সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজ্যে যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁদের অন্যতম অমলেন্দু পান্ডা। তমলুকের একটি স্কুলের শিক্ষক অমলেন্দু পান্ডা বললেন, ‘‘রাজ্যের সরকারের জন্যই আমাদের এই দশা। এর দায় মমতা ব্যানার্জি আর শুভেন্দু অধিকারী, দু’জনেরই। শুভেন্দুবাবু এখন ভালো ভালো কথা শোনাচ্ছেন। উনি তখন তৃণমূলে, মন্ত্রীও ছিলেন। আমাদের জেলায় যা দুর্নীতি হয়েছে সব উনি করেছেন। চাকরি হারিয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।’’
কেন বলতে পারছেন তাঁরা? কারণ, গত বছরের এপ্রিলের ২৫ তারিখ মহিষাদলে তমলুক লোকসভা নির্বাচনের সভায় মমতা ব্যানার্জিকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘‘তৃণমূলকে চুরি করতে শিখিয়েছে শুভেন্দু অধিকারী। ও তৃণমূলে থেকে চুরি করে পালিয়েছে বিজেপি-তে। ওর মতো অনেকেই চুরিতে হাত পাকিয়েছে আমাদের দলে থাকার সময়।’’ অমলেন্দু পান্ডার মতো জেলার অনেকেরই কথা, ‘‘শুভেন্দুবাবু দুর্নীতি করছিলেন। আর মমতা ব্যানার্জি সব জেনে বসেছিলেন। সেই শুভেন্দু গেছেন বিজেপি’তে। আর ফল ভুগছি আমরা, এখন।’’
পূর্ব মেদিনীপুরের প্রায় ২ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এদিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। কিন্তু পূর্ব মেদিনীপুর জুড়ে বক্তব্য হাজার হাজার নয়, একটিই। এই দশার জন্য মমতা ব্যানার্জির সরকার, শুভেন্দু অধিকারী দায়ী। কারণ, যখন এই দুর্নীতি হয়েছে তখন অধিকারী রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ছিলেন।
২০১৬ সালের এসএসসি’র এই বাতিল হয়ে যাওয়া প্যানেলের অযোগ্যদের যে তালিকা আগেই প্রকাশ হয়েছিল সেই তালিকার অনেকেই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার। যেমন এসএসসি গ্রুপ ডি-তে পূর্ব মেদিনীপুর জেলাতেই ‘অযোগ্য’দের সংখ্যা ৩৬৪। গ্রুপ সি-তে তা প্রায় ৫২০, নবম, দশম ও একাদশ দ্বাদশ শিক্ষক প্রায় ১ হাজার। সিবিআই’র প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে অযোগ্যদের সংখ্যার প্রায় ১৯০০ জন ছিল শুধু পূর্ব মেদিনীপুর জেলার। ২০১৬ এসএসসি প্যানেলে যে নিয়োগ হয়েছে তাতে স্বজন পোষণ এবং অযোগ্যদের নিয়োগ স্পষ্ট। গণশক্তি পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল পার্থ চ্যাটার্জি শিক্ষা মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর নিরাপত্তা রক্ষীর পরিবারের ১৩ জনের চাকরি হয়েছিল।
দুর্নীতির এমন স্বচ্ছ চিত্র পূর্ব মেদিনীপুরে রয়েছে যেখানে তৃণমূলের এসসি সেল ও জেলা পরিষদের সদস্য পলাশ বর্মণের নামও বাতিলের তালিকায়। তিনিও ২০১৬ সালের প্যানেলে চাকরি পেয়েছিলেন। চাকরি প্রাপকদের তালিকায় তৃণমূলের বুথ সভাপতি থেকে ব্লক, অঞ্চল, জেলা স্তরের একাধিক নেতা নেত্রী বা তাঁদের পরিবারের লোকেদের চাকরি পেয়েছেন।
দু’টি ব্লকের কথা আলোচনা করা যেতেই পারে। ভগবানপুর-১ ও কোলাঘাট। তৃণমূল নেতা নান্টু প্রধানের এলাকা ভগবানপুর ১ ব্লক থেকেই প্রায় ১৫০ জন শিক্ষা কর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের যুক্ত করলেই সংখ্যাটা ৩০০ পার করবে। কোলাঘাট ব্লকে শতাধিক জনের চাকরি বাতিলের খবর রয়েছে। ২০১৮ সালে খুন হওয়া তৃণমূল নেতা নান্টু প্রধানের এলাকা মহম্মদপুর-১ ও ২পঞ্চায়েতে প্রায় ৫২ জন গ্রুপ ডি কর্মচারীর চাকরি বাতিল হয়েছে। সেই সঙ্গে ১৫ জন শিক্ষকেরও বাতিল তালিকায় নাম আছে। গ্রুপ ডি কর্মীদের মধ্যে অন্যতম মহম্মদপুর ১ পঞ্চায়েতের তৃণমূল নেতা মানস মণ্ডলের পুত্রবধূ চণ্ডীপুরের চাকনান হাই স্কুলে গ্রুপ ডি কর্মী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়াও কোটবাড় গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলের নেতা নকুল পাত্র তমলুকের একটি স্কুলের গ্রুপ ডি কর্মী। কলাবেড়িয়া গ্রামের নারায়ণচন্দ্র শী নামে এক তৃণমূল নেতার ছেলে নবকুমার শীও রয়েছেন এই তালিকায়। কোলাঘাটের তৃণমূল নেতা ও চাকরি বিক্রির এজেন্ট অতনু গুছাইত এখনও পলাতক।
শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল নেতা থাকাকালীনই স্বচ্ছ নিয়োগে বাধা দেওয়া শুরু। ২০০৯ সালে প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। সেই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী পরীক্ষা হয় ২০০৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর। সারা রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষা হলেও পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় পরীক্ষা নিতে দেয়নি তৃণমূল। পরীক্ষার দিন জেলা জুড়ে রাস্তা অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর, পরীক্ষার্থীদের মারধর করে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়া আটকে দিয়েছিল তৃণমূল। নেতৃত্বে ছিল শুভেন্দু অধিকারী।
চাকরি বাতিলের ফলে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার প্রায় সবকটি স্কুলেই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্কুলের চিত্র তুলে ধরা যাক। তমলুকের শান্তনাময়ী গার্লস হাইস্কুলে ৩ জন, হ্যামিল্টন হাইস্কুল ৪, ময়না ৮, খঞ্চি হাইস্কুল ৪, গয়েশ্বরী ৩, নাটশাল হাইস্কুল ৬ জনের চাকরি বাতিল হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
Mamata Banarjee
মমতা, শুভেন্দু দু’জনেই দায়ী

×
Comments :0