Pushback

বেনাপোলে পুশ ব্যাক রুখে দিল বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক

মীর আফরোজ জামান : ঢাকা

বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে শতাধিক লোককে বিএসএফের পুশ ব্যাক চেষ্টা রুখে দিয়েছে বলে দাবি বিজিবি’র। এই ঘটনায় সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কঠোর অবস্থান নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ভারতের তরফে তথাকথিত ‘পুশ ব্যাক’ ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় মাইকিং চলছে। মঙ্গলবার দুপুরে বেনাপোল সীমান্তে বিজিবি’র এমন তৎপরতা দেখা গিয়েছে।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মহাম্মদ সাইফুল আলম খান জানান, রবিবার রাতের দিকে কয়েকটা গাড়িতে করে শতাধিক মহিলা-পুরুষকে সীমান্তে এনে জড়ো করেছিল বিএসএফ। পরে গভীর রাতে সীমান্ত লাইট অফ করে তারকাঁটা বেষ্টিত বিভিন্ন গেট খুলে তাদেরকে সাদিপুর সীমান্তের খড়ের মাঠ দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকানো চেষ্টা চালায়।
এইসময় টহলরত বিজিবি’র প্রতিরোধে এই পুশ ব্যাক ঠেকিয়ে দেওয়া হয়। সীমান্তের ২১/৬ পিলারের পাশ দিয়ে ১২ জনকে তারকাঁটার বাইরে ঠেলে দিলেও বিজিবি’র বাধায় গত ৩ দিন ধরে জিরো লাইনে আটকে রয়েছেন তাঁরা। মাঠের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে হচ্ছে তাদের।


সোমবার ফ্ল্যাগ মরিটিংয়েও এব্যাপারে কোনও সুরাহা হয়নি। ফলে মহিলা-শিশু ও পুরুষরা অমানবিক দুর্ভোগে পড়েছেন। সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ ভারী অস্ত্র বসিয়ে রয়েছে মুখেমুখি অবস্থানে। সীমান্তে টানটান উত্তেজনা।
সীমান্তে কর্তব্যরত বিজিবি’র এক আধিকারিক জানালেন, মঙ্গলবার সীমান্ত এলাকায় কোনও লোকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে সীমান্তে ঝোপ-ঝাড়ে লুকিয়ে থাকতে দেখেনি তাদের বলে মন্তব্য করেছে বিজিবি সদস্যরা।
এ মানবিক বিষয়ে দু’দেশের সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন স্থানীয়রাও।
এদিকে, ভারতীয় মিডিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের পুশ ব্যাক বা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে মূলত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা সীমান্তের কথা উঠে এসেছে। এই খবরগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন, চুয়াডাঙা ব্যাটেলিয়নের ৬ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহম্মদ নাজমুল হাসান। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘‘প্রতিবেদনে মুর্শিদাবাদ সীমান্তের কথা বলা হয়েছে।’’
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে  ১ জুন ২০২৬ তারিখে নাকি বিএসএফ ১৭ জন বাংলাদেশি নাগরিককে মুর্শিদাবাদের রানিনগর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের পরিচয় বাংলাদেশি হিসাবে যাচাই করার পর বিএসএফ ও বিজিবি’র সমন্বয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে এই  হস্তান্তর করা হয়। এই খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা খবর।
টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইকনমিক টাইমস অন্য একটি খবর প্রসঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল জানান, উত্তর ২৪ পরগনা বিথারী-হাকিমপুর সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশবিরোধী অভিযানের পর শত শত মানুষ বিথারী-হাকিমপুর সীমান্তের দিকে যেতে শুরু করে। ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে এটিকে স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফেরত যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ত্রিপুরা সীমান্ত বিষয়ে ইকনমিক টাইমসের রিপোর্ট ২০২২ সাল থেকে ত্রিপুরায় আটক হওয়া বিদেশিদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ছিলেন। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ ও ফেরত পাঠানো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও দেখা গেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা প্রকাশ্যে পুশ ব্যাক করা হবে বলে হুমকি দেওয়ার পরে বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছিল। মোদী সরকারও পরে বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিক সরকারি নীতি হিসাবে উপস্থাপন করেনি। হিন্দুস্থান টাইমস একটি খবরে বলেছে, ‘‘বাংলাদেশি সূত্র অনুযায়ী খাগড়াছড়ির পাঁচড়ি, জামিনীপাড়া, খেদাছড়া, মৌলবিবাজারের কিছু এলাকা কুড়িগ্রামের রৌমারি চরাঞ্চল এবং সুন্দরবনের মন্দারবাড়িয়া এলাকায় জোর করে লোক পাঠানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে”। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বড় অংশে ঘটনাগুলোকে অবৈধ অভিবাসীদের অনুপ্রবেশ-বিরোধী অভিযান হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে । অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার বলছে, যথাযথ কূটনৈতিক ও যাচাই প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া পুশ-ইন বা পুশ-ব্যাক গ্রহণযোগ্য নয়। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও হয়েছে। এটির কোনও নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়াই খবর করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহম্মদ নাজমুল হাসান। লেফটেন্যান্ট নাজমুল ২ জুন আনন্দবাজার পত্রিকার একটি রিপোর্ট উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, সোমবারে ৫৫ জনকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়েছে খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। রিপোর্টে বলা হয়েছে নথি যাচাই করে বিজিবি’র সঙ্গে বোঝাপড়া করেই পুশ ইন করা হয়েছে এই সব খবরের পিছনে কোনও অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতা থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। 
এদিকে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সীমান্তে যে কোনও ধরনের অবৈধ পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের বিরোধিতা করেছেন। মঙ্গলবার ঢাকার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত দিয়ে পুশ ব্যাকের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে এবং সীমান্তে বিজিবি সতর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, কোনও ব্যক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নাগরিক হন এবং অন্য দেশে অবস্থান করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা পাঠিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আইনগত নিয়ম মেনে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বর্তমানে এ ধরনের কোনও আনুষ্ঠানিক আবেদন সরকারের কাছে ঝুলে নেই বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে উত্তেজনার মধ্যেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন ৮ জুন নয়াদিল্লিতে শুরু হবে। এই সম্মেলন চলবে ১১ জুন পর্যন্ত। বিজিবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মঙ্গলবার।

Comments :0

Login to leave a comment