পল্লব সেনগুপ্ত
শিল্প-সংস্কৃতি’র জগতে ক্ষমতাসীন কিংবা প্রতাপশালীদের তোষামোদি করাটা কিছু নতুন ব্যাপার নয়, এটা তো সবাই জানে না। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম দেখি না, বহুকাল থেকেই এই ভজনপূজন চলে আসছে ভারতবর্ষে। সেই কথায় না হয় একটু পরে আসব। তার আগে সাম্প্রতিক একটা বিদেশি ঘটনার প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু বলি। রোম শহরের একটি প্রাচীন চার্চ ‘ব্যাসিলিকা ডি সেন্ট লরেন্স’, অতি সম্প্রতি একটা প্রবল রাজনৈতিক বিতণ্ডার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে ওই বিশেষ কারণে। চার্চটা প্রাচীন, ৫ম শতাব্দীর মাঝামাঝি একটি বিরাট এবং অভিজাত প্রাসাদকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। ইতালির বিখ্যাত ধর্মস্থানগুলির একটা হলেও, সেভাবে কখনও বিশ্বজনীন ব্যাপক প্রচারের আলোয় আসেনি। সেটা এসেছে মাত্র হপ্তাখানেক আগে: রোমের সুপরিচিত প্রগতিশীল সংবাদপত্র ‘লা রিপাবলিকা’ ওই ব্যাসিলিকাকে নিয়ে একটি প্রথম পাতা জুড়ে খবর এবং ছবি ছাপানোর পরই।
ঘটনাটা হলো এই যে, পুরানো গির্জা হলেও বহুকাল ধরেই এর কিছু কিছু দেওয়াল আঁকাজোকাহীন অবস্থায় ফাঁকা পড়েছিল। ১৯৮৫ সালে বহুদিন আগেই ইতালির বিলুপ্ত রাজতন্ত্রের অনুগামীদের একটি ছোট গোষ্ঠী চার্চের পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এঁদেরই উদ্যোগে ২০০০ সাল নাগাদ সেই ফাঁকা দেওয়ালগুলি দক্ষ কিছু শিল্পীর সাহায্যে খ্রিস্টীয় মিথকথা-ইত্যাদির ফ্রেসকো চিত্রিত করা হয়। ইতিমধ্যে সিকি শতাব্দী সময়ও কেটে গেছে। ঝড়-বৃষ্টি-রোদের তাড়নায় স্বাভাবিকভাবেই দেওয়ালের সব ছবিই কিছু বিবর্ণ, কিছু ঝাপসা হয়ে গেছে। ইতালির বর্তমান দক্ষিণপন্থী শাসকদের অনুগত একটা গোষ্ঠী এখন ওই ব্যাসিলিকার পরিচালনা করে। তাদেরই উৎসাহে কিছুদিন আগে শিল্পী ব্রুনো ভ্যালেন্টিনোট্টিকে নষ্ট হয়ে যাওয়া সমস্ত ফ্রেস্কোগুলিকে পুনরুদ্ধার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এবং সমস্যাটার সূত্রপাত এখান থেকেই।
ভ্যালেন্টিনেট্টিই পঁচিশ বছর আগে মূল ছবিগুলি আঁকেন। তাই তাঁর হাতেই ছবিগুলির পুনরুদ্ধার সবচেয়ে ভালোভাবে হবে যে, এটাই লোকে ভেবেছিল। কিন্তু গোল বাঁধল, ‘লা রিপাবলিক’র কোনও এক উৎসাহী সাংবাদিক সুসংস্কৃতি-ফ্রেস্কোগুলি দেখে আসার পরে নতুন করে সারানো, সাজানো, রং লাগানো ফ্রেস্কোগুলির একটায় দেখা উড়ন্ত এক দেবদূতীর (এঞ্জেল) মুখ হুবহু মিলে যাচ্ছে ইতালির বর্তমান অতি-দক্ষিণপন্থী সরকারের নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী সিনোরা জার্জিয়া মেলোনির মুখের সঙ্গে!!
