Md Salim

সমর্থন হারাচ্ছে বুঝেই বামেদের নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তৃণমূল-বিজেপি: সেলিম

রাজ্য

ভোটের মুখে বামশক্তিকে আর অগ্রাহ্য করতে পারছে না বলেই বিজেপি এবং তৃণমূল বামপন্থীদের সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর প্রচার করছে বলে অভিযোগ করেছেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। বামেদের ভোট দিলে সেই ভোট নষ্ট হবে এবং তৃণমূল বা বিজেপি প্রার্থীরা জিতে যাবে বলে যে অপপ্রচার চলছে সেই সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সেলিম বলেছেন, মানুষের সমর্থন মিলছে না দেখে মরিয়া হয়ে উঠেছে তৃণমূল এবং বিজেপি। দালাল বিশেষজ্ঞ এবং পোষা মিডিয়ার মাধ্যমে তারা এই ভাষ্যটা ছড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে নিজেদের মেরুকরণ টিকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাস্তবতা এখন অন্যরকম, মানুষ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখে লুটেরাদের নবান্ন থেকে হটাতে চায়। সেই সঙ্গে জীবন-জীবিকার ইতিবাচক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বামপন্থীদের ভোট দিতে প্রস্তুত। 
বামেদের ভোট দিলে ভোট নষ্টের প্রচারকে উড়িয়ে দিয়ে বুধবার সাংবাদিক বৈঠকে সেলিম বলেছেন, ভোট তৃণমূল-বিজেপি’কে দিয়ে মানুষের কী লাভ হয়েছে? মানুষের লাভ নয়, নিজেদের লাভের জন্য বিজেপি-তৃণমূল এই প্রচার করছে। প্রতিটি মানুষের ভোট সমান মূল্যবান এবং সেগুলি তাঁরা দিতে চান লুট, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের পক্ষে। নির্বাচনের ময়দানে বামপন্থীদের বিরুদ্ধে যুক্তি, তথ্যের নিরিখে কোনও সমালোচনা করা যাচ্ছে না বলেই এখন ‘ভোট নষ্ট’র প্রচার করা হচ্ছে। এটা আসলে বামপন্থীদের লড়াই আন্দোলনের পরোক্ষ স্বীকৃতি। 
ভোটের পরে বামপন্থীরা তৃণমূলকে সরকার গঠনে সমর্থন দেবে বলে অপপ্রচার সম্পর্কেও প্রশ্নের উত্তরে সেলিম বলেছেন, তৃণমূলের অবস্থা যে কতটা খারাপ তাও স্পষ্ট এই প্রশ্ন থেকে। তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি সহ প্রতিক্রিয়াশীল ২২টি সংগঠনের সমর্থন নিয়ে। আর আমরা বামপন্থীরা লড়ছি নবান্ন থেকে চোর তৃণমূলকে হটিয়ে সাম্প্রদায়িক বিজেপি’কে বাংলা থেকে দূরে রাখতে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি’র ভরাডুবির পরে বিজেপি বিধায়ক দিলীপ ঘোষ নিজেই বলেছিলেন, বাম-কংগ্রেস জিতে যাচ্ছে দেখে আরএসএস’র হস্তক্ষেপে বিজেপি একশোটা আসনে ভোট ট্রান্সফার করেছিল তৃণমূলকে। এবারও বিপদ আসা মাত্র ওরা কেমন কাছাকাছি আসতে শুরু করে সেটা দেখতে পাবেন। 
রাজ্যবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে সেলিম বলেছেন, বাংলার মিলনধর্মী সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির ঐতিহ্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের শপথ নিয়ে বামপন্থীরা নির্বাচনের ময়দানে রয়েছি। বাম কর্মীরা চাষের খেত থেকে কারখানা, রাস্তা, সর্বত্র প্রচার সংগঠিত করছেন বাংলাকে বাঁচানোর জন্য। রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করছেন বামপন্থার পুনরুত্থানের জন্য। 
বাংলার সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা বিজেপি ও তৃণমূলের প্রার্থীরা নববর্ষের দিনে মাছ হাতে প্রচারে নেমেছেন। এটাকে ‘তামাশা’ হিসাবে উল্লেখ করে সেলিম বলেছেন, যারা বাঙালির মিলনধর্মী সংস্কৃতি, খাদ্য পোশাক ভাষা জীবনশৈলী সব কিছু ধ্বংস করে হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্তান চাপিয়ে দিচ্ছে, যারা বাংলার নদী জলাভূমি সব নষ্ট করে মৎস্যজীবীদের পেশা শেষ করে দিচ্ছে, তারা এখন ভোট পেতে মাছ হাতে বাঙালিয়ানা দেখাচ্ছে! 
