Mamata EC

পরে এসআইআর-এ আপত্তি নেই মমতার ভেস্তে গেল কমিশনের সঙ্গে বোঝাপড়াও

রাজ্য

—জগদীপ ধনকড়ের উদাহরণ দিয়ে বিজেপি’র হাত থেকে জ্ঞানেশ কুমারের বাঁচাতে এগিয়ে এলেন মমতা ব্যানার্জি!
গত এক সপ্তাহ ধরে নয়াদিল্লিতে কমিশনের সদর দপ্তরে মমতা ব্যানার্জির অভিযান নিয়ে সরগরম ছিল রাজ্য রাজনীতি। গত ২৮ জানুয়ারি সিঙ্গুরের সভার পর মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা বাতিল করে দিয়ে গত রবিবার দিল্লি যান মমতা ব্যানার্জি। গত চার দিন ধরে দিল্লির বঙ্গভবনে ঘাঁটি গেড়ে রেখে দেওয়া হয়েছিল এরাজ্যের এসআইআর-এ বিপর্যস্ত মানুষদের। সোমবার বিকাল ৪টায় কমিশনের দপ্তরে নির্ধারিত বৈঠকের আগেই সকাল থেকে রাজধানীর সংবাদমাধ্যমে আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সাতসকালে ঘরোয়া পোশাকেই মমতা ব্যানার্জি অভিষেক ব্যানার্জিকে নিয়ে পৌঁছে যান হাঁটাপথের দূরত্বের বঙ্গভবনের নয়া আবাসনে। দিল্লির পুলিশের ঘেরাটোপে তখন রাজ্যের অতিথিশালা। আরও একধাপ এগিয়ে তৃণমূল নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, বঙ্গভবনের ঘরে ঢুকে তল্লাশি করেছে পুলিশ। এমন সব মারাত্মক অভিযোগ পর্ব পার করে কমিশনের দপ্তরে গিয়ে কোটি মানুষকে হয়রানি মুখে ফেলে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে গিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ধনকড়’এর পরিণতির কথা জানিয়ে সাবধান করে এলেন মমতা ব্যানার্জি!
এসআইআর নিয়ে এরাজ্যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ নিয়ে সোমবার নয়াদিল্লিতে কমিশনের সদর দপ্তর গিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সাতসকালে ঘরোয়া শাড়ি ছেড়ে কমিশনের দপ্তরে যাওয়ার সময় তৃণমূলের ‘ড্রেস কোড’ ছিল কালো। মুখ্যমন্ত্রী, সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জি, কল্যাণ ব্যানার্জি থেকে এরাজ্যে এসআইআর’এ পীড়িত মানুষদেরও পরনে ছিল কালো চাদর থেকে সোয়েটার। রাজ্যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কটাক্ষ করে লাগাতার ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলার পরও মমতা ব্যানার্জির তাঁকে সাবধান করার চেষ্টা কেন? রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ‘আসলে কমিশনের সদর দপ্তরে সদবদলে উপস্থিত হয়ে আলোচনার মাধ্যমে মমতা ব্যানার্জি একটা পথ খোলার আশায় ছিলেন। 
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সহ কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকের পর বেরিয়ে সাংবাদিকদের কাছে মুখ্যমন্ত্রী জ্ঞানেশ কুমারের কাছে সাবধানতার বার্তা দিয়ে বলেন, ‘‘আমি বলেছি, আপনার (জ্ঞানেশ কুমার) অবস্থা ধনকড়ের (জগদীপ ধনকড়) মতো হবে। বিজেপি’র ভয়ে কাজ করছে।’’ রূদ্ধদ্বার বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর বিজেপি’র হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সাবধান করার পর বাইরে সাংবাদিকদের কাছেও একই কথা বলেন।
বিজেপি’র হাত থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘রক্ষা’ করতে মমতা ব্যানার্জি বলেন, ‘‘আজকে বিজেপি’র কথা শুনে কাজ করছেন। ধনকড়জীও তাই করেছিলেন। আমাদের রাজ্যে রাজ্যপাল ছিলেন। প্রতিদিন আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করতেন। কিন্তু আমরা সম্মান করতাম। কিন্তু সম্মানের একটা সীমারেখা আছে। এখানে তো কোনও সীমারেখা রাখা হয়নি।’’ ঘটনা হলো জগদীপ ধনকড় উপ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হয়েছিলেন ২০২২ সালে। বিজেপি’র উপ রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর জয় নিশ্চিত করার জন্য সেই সময় তৃণমূল ভোটপর্ব এড়িয়ে গিয়েছিল। সেই জগদীপ ধনকড়ের মেয়াদ ছিল ২০২৭ সাল পর্যন্ত। তার আগেই সরকারের সঙ্গে গোলমালের জেরে তাঁকে খোয়াতে হয় পদ। সেই ধনকড়কে দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জি ভোটের রাজ্যে সাবধান করছেন জ্ঞানেশ কূমারকে!
যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে আরএএসএস-বিজেপি’র হয়ে সরাসরি কাজ করার অভিযোগ নিয়ে তোলপাড়। তাঁর কাছে গিয়ে মমতা ব্যানার্জি বিজেপি’র হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জগদীপ ধনকড়ের উদাহরণ দিতে হয়েছে। কখন? যখন এ রাজ্যে ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারকে শুনানিতে ডেকে নির্বাচারে নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত প্রায় গুটিয়ে এনেছে কমিশন। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নাম শুনানিতে ডাক পাওয়া সিংহভাগ ভোটারই রাজ্যের সংখ্যালঘু জনতা। ঠিক তখন মমতা ব্যানার্জি গিয়ে ধনকড়ের কথা বলছেন জ্ঞানেশ কুমারকে। বিজেপি’র সঙ্গে থাকার জন্য জ্ঞানেশ কুমারকে আগামীদিনে ভুগতে হবে বলেও মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা ব্যানার্জির এহেন মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলের চর্চায় এসেছে, তাহলে কি মুখ্যমন্ত্রী এদিন কোনও বোঝাপড়ার রাস্তা খুলতেই নির্বাচন কমিশনের দরবার করতে গিয়েছিলেন। কারণ, এরআগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সহ কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করে এসেছিলেন সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জি। সেই বৈঠক খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। ওই বৈঠকের পর থেকেই দফায়, দফায় কমিশনের কাছ থেকে রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে রাজ্য সরকারকে অস্বস্তি ফেলার নির্দেশ এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে উপস্থিত হয়ে একটা আলোচনার পথ খুলে বোঝাপড়া তৈরি করতে যাওয়ার মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। 
কিন্তু  তাতেও যে বোঝাপড়া তৈরির কোনও পথ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছ থেকে মমতা ব্যানার্জি খুলতে পারেননি তা নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন। বৈঠক বয়কট করার দাবি করে বাইরে এসে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘মিথ্যাবাদী’, ‘অহঙ্কারী’ থেকে ‘বিজেপি’র দালাল’ সহ চোখা চোখা বিশেষণে ভরিয়ে দিয়েছেন। মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘‘আমরা বয়কট করে চলে এসেছি। আমাদের অসম্মান করা হয়েছে। অপমান করা হয়েছে। অপদস্থ করা হয়েছে। জেনে বুঝে আমাদের সঙ্গে যে ব্যবহার করা হয়েছে তা মানা যায় না। আমরা বিচার চাইতে গিয়েছিলাম। উনি (জ্ঞানেশ কুমার) একজন সেরা মিথ্যাবাদী।’’ 
বৈঠকে শুরুতে না হলেও শেষ পর্যন্ত যে উত্তপ্তই ছিল তা বুঝিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন দুই সাংসদ ছাড়াও এসআইআর পর্বে মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে ও জীবিত ভোটারকে মৃত বলে চিহ্নিত কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকে সবাই ছিলেন। কিন্তু বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজ্যে এসআইআর নিয়ে সরকারের অসহযোগিতার তথ্য তুলে ধরেন। যার সূত্রে মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘‘আমাদের বলা হয়েছে ভুয়ো ভোটার নিয়ে। আমাদের কেন বিএলও দেওয়া হয়নি বলা হয়েছে। সব মিথ্যা কথা।’’
কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে তৃণমূলের দরবারের কারণ কী? 
এদিনও কমিশনের কাছে মমতা ব্যানার্জি দাবি করে এসেছেন, ‘‘আপনারা এসআইআর করুন। কিন্তু নির্বাচনের আগে কেন তাড়াহুড়ো করে করা হচ্ছে? ২০০২ সালের পর এতদিন অপেক্ষা করলেন, তাহলে ভোটের তিন মাস আগে এসআইআর করার প্রয়োজন কেন?’’ তাই নির্বাচনমুখী রাজ্যগুলিকে ছেড়ে দিয়ে পুরানো ভোটার তালিকাকে ভিত্তি করেই বিধানসভা ভোটের পক্ষে সওয়াল করেন মমতা ব্যানার্জি।
চলতি মাসের ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার দিন বেঁধে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আগে ভোট পরে এসআইআর হলে আপত্তি নেই মমতার। এখন এই দাবি কীভাবে মমতা ব্যানার্জি করছেন তা নিয়েই প্রশ্ন। একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মাইক্রো অবজার্ভার ও কমিশন নিযুক্ত পর্যবেক্ষকদের নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। দু’দিন আগে জ্ঞানেশ কুমারকে মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ নিয়ে যে চিঠি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী এদিন সেটাই ফের উল্লেখ করেন।

Comments :0

Login to leave a comment