অরিজিৎ মণ্ডল: পানিহাটি
উদ্বাস্তু ছিন্নমূল মানুষকে বুকে আগলে রেখেছে এই বাংলার মানুষই। তাদের লড়াইকে জোরদার করেছে লাল ঝান্ডা ও ইউসিআরসি। ৭৭ সালের পর রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার সকল বাস্তুহারা মানুষের স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিল। বর্তমানে তৃণমূল তাই বাসস্থানের অধিকারকে ছিনিয়ে নিতে চাইছে। আর উদ্বাস্তু মানুষকে অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করতে চাইছে বিজেপি। এর দুইয়ের বিরুদ্ধেই ইউসিআরসি সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তুলবে।
রবিবার সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদের ২০ তম রাজ্য সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে এ কথাই বললেন রাজ্যের বাম গণআন্দোলনের নেতা সুজন চক্রবর্তী। তিনি এই সংগঠনের উপদেষ্টাও। সম্মেলনে থেকে গৃহীত আন্দোলনের পথে বাস্তবে রূপায়িত করে দুর্বার উদ্বাস্ত আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
চক্রবর্তী বলেন, আমাদের রাজ্যে জহ্লাদের রাজত্ব চলছে। হিন্দমোটরে স্কুলছাত্রীকে দলবেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে। রাজ্যে গভীর তাৎপর্যের অভয়া হত্যা। পানিহাটি দিনের পর দিন লড়াইয়ে থেকেছে। পানিহাটির মানুষকে অভিনন্দন। রাজ্যকে ধ্বংস করা হচ্ছে। স্কুল ধ্বংস, কাজ ধ্বংস। পরিযায়ী শ্রমিক হতে হচ্ছে যুবদের। স্নাতক, স্নাতকোত্তর যুব। তিনি ডেলিভারির কাজ করছেন বাইকে। তিনি বলেন, গত দু’তিন ধরে নাটকবাজি চলল। এমন অপদার্থ ইডি তার তদন্তের মাঝে একজন ফাইল হাতে করে চলে এলেন! দিল্লি আর রাজ্যের মধ্যে খেলা হচ্ছে। মাঝখান থেকে রাজ্যটা ধ্বংস হচ্ছে। বাঁচাতে হবে বাংলাকে। বাঁচাতে হবে নিজের পরিজন, নিজের চারপাশকে।
সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদের কুড়ি তম রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার পানিহাটির ঊষুমপুরে বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গনে। গত শনিবার এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন রাজ্যের বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবীণ নেতৃত্ব বিমান বসু। শনিবার রবিবার প্রতিনিধিদের আলোচনার মধ্যে দিয়ে সম্মেলনের কাজ শেষ হয়েছে। সম্মেলন থেকে ১৭৯ জনের রাজ্য কাউন্সিল, ৯১ জনের রাজ্য কমিটি, ৩৫ জনের রাজ্য সম্পাদক মন্ডলী নির্বাচিত হয়েছে। সংগঠনের নির্বাচিত সভাপতি মধু দত্ত কার্যকর সভাপতি রেখা গোস্বামী, সাধারণ সম্পাদক সোমেশ কংসবণিক, সাংগঠনিক সম্পাদক দীপক ভট্টাচার্য, কোষাধক্ষ্য সংযুক্তা সিংহ।
প্রকাশ্য সমাবেশে বক্তব্য রাখেন রাজ্যের বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা মহম্মদ সেলিম, সুজন চক্রবর্তী, সুমিত দে, উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা পলাশ দাশ, ইউসিআরসি সাধারণ সম্পাদক সোমেশ কংশবণিক, ইউসিআরসি'র কার্যকরী সভাপতি রেখা গোস্বামী। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন সারা ভারত ফরওয়ার্ড ব্লকের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদক সঞ্জীব চ্যাটার্জী।
সমাবেশে রেখা গোস্বামী বলেন, উদ্বাস্ত ছিন্নমূল মানুষের লড়াইকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের রূপ দিয়েছিলেন বামপন্থীরা। তৎকালীন সময় উদ্বাস্তু মানুষের বাসস্থানের অধিকার নিয়ে লড়াই করেছেন কমিউনিস্টরা। জ্যোতি বসু, সমর মুখার্জির নেতৃত্বে গোটা রাজ্যে এ লড়াই ছড়িয়ে পড়ে। অধিকার সুনিশ্চিত করেছিল রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার। ২০১১ সালের পর বর্তমানে আসীন তৃণমূল সরকার। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দলিল দেওয়ার। কিন্তু নিঃশর্ত দলিল দেওয়া হয়নি এ রাজ্যে। সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করেছে তৃণমূল। সমস্ত কলোনির মানুষের সাথে ধোঁকা করেছেন তারা। কলোনির সমস্ত মানুষকে যুক্ত করেই এ লড়াই চলবে।