‘লা রিপাবলিকা’ এই মিলে যাওয়া নিয়ে সরস এবং তীক্ষ্ণ কিছু টীকা-টিপ্পনীও করেছে তাদের সচিত্র প্রতিবেদনে। (যত দক্ষিণপন্থাই হোক না কেন, ওদেশের সরকারি মহল এখনও এসব ব্যাপারে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে না!) এরপরেই‘‘সামাল! সামাল!’’ রব চতুর্দিকে। প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী মেলোনি নিজের ইন্সটাগ্রামে ওই ফ্রেস্কোর এঞ্জেলের ছবি এবং নিজের অন্য এক ভঙ্গিমার ছবি সহ ঘোরতর আপত্তি জানিয়েছেন ‘লা রিপাবলিকা’র বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের বিরুদ্ধে। চার্চের বর্তমান কর্তৃপক্ষ জনগণকে জানিয়েছেন, ব্যাপারটা নিয়ে শিল্প বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে অবশ্যই তদন্ত করা হবে। শিল্পী ব্রুনো ভ্যালেন্টিনেট্টি ফ্রেস্কো ‘রি-টাচ্’ করার সময়ে যাই করে থাকুন না কেন, এখন তিনিও প্রবল বেগে সমস্ত কিছু অস্বীকার করছেন। কারণ, ‘লা রিপাবলিকা’র খবরটা পড়ে এবং ছবি দেখে যত মানুষ ব্যাসিলিকায় গেছেন, তার সংখ্যাটা এতোই বেশি, আর তার ফলে যে জনমত গড়ে উঠছে ইতালিতে সেটার ঝাঁঝও বড়ই অসহনীয় হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষে!
বিষয়টা এমনই ঘোরালো হয়েছে যে, স্বয়ং পোপ ১৪শ লিও পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, এই ডামাডোলের জন্য দায়িত্ব কাদের ওপর বর্তায় সেটা যাচাই করা হোক! পোপ এই সূত্রে আরও বলেছেন : ‘‘পবিত্র শিল্পকন্যার অপব্যবহার কিছুতেই এমন বাঞ্ছনীয় নয় কারণ সেটা খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যবিরোধী।’’ .... খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ এখানে বিচার্য নয়; তবে প্রভু তোষণের জন্য শিল্পের অপব্যবহার অবশ্যই তীব্র আলোচনার উপজীব্য বিষয় যে, তাতে দ্বিমতের অবসর নেই একটুও।
।।২।।
ইতালির ইতিহাসে অবশ্য এহেন চাটুকারিতার বয়স কম নয়। রেনেসাঁস-যুগের বহু চিত্রে এবং ভাস্কর্যে নিজের পৃষ্ঠপোটক ধনী ও অভিজাতদের মুখের আদলে দেবদূত, সন্তপুরুষদের মুখ এঁকে বাধিত হতেন শিল্পীরা। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও এই ব্যাপারটা কমবেশি দেখা গেছে।
এই মুরুব্বি ভজনা এদেশেও বহুকালের। এবং এখনও ‘‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে।’’ শিল্পে-সাহিত্যে, প্রবাদে-প্রবচনে এই চাটুকারিতার অজস্র উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়। তবে রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষায় এটা নতুন। রাজাকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করার বিধান ধর্মীয় ও সামাজিক সংহিতাকারেরা কেউ-কেউ দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ ‘পূজারিণী’ কবিতায় তারই বর্ণনা দিয়েছেন : ‘‘বেদ ব্রহ্মণ রাজা ছাড়া আর কিছু নাই ভবে পূজা করিবার/ এই ক’টি কথা জেনো মনে সার/ ভুলিলে বিপদ হবে।’’ ... অতএব এমন পরিপ্রেক্ষিতে রাজা থেকে ভূস্বামী— যিনিই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হোন না - কেন তাঁকে ‘দেবতা’ বানিয়ে তুষ্ট করার প্রবণতা আশ্রিত কবি-শিল্পীরা আত্মরক্ষার্থেই অর্জন করেছেন। একটা খুব উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সন্ধ্যাকর নন্দীর লেখা ‘রামচরিত’ — যা এমন দো রোখা শব্দ ও চিত্রকল্পে রচিত যাতে একই সঙ্গে তাঁর পৃষ্ঠপোষক, পালবংশীয় বিখ্যাত রাজা রামপাল এবং দশরথ নন্দন রামচন্দ্রের আংশিক জীবনালেখ্য বর্ণনা করা হয়েছে। প্রাচীন ভারতে প্রায় সমস্ত রাজাদেরই মূল নামের পিছনে একটা করে ‘দেব’ জুড়ে দেওয়া হতো লেজুড় হিসাবে— তার পিছনেও ছিল সেই একই মানসিকতা। শুধু জাপানেই নয়, এদেশেও এক একটা রাজবংশকে ‘‘দেবকুলজাত’’ বলে মনে করা হতো। উদাহরণ, সূর্যবংশ’, ‘চন্দ্রবংশ’ - ইত্যাদি। অর্থাৎ সূর্য দেবতাল, চন্দ্র দেবতার খাস - অবতংস এঁরা— এটাই ছিল প্রচারিত - বিশ্বাস; অথবা, বিশ্বস্ত প্রচার।
ধর্মগুরুদের ক্ষেত্রেও এমন ব্যাপারটা আকছার দেখা যায়। তার কারণটা সহজবোধ্য। ধর্মের আচ্ছন্নতা মানুষের বোধবুদ্ধিকে আবৃত করে দেয় তার অগোচরেই। কিন্তু ‘রাজাগজা’দের ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উৎস থেকে উৎসারিত প্রভুকে তোষণ করে বিও এবং নিরাপত্তা লাভ তো বটেই; তবে অনেক সময়েই এটা ঝাঁকের কই’ হবার সচেতন কিংবা অবচেতন ঝোঁক থেকেও ঘটে যে, এমন ব্যাখ্যা মনোবিজ্ঞানীরা দেনও। ‘‘দিল্লিশ্বরো বা জগদীশ্বরো ’’—জাতীয় প্রবাদ তো এর জাজ্বল্যমান নজির। মুঘল সম্রাটকে তোষামোদ করতে গিয়ে যে-বচনের উদ্ভব হয়, পরে সেটাই ব্রিটিশ শাসনের আমলে ইংরেজ রাজের সম্পর্কেও ব্যবহৃত হতে থাকে।
এই ধরনের হাস্যকর ‘প্রভু’-ভজনার একটি অতি-উদ্ভট নিদর্শন হলো হারাণচন্দ্র রক্ষিতের লেখা ‘ভিক্টোরিয়া যুগের বাংলা সাহিত্য’। ১৯শ শতকের - হারান বাবুর সমকালের বাংলা সাহিত্য নিয়ে লেখা একটি ঝর্ঝরে, তথ্যনিষ্ঠ বই। ঘটনাচক্রে তখন ইংল্যান্ডের সম্রাজ্ঞী (দুঃখজনক হলেও, ভারতেরও) ছিলেন ভিক্টোরিয়া। ওই সময়ের ইংরেজি সাহিত্যের কতকগুলি বিশেষ প্রবণতা দেখা গেছে বলে, সমকালীন ব্রিটিশ সাহিত্যসমালোচকরা তাকে ‘ইংলিশ লিটেরেচার ইন দ্য ভিক্টোরিয়ান এজ’ বলতেন। যদিও সেটাও ছিল রাজভক্তি’ দেখানোর জন্য এক বর্গের অহেতুক তোষামোদি। কিন্তু তাঁদের নকলে হারানবাবুর বইয়ের ওই নামকরণ কি আরও হাস্যকর নয়। রানি ভিক্টোরিয়া তখন এদেশের সম্রাজ্ঞীও