অরিজিৎ মণ্ডল
বন্ধ হচ্ছে স্কুল, স্কুল বাড়ি বেহাল। কমছে ছাত্রছাত্রীও। তা সত্বেও বরাদ্দ খরচ করছে না কলকাতা কর্পোরেশন। এবার কমিয়ে দেওয়া হয়েছে শিক্ষার খাতে বরাদ্দও।
কলকাতা কর্পোরেশনে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৫৯ কোটি ৭৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। বাজেটের তথ্য দেখাচ্ছে খরচ হয়েছে তার অনেক কম, ৪৪ কোটি ৬৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা। যার অর্থ, প্রায় ২৫ শতাংশ খরচ করা হয়নি।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৫৯ কোটি ৩৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। যা গতবারের বরাদ্দ থেকে ৪৪ লক্ষ টাকা কম।
গত শুক্রবার পেশ কলকাতা কর্পোরেশনে বাজেটে দেখা যাচ্ছে মোট কর্পোরেশন স্কুলের সংখ্যা ২১৭। যার মধ্যে বাংলা মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা ৭০, ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা ৬৭, হিন্দি মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা ৩৮, উর্দু মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা ৪১। ১টি ওড়িয়া মিডিয়াম স্কুলও রয়েছে। এছাড়াও শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের সংখ্যা ৬৫টি।
বরাদ্দ কমায় কতটা সমস্যা হবে কলকাতা কর্পোরেশনের স্কুল বিভাগের? শিক্ষা বিভাগের মেয়র পরিষদ সদস্য সন্দীপন সাহার দাবি, ৪৪ লক্ষ টাকা কম বরাদ্দ হলেও পরিকাঠামো গত কোনও সমস্যা হবে না।
কিন্তু বাস্তব বলছে অন্য কথা পরিকাঠামো গত সমস্যা রয়েছে বহুদিন ধরে। অনেক স্কুল বাড়ি অবস্থা খুবই খারাপ। কয়েকটি স্কুলকে কর্পোরেট অনুদানের মাধ্যমে কিছু ক্লাসরুম ও অবয়বগত উন্নয়ন করা হয়েছে।
সন্দীপন সাহা বলেছেন, ‘‘কর্পোরেট অনুদান নেওয়া হলেও কোনও বেসরকারি সংস্থা পঠন-পাঠন বা কর্পোরেশন স্কুল চালানোর ক্ষেত্রে কোনও ভূমিকা রাখে না। তা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয় কর্পোরেশনের শিক্ষা বিভাগের দ্বারাই। কর্পোরেট অনুদান শুধুমাত্র ক্লাসরুম, পড়াশুনার সরঞ্জাম ও অন্যান্য পরিকাঠামোগত ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়।’’
এসএফআই'র অভিযোগ ২১৭টি স্কুল বলা হলেও আদপে ৭০ থেকে ৭৫টির বেশি স্কুল নিয়মিতভাবে চলে না। অথবা চললেও সেখানে ৩০ জনের বেশি ছাত্র-ছাত্রী নেই।
এসএফআই কলকাতা জেলা সম্পাদক দীধিতি রায় বলেছেন, "২০১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০০-র কাছাকাছি। বর্তমানে তা কমে ২১৭টি দাঁড়িয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি কর্পোরেশন স্কুলে ৬ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকা প্রয়োজন। বহু স্কুলে তিনজনের বেশি শিক্ষকই নেই।’’ তিনি বলছেন, ‘‘২০২১ সালে শেষবার নিয়োগ হয়েছিল কর্পোরেশন স্কুলগুলির শিক্ষকের। তারপর থেকে নিয়োগ হয়নি।‘‘
এসএফআই অভিযোগ করছে যে এমন অনেক এমন স্কুল রয়েছে যেখানে কুড়ির বেশি ছাত্রছাত্রী নেই।
বাজেটের তথ্য অনুযায়ী কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলগুলিতে মোট ১৩ হাজারের মতো ছাত্রছাত্রী রয়েছে। বাজেট বইতে বলা হয়েছে গোটা কলকাতায় ২১৭টি স্কুলের মধ্যে ২৬টি মডেল স্কুল রয়েছে। যেখানে অত্যাধুনিক ক্লাসরুম, লাইব্রেরি, আলাদা খেলাধুলার জায়গা সহ অন্যান সুযোগ সুবিধা রয়েছে।
সন্দীপন সাহা দাবি করেছেন যে স্কুলগুলির উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাইছি, ছাত্রছাত্রী-অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের যোগাযোগ বাড়াতে। যার ফলে শিশুরা কি শিখছে এবং কী সমস্যা হচ্ছে তা শিক্ষা বিভাগ সরাসরি জানতে পারবে। এর জন্য আমরা বছরে ৩টি শিক্ষক-অভিভাবক সভার আয়োজন করার চেষ্টা করব।’’
কিন্তু দীধিতি বলেছেন, ‘‘ধুঁকতে থাকা বহু স্কুলকে ‘টিচ ফর ইন্ডিয়া‘ বা ‘একতারা‘-র মতো এনজিওর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে সমস্ত পঠন-পাঠন চালায় তারাই। শেষ কয়েক বছরে কলকাতায় ৫৩১টি স্কুল বন্ধ হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে অঙ্গনওয়াড়ি স্কুল, সরকার অনুমোদিত স্কুল, এবং কর্পোরেশন স্কুলও।’’
এই কর্পোরেশন স্কুলগুলিতেই কলকাতা শহরের একেবারে গরিব প্রান্তিক অংশের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করেন। কর্পোরেশন বাজেটে প্রায় ৪৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া মানে এই অংশের ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনায় সমস্যার সম্মুখীন হবে বলে মনে করছে এসএফআই।
এসএফআই নেতৃবৃন্দ জানাচ্ছেন যে এসএফআই রাজ্য জুড়ে ‘স্কুল বাঁচাও মূল বাঁচাও‘ আন্দোলন করছে। এই আন্দোলন কর্পোরেশন স্কুল বাঁচানোর জন্যও চালাতে হবে।
বাজেট এবং কলকাতা কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটে স্কুলের সংখ্যার তথ্যে হেরফের রয়েছে। বাজেটে সংখ্যা ২১৭ বলা হলেও ওয়েবসাইট দেখাচ্ছে ২৬৩। মেয়র পারিষদ বলছেন, ‘‘বহু দিন ধরে তথ্য সংশোধনের চেষ্টা করা হলেও তা হয়নি। দ্রুত সঠিক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করছি।’’
Comments :0