পলাশ দাশ বলেছেন, সত্তরের দশকে উদ্বাস্তু মানুষ দেশভাগের যন্ত্রণা ভুলতে পারেননি। কিন্তু তার পরবর্তী প্রজন্ম উদ্বাস্ত আন্দোলন সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই ততটা ওয়াকিবহাল নয়। কিন্তু আজকের এসআইআর পরবর্তী পরিস্থিতি তাদেরকে সেই সময়ের কথা বুঝতে এবং ভাবতে বাধ্য করছে। এই প্রজন্ম হয়তো নিজেকে উদ্বাস্তু বলে গণ্য করতে চায় না। তারাও আজ অনিশ্চয়তার শিকার। আসলে বিজেপি-আরএসএস’র এই বিভাজন বহুদিনের। উদ্বাস্তু মানুষকে এরা বলেছে ঘুষপেটিয়া, অনুপ্রবেশকারী। সর্বজনীন ভোটের অধিকার, নাগরিকত্বের অধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে তারা।
সুমিত দে বলেছেন, উদ্বাস্তু সর্বহারা মানুষ যখন সব ছেড়ে ভারতে এলেন তাঁরা ধর্মের ভিত্তিতে নিজের পরিচয় আটকে রাখতে চাননি। তাঁরা স্লোগান দিয়েছিলেন ‘আমরা কারা, বাস্তুহারা‘। তাই বাসস্থানের দাবিতে তাঁরা হাতে লাল ঝান্ডা নিয়ে লড়াই সংগ্রাম করেছিলেন। অধিকার রক্ষার জন্য এলাকায় এলাকায় উদ্বাস্তু কমিটি হয়েছে। কলোনির স্থানীয় দাবি পূরণ করেছে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। আজকে এই উদ্বাস্তু মানুষকে ভুল বুঝিয়ে আক্রমণ করে বলা হচ্ছে যে তোমরা অনুপ্রবেশকারী। ধর্মের কারণে দেশছাড়া হয়ে এখানে আসতে হয়েছে। তাই যে ধর্মের মানুষ তোমাদের উপর আক্রমণ করেছে তাদের এখানে আক্রমণ কর। কিন্তু দেশভাগের পরও উদ্বাস্তু মানুষ এই ফাঁদে পা দেননি। ভারতের বহুত্ববাদী ভাবনাকে তারা নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করেই চলেছেন। আজও বিজেপির বিভাজন রুখতে আরও সচেষ্ট হতে হবে ইউসিআরসি-কে। তিনি বলেছেন যে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি কলোনি এলাকায় হবে বৈঠকীসভা। নিঃশর্ত দলিলের মতো দাবির পাশাপাশি হবে স্থানীয় দাবিসনদ।
সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দাপটের কারণে বাংলাদেশের দীপু দাস খুন হযন। আর সীমান্তের এপারে ভারতে একই রাজনীতির দাপাদাপিতে খুন হযন জুয়েল রানা। ধর্মীয় মৌলবাদ সব ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর, তা হিন্দু মৌলবাদ হোক বা মুসলিম মৌলবাদ। তিনি বলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বা জনসঙ্ঘকে ভরসা করেনি তৎকালীন উদ্বাস্তু মানুষ। বিভাজনের রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে দিয়ে উদ্বাস্তু মানুষ লাল ঝান্ডাকেই তাদের মূল বন্ধু হিসেবে ভেবেছিলেন। অন্ন বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্য কর্মসংস্থানের প্রশ্নে তাঁরাই লড়াই গড়ে তুলেছিলেন। এই উদ্বাস্তু মানুষ, মতুয়াদের নাগরিকত্ব নিয়ে আজ প্রশ্ন তুলছে বিজেপি। ২০০২ সালে নাগরিকত্বের আইন এনেছে এই বিজেপির সরকার। জন্মসূত্রে নাগরিক, এই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। তখন মমতা ব্যানার্জি ছিলেন বিজেপি সরকারের মন্ত্রী। আজকে বিজেপি ভুলে গেছে ভারতের সংবিধান সর্বজনীন ভোটের অধিকার দিয়েছে। যদি এই উদ্বাস্তু, মতুয়া মানুষ অবৈধ হন তাহলে তাদের ভোটে জেতা সাংসদ বিধায়ককরাও অবৈধ।
চক্রবর্তী বলেন, অধিকার আদায়ের লড়াইতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং বিভাজনের সমস্ত শক্তিকে কড়া ভাষায় জবাব দিতে হবে ইউসিআরসি। ভবিষ্যতে যেমন উদ্বাস্তু আন্দোলন করেছিল তাকে পাথেয় করেই বর্তমানে বিভাজনের রাজনীতিকে হারাবে এটাই চ্যালেঞ্জ।
Comments :0