটি সাধারণত নরম হয়। পলিমাটি আসলে বেলে মাটি। কুমারটুলি সংলগ্ন ঘাট গুলিতে এ মাটি পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিমা তৈরিতে প্রধানত লাগে এঁটেল মাটি। খড়ের গায়ে এঁটেল মাটি লাগানো হয়। এই মাটি আগে উলুবেড়িয়া থেকে আসতো। গঙ্গার তলার মাটি কেটে নৌকা করে এসে বিক্রি করত এই কুমারটুলিতে।
কিন্তু এখন হচ্ছে না। কারণ জানাচ্ছেন শিল্পীরা। উলুবেড়িয়ার তৃণমূল নেতারা এই নৌকা পিছু টাকা আদায় করতে থাকে। বাড়ে খরচ। ফলে আর ওই এলাকা থেকে মাটি আসে না। সুজিত পাল বললেন, ‘‘আমাদের এখন মাটি আনতে হয়। ডায়মন্ডহারবার পাথরপ্রতিমা কাকদ্বীপ এই চত্বর থেকে। জমি কাটা মাটি, বর্তমানে ব্যবহার করা হয় প্রতিমা তৈরির জন্য। বেশি টাকা দিয়ে অতিরিক্ত গাড়ি ভাড়া খরচ করে এই মাটি আনতে হয় কুমারটুলিতে।’’
পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার প্রত্যেক শিল্পীর ঘরে এই পুজোর মরশুমে ৮০ লিটার কেরোসিন তেল দিত বিনামূল্যে। আঠা জাল দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিমার মাটি শোকাতে লাগত কেরোসিন। বর্তমানে সরকারের কোনও নজর নেই আমাদের দিকে।’’
২০১৮-১৯ থেকে আজকের থেকে দাম বেড়েছে প্রায় ৪ গুন। করোনা পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল এই শিল্পের। যাঁরা সরাসরি যুক্ত তাঁদেরও অবস্থা শোচনীয় ছিল। মৃৎশিল্পী মিহির পাল বলছেন, ‘‘শেষ দু’বছরে দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন। যে হারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে সেই অনুযায়ী দাম বাড়েনি প্রতিমার। আগে ছোট ঠাকুর হতো। বর্তমানে প্রতিমার সাইজ বেড়েছে। তার জন্য বেশি মাটি লাগে, খড় লাগে। শ্রমিকদের মজুরি দিতে হচ্ছে।’’
মিহির পাল জানালেন, যাঁরা কাজের খোঁজে এই মরসুমে কুমারটুলি আসে তাঁরা কেউ ৬ মাসের বেশি এখানে থাকে না। কারণ এই পেশায় নিশ্চয়তা কমে গেছে। তাঁরা বাড়ি ফিরে গিয়ে জমিতে চাষবাস করেন।
শিল্পীদের ক্ষোভ, সাত-আট বছর আগে প্রতিমা তৈরির ঘরগুলি নতুন করে করে দেওয়ার কথা হয়েছিল। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে তা আর হয়নি।
প্রধান কারিগর হিসাবে প্রায় বছর পঁচিশ ধরে কাজ করছেন বর্ধমানে কাটোয়ার হিরু পাল। জানিয়েছেন টিকে থাকার লড়াইয়ের কথা। হিরু বলছেন, ‘‘পরবর্তী প্রজন্ম আর এই প্রতিমা তৈরির যুক্ত হতে চাইছে না।’’ কেন?
হিরু বলছেন, ‘‘একে তো কায়িক পরিশ্রম। দ্বিতীয়ত সারা বছর কাজ পাওয়া যায় না। প্রতিমা ডেলিভারি হওয়ার পর মালিক টাকা পেলে তারপর আমরা টাকা পাই। আমি নিজে ৩-৪ মাস দেশে গিয়ে জমিতে কাজ করি।’’
জমি কি পূর্বপুরুষের? হিরু বলছেন, ‘‘সাতাত্তর সালের পর জোতদার জমিদারদের থেকে জমি কেড়ে গরিব মানুষকে দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। সেই জমিই এখন অসময়ের ভরসা। ২০২০ সালের লকডাউনে পেট ভরিয়েছিলো এই জমিই। যৌথ পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে পেরেছিলাম।’’
শারদীয়া উৎসবের প্রস্তুতির মুখে জল-কাদা মেখে রঙ-তুলি হাতে এমনই বৃত্তান্ত তুলে ধরছে কুমারটুলি।
Comments :0