ডাবল ইঞ্জিনের ডাবল সুফল বিতরণের জন্য রাজ্যজুড়ে রেলের প্ল্যাটফর্ম, স্টেশনচত্বর সহ রেলের জমিতে থাকা যাবতীয় হকার স্টল এবং অস্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে ধূলিসাৎ করার অভিযান চলছে। কোনোরকম আবেদন নিবেদন, কাকুতি-মিনতি, দাবি-প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে গ্রাহ্য করার জন্য ওপরতলা থেকে নির্দেশ এসেছে। নিচুতলার আধিকারিকদের উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করতে নিষেধ করা হয়েছে। নামকাওয়াস্তে একটা নোটিস দেওয়ালে সেঁটে দিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ দাগ মুক্ত। তারপর বুলডোজার চালিয়ে ত্রিশ বছরের, চল্লিশ বছরের, ৫০ বছরের দোকানগুলি মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কার কী সর্বনাশ হলো, কে অসহায় আর্তনাদ করল, নিমেষে কে সব হারালো এসব দেখার সময় নেই কারোর। এমন কি কিছুক্ষণ আগেও যে দোকানটা তার নিজের ছিল এখন তার ধারে কাছে ঘেঁষারও অধিকার নেই। মোদী সরকারের কেন্দ্রীয় বাহিনী আর শুভেন্দু সরকারে রাজ্য বাহিনী যৌথভাবে ঘিরে রাখছে নিশ্ছিদ্র ভাবে ঘিরে রেখে ধ্বংসের অভিযান চালাচ্ছে, গরিবগুবরো দিন এনে দিন খাওয়া অসহায় মানুষগুলোর অন্নের সংস্থান ঝেঁটিয়ে বিদেয় করছে।
হিন্দুত্ববাদের কি মহিমা! এই হিন্দুবাদীরা নিজেদের রাষ্ট্রবাদী বলে বড়াই করে। তাদের কাছে রাষ্ট্র সর্বশক্তিমান। সেই হিন্দুত্ববাদী সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ মানুষ অর্থহীন। রাষ্ট্রবাদে রাষ্ট্র তাদেরই পাত্তা দেয় এমনকি সেরা করে যাদের হাতে বিপুল অর্থ-সম্পদ আছে। রাষ্ট্রবাদে রাষ্ট্র মুষ্টিমেয় বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজির সেবাদাস। তাদের সেবার জন্য রাষ্ট্র একপায়ে খাড়া। কিন্তু হাড় হাভাতে চালচুলাহীন হকারদের জন্য রাষ্ট্রবাদীরা ভাবতে যাবে কেন? কর্পোরেট বানিয়ারা হিন্দুত্ববাদী ও রাষ্ট্রবাদীদের তহবিলে কোটি কোটি টাকা উপঢৌকন পাঠায়। তাতে তহবিল ফুলে ফেঁপে হিমালয় স্পর্শ করে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দলের তকমা মেলে। সেই টাকায় ভোটে জেতার জন্য টাকার ফোয়ারা ছোটানো যায়।
হকারদের কাছ থেকে তো কানাকড়িও মিলবে না। এরা বড় জোর একটা ভোটার হতে পারে, রাষ্ট্রের আর কোনও কাজে লাগবে না। তাই এই আবর্জনা রেলের এলাকা থেকে দূর করাই রাষ্ট্রের কাজ। এদের তাড়িয়ে মোটা অর্থের বিনিময়ে ঝাঁ-চকচকে দোকান বসানো হবে। সেখানে উচ্চ মূল্যের ব্রান্ডেড পণ্য (বড় বড় কোম্পানির মাল) বিক্রি হবে। মুনাফা বাড়বে আদানি, আম্বানিদের। শিয়ালদহ স্টেশন যেমন কলকাতার অন্যতম বৃহৎ শপিং মলে পরিণত হয়েছে। সব বড় বড় কোম্পানির দোকান। রাষ্ট্রবাদীরা চায় ভিখারিসম হকারদের তাড়িয়ে সব স্টেশনে বৃহৎ সংস্থার বিপণন ব্যবস্থা চালু করবে।
রেল দিয়ে শুরু। এবার উচ্ছেদ প্রসারিত হবে কলকাতা সহ রাজ্যের সব শহরে। রাষ্ট্রের রাস্তায় বা জমিতে হকারি চলবে না। জমি বা দোকান ঘর কিনে বা ভাড়া নিয়ে আলু-পটলের দোকান করো। না পারলে পেটে গামছা বেঁধে পড়ে থাকো।
আরএসএস-বিজেপি আদতে বিত্তবানদের দল। রাষ্ট্রবাদের নামে আইন ও নিয়মের শৃঙ্খলে মানুষকে খাঁচায় বন্দি করে বড়লোকের স্বার্থে রাষ্ট্রকে অর্পণ করে। রাষ্ট্রবাদ আসলে স্বৈরাচার। একদলীয় আধিপত্যবাদ। গণতন্ত্র মানে না। গণতন্ত্রে প্রতিটি নাগরিকের সমানাধিকার। গণতন্ত্র কোনও নাগরিকের মুখের ভাত কাড়ে না, তাদের পেটে লাথি মারে না। গণতন্ত্রে মানবিকতার অধিষ্ঠান থাকে। গণতন্ত্র কোনও হকারকে উচ্ছেদ করার আগে কাল থেকে সে পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচবে সেটা ভাবে। তার বিকল্প কিছু একটা করে তারপর সরিয়ে দেয়। গণতন্ত্রের একটা মানবিক মুখ থাকে। গণতন্ত্র তার নাগরিকদের সম্মান করে মর্যাদা দেয়। রাষ্ট্রবাদে মানবিকতার কোনও জায়গা নেই। রাষ্ট্রবাদ মানুষের উপরে রাষ্ট্রকে স্থান দেয়। তাই হকারদের জন্য রাষ্ট্রবাদীরা ভাববার প্রয়োজন বোধ করে না।
editorial
রাষ্ট্রবাদের গিলোটিন
×
Comments :0