ছক ভেঙে রবিবার কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হয়েছে। চোখ ধাঁধানো বা চমকে দেওয়া কোনও ঘোষণা নেই। গুরুগম্ভীর কিছু ভাষণ আছে। কিন্তু কেন আছে বোঝা গেল না। ২০ বছর পরে ২০৪৭ সালে উন্নত ভারত গড়ার ২০২৬ সালের বাজেটে অনেক স্বপ্নের আলপনা আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, আধাবেকারি, নিম্ন মজুরি, ঋণের বোঝা, সঞ্চয় কমে যাবার যে সমস্যায় সাধারণ মানুষ জর্জরিত তার সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণে অর্থ মন্ত্রী নিতান্ত উদাসীন। আজ পেটে গামছা বেঁধে ভাবীকালের সুখের স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছে বাজেট। নব্য উদার বাজার অর্থনীতির শর্ত মেনে ‘আর্থিক শৃঙ্খলার’ সাফল্য দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট জিডিপি’র অংশ হিসাবে রাজকোষের কমানো হয়েছে। ঘাটতি কমলে সরকারকে ঋণ কম দিতে হয়। এটা নিঃসন্দেহে ভালো লক্ষ্মণ। কিন্তু আর্থিক শৃঙ্খলা এল কীভাবে?
সরকারের আয় অপেক্ষা ব্যয় যত বাড়বে ততই কোষাগারীয় ঘাটতি বাড়বে এবং সেই ঘাটতি সামলাতে ঋণের বোঝা বাড়বে। ঋণ বাড়লে ভবিষ্যতে সুদ গুনতে গিয়ে আয়ের একটা অংশ খরচ হয়ে যাবে। তখন উন্নয়ন খাতে ও সামাজিক খাতে ব্যয় কমে যাবে। তাই ঘাটতি যতটা কম রাখা যায় ততটাই মঙ্গল। যেকোনও বিকাশমান অর্থনীতিতে সরকারের সাফল্য নিছক আর্থিক শৃঙ্খলা নয়, বরং ক্রমাগত আয় বাড়িয়ে যেতে হবে এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খরচও বাড়াতে হবে। সরকারের রাজস্ব আয়ই যদি না বাড়ে তাহলে সেটা কিশের উন্নয়ন। এর অর্থ এই নয় যে যথেচ্ছভাবে আয় বাড়ানো হবে এবং ব্যয় করা হবে। আয় অবশ্যই বাড়ানো হবে তবে সেটা সাধারণ মানুষের উপর পরোক্ষ কর আদায় করে নয়। সমাজে যদি আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমাতে হয় তাহলে অতি উচ্চ আয়ের উপর আয়কর বাড়াতে হবে। কর্পোরেট কর বাড়াতে হবে। চালু করতে হবে সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার কর। এই পথে সরকারের রাজস্ব আয় অনেক বাড়বে এবং উপরতলার অল্প মানুষের সম্পদ দ্রুত বাড়তে পারবে না।
এইভাবে যে বাড়তি রাজস্ব আদায় হবে সেটা সামাজিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে, কোটি কোটি অসংগঠিত শ্রমজীবীদের সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে ব্যয় করা যাবে। কৃষকে আয় থমকে যাওয়া ও ঋণের বোঝা বৃদ্ধির সমস্যা লাঘবে ব্যবহার হতে পারে।
নির্মলা সীতারামন এই পথে হাঁটেন নি। কর্পোরেট ও পুঁজিপতি নির্ভর উন্নয়ন মডেলে আসক্তি থেকে তিনি কর্পোরেট কর বৃদ্ধির বদলে আরও কমানোর চেষ্টা করেছেন। উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের কাছ থেকে আয়কর বাড়ানোর চেষ্টা করেননি। উলটে কর্পোরেটকে নানাভাবে আরও বেশি সুবিধা দিয়েছেন। বিদেশি পুঁজি টানতে অনেক ছাড় দিয়েছেন। অর্থাৎ আয় বৃদ্ধির কোনও চেষ্টা করেননি। তবে অতি উৎসাহের সঙ্গে প্রায় সব কটি সামাজিক প্রকল্পে বরাদ্দ ছেঁটেছেন। মূল্যবৃদ্ধিকে হিসাবে রাখলে যেখানে আপাত দৃষ্টিতে কিঞ্চিৎ বেড়েছে সেটাও অবান্তর হয়ে যায়। দেশে কর্মসংস্থানের সঙ্কট। বাজেটে তার হদিশ নেই। মানুষের আয় বাড়ছে না। বাজেট নীরব। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নেই বাজারে চাহিদা বাড়ছে না। অর্থমন্ত্রী দেখতে পাচ্ছেন না। পারিবারিক সঞ্চয় কমছে এবং ঋণ বাড়ছে। নির্মলা উদাসীন। দেশের কমবেশি দশ কোটি মানুষের জন্য বিস্তর ভেবেছেন। কিন্তু বাকি ১৩০ কোটি মানুষ নিয়ে তাঁর ভাববার সময়ই নেই। ওদের জন্য ভাবতে গেলে আদানি-আম্বানিরা অসন্তুষ্ট হবেন। এটাই পুঁজিবাদ। খেটে খাওয়া মানুষকে শোষণ করে বড়লোকদের তোষণ করা হয়। মোদী সরকার একাজে অতীতের যেকোনও সরকারের থেকে অনেক বেশি দক্ষ।
Inequality Express
বৈষম্যের এক্সপ্রেস
×
Comments :0