ছিলেন (ভাগ্য-টাগ্য মানলে লিখতাম ‘নেহাৎই দুর্ভাগ্যবশত?) — কিন্তু তাতে সমকালীন বাংলা সাহিত্যের কী এসেছিল, গিয়েছিল?... তাছাড়া, ওই আমলের বিলিতি সাহিত্যে যে প্রগাঢ় রক্ষণশীলতা দেখা যায়, তার ছিটেফোঁটা সাদৃশ্যও তো তৎকালীন বাংলা সাহিত্যে দেখি না, বরঞ্চ ধীরে ধীরে মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রমেশচন্দ্র দত্ত, বিহারীলাল এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে প্রগতিমুখিনই হয়ে উঠছিল তা।
।।৩।।
শিল্প-সাহিত্যে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ রাজনৈতিক তোষামোদির বিষয়টা এখনকার ভারতবর্ষে অবশ্য উত্তরোত্তর বেড়ে উঠছে। আবার এরই বিপ্রতীপ-প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দেবতার-বিরোধী অসুর-টসুর বলেও আঁকাজোকা, লেখা, গড়া-ইত্যাদিও চলছে। রাজনৈতিক তোষামোদি করে দেবী মহিমায় ভূষিত করার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিল ‘‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া’’ স্লোগানটা তৈরি করা। ‘দেশমাতৃকা ইন্দিরা’ - ইত্যাদি দেওয়াল-লিখন-টিখনও একদা খুবই দেখা যেত। এমন কি, ১৯৭১-এর যুদ্ধ জয়ের পর অবনীন্দ্রনাথের সুবিখ্যাত ভারতমাতা’ ছবির অক্ষম অনুকরণ করে ইন্দিরা গান্ধীর ছবি আঁকাও তো দেখেছি।
এই প্রবণতা এখনও বাড়াবাড়ি রকমে দেখা যায়। কিছু দিন আগেই গণমাধ্যমে দুটি ছবি দেখা যাচ্ছিল। সে দুটো ভেজাল-বা-‘ফেক্’ নয়, তার প্রমাণ যাঁরা এরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে দশভুজা দুর্গার রূপে মূর্তিমন্ত করেছিলেন, সেই শিল্পীদের এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের নাম-ধাম সবই সাড়ম্বরে সেখানে উল্লেখিত ছিল! একটি মূর্তি দক্ষিণ কলকাতার একটি ক্লাবের (লক্ষাধিক টাকা খয়রাতি পাওয়ার কৃতজ্ঞতাতেই হয়ত বা!), সেখানে দুর্গামূর্তির দশহাতের ঘেরাটোপে মাননীয়ার ফাইবার গ্লাসের মূর্তি আটকালো ছিল। মহামান্যা জোড়হস্ত; তবে তাঁর ‘দৈবী’ দশভুজে চিহ্নিত ছিল, কন্যাশ্রী - লক্ষ্মীর ভাণ্ডার - স্বাস্থ্যশ্রী - সবুজসাথী ইত্যাদি খয়রাতি প্রকল্পগুলির নাম লেখা বোর্ড!!
বাগুইহাটির তিনটি ক্লাব মিলেও মুখ্যমন্ত্রীর একটি ফাইবার গ্লাস মূর্তি তৈরি করান পুজোর মরশুমে, যার খরচ পড়েছিল তাঁদেরই সগর্ব উক্তি অনুযায়ী) মাত্র দু’লাখ দশ হাজার টাকার মতো! সন্দেহ নেই, আশপাশের বাসিন্দাদের কাছ থেকেই পুজোর ‘চাঁদা’ (?) হিসাবে টাকাটা তোলা হয়েছিল! ওই প্রতিমার শিল্পীও সগর্বে বলেছিলেন, ‘‘এরাজ্যের সবাই-ই দিদিকে দশভুজা দুর্গা মনে করেন, তাই এই মূর্তি গড়েছি!’’ ... মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন!!
