গল্প
নতুনপাতা
--------------------------
আশীর্বাদ
--------------------------
সৌরীশ মিশ্র
আমার মেয়ে কুঁড়ি নতুন ক্লাসে উঠেছে। আজ থেকে ওদের নতুন সেশন শুরু। এখন সকালবেলা। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছ'টা বাজবে-বাজবে করছে। আমি তৈরী। মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাব। আমিই সাধারণত নিয়ে যাই ওকে স্কুলে। মাঝেমধ্যে ওর মা-ও নিয়ে যায়।
যাই হোক। মোটামুটি সাড়ে ছ'টা নাগাদ বেরোই বাড়ি থেকে। খবরের কাগজ দেয় যে ছেলেটা আমাদের বাড়ি, সে এক্কেবারে সকাল-সকাল কাগজ দেয়। আজও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। সেটাতেই চোখ বোলাচ্ছিলাম। দেরী হয়ে যাচ্ছে না তো বেরোতে, প্রশ্নটা মাথায় এলো হঠাৎ। খবরের কাগজ থেকে সড়িয়ে, চোখ রাখলাম হাতঘড়িতে। না, এখনও মিনিট পাঁচেক মতোন বাকি আছে সাড়ে ছ'টা বাজতে। ফের পড়তে শুরু করবো কাগজটা, তখুনি ঐ ঘরে ছুটে ঢুকল কুঁড়ি, পিছনে-পিছনে ওর মা। আর ঘরেতে পা দিয়েই মেয়ে আমাকে টানা বলে গেল, "চলো, চলো বাবা, দেরী হয়ে যাচ্ছে না স্কুলে!"
আমার মেয়ের স্কুল যাওয়াতে সবসময়ই উৎসাহ খুব। স্কুলে গেলেই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। সবাই মিলে দুষ্টুমি হবে দেদার। মজা হবে দারুণ। তাই এতো উৎসাহ তার। এদিকে, স্কুলে যাওয়া আসলে যে কারণে, পড়াশুনা করতে, সেই বিষয়টায় তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে মেয়েকে বললাম, "চল্।"
কুঁড়ির পিঠে ব্যাগ। গলায় ঝুলছে ওয়াটার বটলটা। স্কুলে যাওয়ার খুশিতে ঝলমল করছে কুঁড়ির মুখটা। ওর মা দুটো বিনুনি করে দিয়েছে ওর আজ।
"চলো, কি হোলো!" ফের বলে কুঁড়ি, আর বলেই আমার হাতটা ধরতে যায়। হঠাৎই আবার কি খেয়াল হতে বলে ওঠে সে, "ও, দাঁড়াও..." বলেই ছুট লাগায় ফের সে বাড়ির ভিতরে।
"আবার কোথাও গেলো?" স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি।
"কে জানে, কি মনে হয়েছে আবার! দেখি গিয়ে।" বলে বাড়ির ভিতরে যায় কেয়াও আর গিয়েই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফের এই ঘরে ঢুকে ওর ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে তারপর হাত নেড়ে ইশারা করে আমায়। বুঝতে অসুবিধা হয় না, মেয়ে কিছু একটা করছে ভিতরে, সেটা দেখাতে, চুপচাপ ভিতরে যেতে বলছে আমার স্ত্রী ওর সাথে।
কি ব্যাপার কে জানে! ভাবতে-ভাবতে, পা বাড়াই কেয়ার পিছন-পিছন আমি।
এই ঘর থেকে বেড়িয়ে ডান দিকে পরপর দুটো ঘর। কেয়া, প্রথম ঘরটা, যেটা বাবার ঘর ছিল, ক'দিন আগে বাবা না-ফেরার দেশে পাড়ি দেওয়ার পর থেকে যেটা খালি পড়ে আছে, সেটার টানা পর্দাটা সরায় একটু। তারপর মুখ উঁচিয়ে ইশারা করে, বাবার ঘরের ভিতরে দেখতে। আমি তাকাই ঘরের ভিতর। আর তাকাতেই, ঐ পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমি দেখি, মেয়ে আমার, বাবার টেবিলের উপর বাবার বাঁধানো যে ফটোটা আছে, সেটার সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে প্রণাম করছে বাবাকে।
পর্দা সরানোর বোধহয় শব্দ হয়েছিল একটু, কুঁড়ি এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো আমাদের দিকে। তারপর আমার দিকে চেয়ে বলে চলল, "বাবা, প্রতিদিন তো দাদুকে প্রণাম করেই স্কুল যেতাম, দাদু তো এখন স্টার হয়ে গেছে, দাদু তো নেই এখন আমাদের কাছে, তাই এই ফটোতেই দাদুকে প্রণাম করলাম..."
আমি আর কেয়া ঘরে ঢুকলাম। দু'জনই জড়িয়ে ধরলাম আমাদের মেয়েকে। জানি না, বাবা কোথায় আছে! তবু বললাম মনে মনে, "বাবা, তুমি ওকে আশীর্বাদ কোরো।"
----------------------------------
Comments :0