গল্প
নতুনপাতা
----------------
আমার বাবা
----------------
সৌরীশ মিশ্র
আমাকে ছেড়ে আমার বাবা চলে গিয়েছেন কয়েকদিন আগে। একেবারে আকস্মিক ভাবেই।
দুপুরের খাবার খেয়ে সবে উঠেছিলেন সেইদিন। আমি বাড়িতেই ছিলাম। হঠাৎই বললেন, "আমার শরীরটা খারাপ করছে। গরম লাগছে খুব। হাওয়া কর্।"
ঐটুকুই শুধু বলতে পেরেছিলেন কেবল আমায়। তারপর, বিছানাতেই আমার কোলেই এলিয়ে দিয়ে, ছেড়ে দিলেন পুরো শরীরটা। চোখের সামনে আমার, বাবা চলে গেলেন।
সব মিটে গেছে কাল থেকে ঠিক করেছি অফিস যাব।
বুধবার। এখন বিকেল গড়িয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা নামতে আর বেশি দেরী নেই। আমার ঘর থেকে পায়ে-পায়ে গিয়ে দরজায় টাঙানো পর্দাটা সরিয়ে বাবার ঘরে ঢুকলাম। ঘরটায় আলো জ্বালানো ছিল না। বাইরে থেকে যতটা আলো ঢুকছে ঘরে, তাতে আলো-আঁধারি এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে ঘরের ভিতর। একটু সময় লাগল ঐ অল্প আলোয় আমার চোখ সইতে। সারা ঘর জুড়ে বাবার ব্যবহৃত সব জিনিস। ওর প্রতিটার সাথে জড়িয়ে আছে বাবার কতো যে স্মৃতি!
নাহ্, ঘরের আলোটা জ্বালানো দরকার, কথাটা মনে মনে নিজেকে বলে যেই না লাইটের স্যুইচটা অন্ করেছি, দেখি, ঘরের এক কোণে মেঝেতে জড়সড় হয়ে বসে আছে আমার মেয়ে কুঁড়ি! দু'হাতে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে আছে আবার কি একটা যেন! এমন ভাবে আঁকড়ে ধরে আছে মেয়ে বস্তুটা, সেটা যে কি বুঝতে পারছি না। আমি তো স্বাভাবিক ভাবেই অবাক হয়ে গেছি পুরো, ওকে ওখানে বসে থাকতে দেখে! এতোক্ষণ যে খেয়ালই করিনি ও ঘরে আছে!
"কুঁড়ি, কি করছিস কি তুই এখানে?" জিজ্ঞেস করি ওকে। "আর, হাতে ওটা কি তোর?"
কুঁড়ি মেঝে থেকে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। দেখতে পাই এবার, ও যেটা হাতে ধরে আছে সেটা একটা ফটো। তাছাড়া মেয়ে যে কাঁদছে, তাও ওর চোখ-মুখের অবস্থা দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না আমার।
কুঁড়ি ছুটে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে। ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে এখনও ও। এবার চোখ পড়ে কুঁড়ির হাতের ফটোটার উপর। এই ছবিটা আমারই তোলা। গত ডিসেম্বরেই তুলেছিলাম ফটোটা। পাড়া থেকে অর্গানাইজ করা পিকনিকে গিয়েছিল আমাদের পুরো পরিবার। তখন ছবিটা তুলেছিলাম। ছবিটা বাবার আর কুঁড়ির। বাবার কোলে হাসি-হাসি মুখে আমার মেয়ে। বাবার ঠোঁটের কোণেও একটু হাসি লেগে।
মেয়ে এখানে কি করছিল, এতোক্ষণে পরিস্কার হয় সবটা আমার কাছে। বাবাকে মিস্ করছে আমার মেয়ে।
এইসবই ভাবছি মনে-মনে আর মেয়ের মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, শুনতে পেলাম আমার বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে-কাঁদতেই কুঁড়ি অস্ফুটে বলছে আমায়, "বাবা, দাদুর জন্য খুব খুব মন খারাপ করছে। কেউ আর আমাকে দিদিভাই বলে ডাকবে না কক্ষনো।" কথাটা বলেই হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকে ফের মেয়ে।
মেয়ের কথাকটা শুনে আমি কি সান্ত্বনা দেবো ওকে, নিজেই ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলি আমি এবার।
--------------------------------------
Comments :0