রাজনৈতিক কারণে প্রভু কিংবা নেতা-নেত্রীকে ‘দেবীমহিমা দিয়ে শিল্পসাহিত্য রচনার দেশি-বিদেশি এত-এত উদাহরণ আছে যে তার ইয়ত্তা নেই। আর ওই রাজনৈতিক স্বার্থেই বিপক্ষীয় কোনও মান্য ব্যক্তিকে রাক্ষস বা অসুর ইত্যাদি রূপে উপস্থিত করার দু’-একটা খুব উল্লেখযোগ্য নমুনা পেশ করে এই আলোচনা সাঙ্গ করা যেতে পারে। ১৯৪৫ সালে আরএসএস তাদের একটি মুখপত্র ‘অগ্রণী’-তে একটা কার্টুন প্রকাশিত করে। যেখানে দশমুণ্ড বিশিষ্ট গান্ধীজীর দিকে তির ছুঁড়ছেন সাভারকার এবং শ্যামাপ্রসাদ। গান্ধীজীর দু‘পাশের মুণ্ডগুলি হলো: বল্লভভাই প্যাটেল, রাজাগোপালচারী, কৃপালনি, নেহরু, মৌলানা আজাদ, সুভাষচন্দ্র বসু, পট্টভি সীতারামাইয়া, গোবিন্দবল্লভ পন্থ প্রমুখ দেশের নেতাদের। সাভারকর ও শ্যামাপ্রসাদকে রাম-লক্ষ্ণণ হিসাবেই কল্পনা করা হয়েছে। আর গান্ধীজী তার সঙ্গে থাকা প্রধান নেতাদের সমাহারে রাবণ বলে চিত্রিত হয়েছেন। (নেতাজী তখন অবশ্য দেশেও নেই, কংগ্রেসও ছেড়েছেন বহু আগে; তবে তাঁর অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তিনিও হিন্দু মহাসভা আরএসএস পন্থীদের বিরাগভাজন ছিলেন।) এ ছবি পরেও নানাভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিহারের বিগত বিধানসভা নির্বাচনের সময়ও এটা নিয়ে ধুন্দুমার হয়েছে বিজেপি এবং অন্যান্য দলগুলির মধ্যে।
এই পশ্চিমবঙ্গেই বছর দুই আগে গান্ধীজীর মুখের আদলে প্রতিমার নিচে মহিষাসুরের মুখ গড়া হয়েছিল। প্রবল আপত্তি-টাপত্তি ওঠায়, শেষে অসুরের মুখে একজোড়া গোঁফ জুড়ে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।
আসলে প্রভু পৃষ্টপোষক-শাসক এঁদের তুষ্ট করার জন্যেই এই চাটুবৃত্তি। আর বিপক্ষীয়দের অসম্মান করার পিছনেও সেই প্রভুতোষণের তাড়না। এই ভীরুতা এবং কৃপা প্রত্যাশাকে অবশ্য বিদ্রুপ না করে পারা যায় না। ... তেমন বিদ্রুপ দুশো বছর আগেই বিখ্যাত কবিয়াল ভোলা ময়রা করে গেছেন বিপক্ষীয় জগা কবিয়ালের উদ্দেশ্যে : ‘‘কবি গা’বি পয়সা পাবি, খোশামুদি কোন কারণ?’ প্রশ্নটা তো আজও সমানভাবেই প্রযোজ্য। তাই না?
নেতা-নেত্রীকে দেবমহিমা দিয়ে শিল্পসাহিত্য রচনার দেশি-বিদেশি এত-এত উদাহরণ আছে যে তার ইয়ত্তা নেই। ধর্মগুরুদের ক্ষেত্রেও এমন ব্যাপারটা আকছার দেখা যায়। তার কারণটা সহজবোধ্য। কিন্তু ‘রাজাগজা’দের ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উৎস থেকে উৎসারিত। প্রভুকে তোষণ করে বিও এবং নিরাপত্তা লাভ তো বটেই, অনেক সময়েই ঝাঁকের কই’ হবার ঝোঁকও থাকে।
Comments :0