বই
মুক্তধারা
ঋত্ত্বিককুমারের মানসপুত্র
শান্তনু
পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে তাঁর সহপাঠী মণি কাউলের প্রথম ছবি ‘উস্কি বেটি-র সহ-চিত্রনাট্যকার ছিলেন তিনি। ছবি তৈরির প্রতিটি পর্বেই তিনি ছিলেন মণির ঘনিষ্ঠ সহযোগী। কিন্তু তারপরেও ছবিটা প্রথমবার দেখে তাঁর মনে ধরেনি। কেন? সেটাও খোলামেলা জানিয়েছেন তিনি। নাট্যকার মোহন রাকেশের যে কাহিনীর ভিত্তিতে তাঁরা ‘উস্কি বেটি’র চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, তাঁর মতে সেই গল্পটা অনেকটাই ‘সেন্টিমেন্টাল’—আবেগে থৈ থৈ। কিন্তু ছবির ট্রিটমেন্ট-এ মনি সেই উথলে ওঠা আবেগের শেষ কণাটুকু নিঙরে বের করে, রসকষহীন একটা খটখটে শুকনো বুদ্ধিবাদী শিল্পচর্চায় সেজেছেন। তিনি জন আব্রাহাম, ঋত্ত্বিক ঘটকের ভাবশিষ্য—তাঁর মনে হয়েছিল, এটা এক রকমের ‘কপটতা’। জন লিখছেন : ‘‘বিষয়ে যদি আবেগ থাকে, তবে পর্দাতেও আবেগ থাকা উচিত। একবার আমি মৃণাল সেনকে কথাটা বলেছিলাম। তাঁর ‘আকাশকুসুম’ দেখার পর— গল্পটা এক জন গানের লোকের, অথচ একটাও গান নেই ছবিতে। ওরকমটা উচিত নয়। অপ্রয়োজনে গান রাখার চেয়েও প্রয়োজনে গান না রাখাটা অনেক বেশি অনৈতিক। প্রথমটা যদি অজ্ঞতা হয়, দ্বিতীয়টা ‘বুদ্ধিবাদী আত্মরতি’ ’’। এই যে কথাগুলো, সোজাসাপটা, ভান বা ভনিতাবিহীন—এটাই টিপিক্যাল জন আব্রাহাম। পুনের ফিল্ম স্কুলে তাঁর গুরুদেব ঋত্বিককুমারের মতোই কারোর মন রেখে কথা বলা যাঁর আসে না। ঋত্বিকের মতোই জীবনটাকে খোলামকুচির মতো দুহাতে ছড়াতে ছড়াতে, জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে আগুন-পানে হেঁটে গেছেন আমৃত্যু। ঋত্বিকের মতোই নৃত্যু তাঁর সৃজনশীলতাকে কেড়েছে অকালে অসময়ে। ঋত্তিকের মতোই রেখে গেছেন কিছু অসমাপ্ত সিনেমা, অসম্পূরণ চিত্রনাট্য শুরু না হওয়া কিছু স্বপ্ন প্রকল্প। তবে পূর্ণাঙ্গ ছবির সংখ্যা ঋত্তিকের আপাত-
ক্ষীণ ফিল্ম কৃতিরও প্রায় অরা্ধেক— মাত্র চারটে ।কিন্তু তার পরেও মালয়ালাম নব-তরঙ্গ তথা আধুনিক ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস । তাঁকে বাদ দিয়ে লেখাই যায় না।
অথচ মন তো তার বেপরোয়া, বোহেমিয়ান জীবন যাপনে নিজেরটা কিছুই তো ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখেননি। মৃত্যুও এসেছে আচমকা। আকস্মিক প্রায় দুর্ঘটনার মত। কোন স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনী লেখার সুযোগ ছিল না, সময়ও হয়নি। তাঁর সিনেমা কয়েকটার বাইরে জনকে তাই খুঁজতে কিংবা বুঝতে হয়। তার ছড়ানো ছেটানো লেখাপত্তর মালয়ালাম ও বিভিন্ন সর্বভারতীয় পত্রপত্রিকা বা দূরদর্শনের আর্কাইভ থেকে পাওয়া কিছু বিরল সাক্ষাৎকার আছে তার সম্পর্কে তার বন্ধু সাথী সহকর্মী তথা সহমর্মি বিভিন্ন মানুষের ভাবনা চিন্তা দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা থেকে। সেই কাজটাই করার চেষ্টা হয়েছে ‘জন আব্রাহাম : ক্যামেরা যার কাছে বন্দুক’ বইটিতে। বইটির সম্পাদক-অনুবাদক হিসাবে দেবাশিস হালদার এখানে অগোছালো অগ্রন্থিত জন আব্রাহামকে দুই মলাটের ভেতরে যতটা সম্ভব গুছিয়ে রাখার চেষ্টায় থেকেছেন। দেবাশিস এর আগেও মালয়ালাম ছবির আরআর এক ক্ষণজন্মা প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্র স্রষ্টা জি অরবিন্দনকে নিয়েও খুবই গুরুত্বপূর্ণ জরুরী একটি সংকলনের কাজ করেছিলেন। তবে জন আব্রাহামকে নিয়ে কাজের চ্যালেঞ্জটা বোধহয় আরেকটু বেশি উত্তেজক, জটিলও। কারণ কারণ চলচ্চিত্র স্রষ্টা জন আব্রাহাম ব্যক্তি মানুষ জন প্রায়ই এ ওর পরিসরে মুখোমুখি ঢুকে পড়েন। ব্যক্তি ও শিল্পীর এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটাকে স্বীকার করেই দেবাশিস তার সম্পাদিত জন আব্রাহামকে বাংলার চলচ্চিত্র প্রেমিক পাঠকদের কাছে হাজির করেছেন। এই জন বহুমাতৃক, রংদার জীবনসম্পৃক্ত একজন চলচ্চিত্রকার। আমর্ম মার্কসবাদী জন বিশ্বাস করতেন রাজনীতি বাদ দিয়ে ছবি হতেই পারে না। একন কি সিনেমায় রাজনীতিকে বর্জন করাটাও আসলে রাজনীতিই।