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে নামা দক্ষিণপন্থীদের আধিপত্যের রাজনীতিতে বিশ্বের নানা জায়গায় লোকসংস্কৃতি লোকাচার লুপ্ত হচ্ছে। গুজরাটে নির্বাচনের আগে বিজেপি’র প্রচারে পরেশ রাওয়াল মাছ নিষিদ্ধ করতে ভোট চেয়েছিলেন। গোমাংস রাখার নামে যারা একলাখকে খুন করেছে তারাই সবচেয়ে বেশি বিফ রপ্তানির ব্যবসা করছে। এই বিজেপি গোয়া, উত্তর-পূর্ব ভারতে নির্বাচনের আগে গোমাংসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার করেছিল। এখন বাংলা নববর্ষে মাছ হাতে প্রচার করছে। এরা বাংলা নববর্ষ মানে না, এমনকি বাংলা ভাষায় পার্শিয়ান প্রভাব অস্বীকারে পয়লা শব্দটাও মানে না। আরএসএস বাংলা নববর্ষের বদলে বিক্রম সম্বৎ নামে কাল্পনিক হিন্দু বর্ষ চালু করতে চায়। এই জন্যই এরা দেশের মিলনধর্মী সংস্কৃতির বিপদ। বামপন্থার পুনরুত্থান মানে বাংলার সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ, বাংলার সংস্কৃতিকে বাঁচাতে পারলে তবেই দেশের সংস্কৃতিকে ফ্যাসিবাদীদের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে।
নয়ডায় শ্রমিকদের ওপরে যোগীর পুলিশি আক্রমণ, মীরাটে বুলডোজার দিয়ে পুরানো ছোট ছোট দোকান ভেঙে দেওয়ার নিন্দা করে সেলিম বলেছেন, এই বুলডোজার রাজনীতিই হলো দুর্বলের ওপরে প্রবলের আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা। শুধু সংখ্যালঘুদের ওপরে আক্রমণ নয়, ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপরে আক্রমণ, বড় শপিং মল করতে ছোট দোকানের ওপরে আক্রমণ, এটাই বিজেপি’র রাজনীতি। বাংলাকে এর হাত থেকে বাঁচাতে হলে বিজেপি’কে যারা ডেকে এনেছে তাদের নবান্ন থেকে উৎখাত করতে হবে।
নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল, নাকা চেকিং সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে সেলিম বলেছেন, শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকলেই শান্তিতে অবাধ ভোট হয় না। কারা তাদের পরিচালনা করছে, নিরপেক্ষতার সঙ্গে সঠিকভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে কিনা, তার ওপরে সুষ্ঠু নির্বাচন নির্ভর করে। গত নির্বাচনে শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী থেকে কী হয়েছে? বিমানবন্দরে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপোর স্ত্রীর সোনা পাচার রুখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? গোটা রাজ্যে তল্লাশি চালিয়ে নির্বাচনে কালো টাকা কত পরিমাণে ধরা হয়েছে? কতগুলি বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র আটক হয়েছে, কটা বোমা উদ্ধার করা হয়েছে? আমরা চাই না এরাজ্যের শিশুরা ওই বোমায় প্রাণ হারাক। 
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নির্বাচনী প্রচারে এরাজ্যের মিথ্যা মামলায় ধৃতদের মুক্তির যে আশ্বাস দিয়েছেন সেই সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সেলিম বলেছেন, লাদাখে পরিবেশ কর্মীদের গ্রেপ্তার করেছে কারা? ভীমা কোরেগাঁওতে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করেছে কারা? বাংলার মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট মিলবে না। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার এসেই রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছিল।  
....................................
 

Comments :0

Login to leave a comment