নকশাল আন্দোলনের আদর্শের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি ছিল তাঁর কিন্তু ব্যক্তিহত্যা বা খতম লাইনকে বিরোধিতা করে দূরত্ব বাড়ে। তার শেষ ছবি এবং ঘটনাচক্রে সবচেয়ে পরিচিত ছবি আম্মা আরিয়ান এও তো জন এই হঠকারী জনবিচ্ছিন্ন আত্মঘাতী বিপ্লব অ্যাডভেঞ্চারের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। জন আপত্তি করেননি। তবে সিনেমা করে সমাজ বদলে দেওয়া যাবে এমন উচ্চশাণ তার আপত্তি ছিল। তিনি সিনেমাকে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সংযোগের একটা মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। তিনি চাইলেন সিনেমা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হোক। সম্ভবত সেই কারণেই একটি সাক্ষাৎকারে ছবিতে প্রতীকের ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন প্রতীকের প্রয়োজন নেই। কোন কিছু যখন আমি সরাসরি বলতে পারছি না তখনই প্রতীকের ব্যবহার করি। কিন্তু আমার বলার কথাগুলো সবটাই প্রতীকে চাপা পড়ে যাক এটা কাঙ্খিত নয়। সত্যিকারের অর্থবহ সৎ সিনেমাকে পুঁজিতন্ত্রের খপ্পর থেকে বের করে আনতেই জন ও তার বন্ধুরা গড়ে তুলেছিলেন ও ‘ওডেসা’ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ও আন্দোলন। ভালো সিনেমার চর্চাকে শহুরে এলিট-আঁতেল বাবুদের সীমানা ছাড়িয়ে প্রান্তিক মানুষের দরজায় পৌঁছে দিতে চেয়েছিল ‘ওডেসা’। ‘আম্মা-আরিয়ান’ ছিল এই প্রচেষ্টার প্রথম ফসল। সিনেমা প্রযোজনা পরিবেশনা প্রদর্শনের এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ জনের অকাল মৃত্যুতে ধাক্কা খেয়েছিল। যেমন শেষ হয়নি, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদকে নিয়ে তাঁর পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্রের কাজ। যেমন থমকে গিয়েছিল ১৯৪০-এর দশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে কায়ূর কেষক-আন্দোলন নিয়ে ছবি বানানোর স্বপ্ন –প্রকল্প।
ফিল্ম ইনস্টিটিউটে জন ঋত্তিকের প্রত্যক্ষ ছাত্র ছিলেন কিনা, এই বইয়ের একাধিক তথ্যে সে ব্যাপারে একটা সংশয় তৈরি হয়। তবে একলব্যের দ্রোণাচার্যের মতোই ঋত্তিক থেকে গিয়েছিলেন জনের মগজে-হৃদয়ে-আত্মায়, তাঁর অন্তর্গত রক্তের স্রোতে। এক পকেটে নির্ভীক-সরল শৈশব, অন্য পকেটে বোতল-ভর্তি তরল আগুনই শুধু নয়— একদিকে মানব জীবনের প্রতি তীব্র আকর্ষণ, অন্যদিকে সাফল্যের প্রতি প্রহল অনাসক্তি নিয়েই তিনি আমৃত্যু ঋত্ত্বিকের শিষ্যত্ব বরণ করেছিলেন। ঋত্ত্বিকের মত তৈরি চিত্রনাট্যের তোয়াক্কা না করে স্বতঃস্ফূর্ত উৎসারিত আবেগ-অনুভবর আঁচে ঢালাই করতেন তাঁর ছবির কাঠামো। বাড়তির মধ্যে বুনে দিতেন তাঁর সহজাত তীব্র-তিক্ত কৃষ্ণ-কৌতুকবোধ। ঋত্ত্বিকের জন্মশতবার্ষিকীর সূচনাবর্ষে তাঁর মালয়ালি মানসপুত্র জীবন ও সিনেমার গেরস্তালিতে ঘোরাফেরার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনুবাদক-সম্পাদককে ধন্যবাদ।
জন আব্রাহাম : ক্যামেরা যাঁর কাছে বন্দুক
Comments :0