Constitution and TMC Govt

মহা বিপদের কাল

সম্পাদকীয় বিভাগ

সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির উপস্থিতিতে শনিবার জলপাইগুড়িতে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি দেশের সংবিধান বিপন্ন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধানকে ক্রমাগত অস্বীকার করে যে রাজনীতি চালাচ্ছে, তাতে দেশে আদৌ সাংবিধানিক শাসন চলছে কিনা তা নিয়ে সংশয় ও সন্দেহ পুরোপুরি সঙ্গত। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর মুখে যে একথা শোভা পায় না সেটাও সংশয়াতীত। কারণ তিনি নিজেই সংবিধানকে অমান্য করে পশ্চিমবঙ্গে শাসন চালাচ্ছেন। সংবিধান নাগরিকদের যে গণতান্ত্রিক অধিকার দিয়েছে তার ওপরে মমতা ব্যানার্জির সরকার শুরু থেকেই আঘাত করে চলেছেন। তদুপরি ভারতের সংবিধানের গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি যে ধর্মনিরপেক্ষতা, সেটাও তিনি অস্বীকার করে চলেছেন। যেদিন মুখ্যমন্ত্রী জলপাইগুড়িতে সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিচারপতিদের সামনে ‘সংবিধান বিপন্ন’ বলে চিৎকার করেছেন, তার আগের দিনই শিলিগুড়ির মাটিগাড়ায় তিনি সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যয় করে মহাকাল মন্দির তৈরির জন্য শিলান্যাস করেছেন। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে সরকারি জমি এবং অর্থ দিয়ে কোনও ধর্মীয় উপাসনাস্থল তৈরির অনুমোদন নেই। শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির, দীঘায় জগন্নাথ মন্দির, জ্যোতি বসু নগরে (নিউটাউন) দুর্গামন্দির সহ সরকারি অর্থে এই ধরনের প্রতিটি নির্মাণ কাজই সংবিধানবিরোধী।
ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নির্দেশ কেবলমাত্র সব ধর্মকে সমান চোখে দেখা বা নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণের মধ্যেই সীমিত নেই, বরং তা রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। ‘সেকুলার’ শব্দটির মধ্যেই এই নির্দেশ নিহিত রয়েছে এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বহুবার তা ব্যাখ্যা করে বলে দিয়েছেন। আধুনিক বিশ্বের দরবারে যে যে কারণে ভারতের গণতন্ত্র মর্যাদা পায়, তার অন্যতম কারণ এই ধর্মনিরপেক্ষতা। আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণায় বিশ্বাসী নয়, তারা প্রকাশ্যেই বহুবার ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’-এ পরিণত করার কথা বলে থাকে। কিন্তু যে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দল তৃণমূল কেন এতে শামিল? আপন বিশ্বাসে কালীঘাটে নিজের বাড়িতে বসে মুখ্যমন্ত্রী যে কোনও ধর্মের দেবদেবীর উপাসনা করতেই পারেন। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে মন্দির নির্মাণের অনুষ্ঠানে ‘হর হর মহাদেব’ স্লোগান দেওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে থাকার কোনও নৈতিক অধিকার কি তাঁর অবশিষ্ট থাকে? 
মুখ্যমন্ত্রী মহাকাল মন্দির তৈরির জন্য শিলিগুড়িতে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে জমি তুলে দিয়েছেন একটি ট্রাস্টকে, যার চেয়ারম্যান পদে বসিয়েছেন রাজ্যের মুখ্য সচিবকেই। মন্দির নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছেন সরকারি সংস্থা হিডকো’কেই। অর্থাৎ সরকারের জমিতে সরকারি খরচে একটি ধর্মের উপাসনা স্থল তৈরি হবে। এই জমিটি ছিল শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাতে, বামফ্রন্ট সরকার এই জমিতে তথ্য প্রযুক্তি পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছিল, যা বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হতো। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য সরকারি ব্যয়ের বদলে এখন মন্দির নির্মাণে নেমেছেন ধর্মের নামে ভোট পাওয়ার চেষ্টায়। যারা মনে করছেন এর ফলে বিজেপি’র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পালের হাওয়া তৃণমূল কেড়ে নিতে সফল হবে এবং বিজেপি নির্বাচনে ব্যর্থ হবে তারা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। কারণ, রাজনীতির পরিসরে এই ধর্মীয় ভাবনাকে টেনে আনাই হিন্দু, মুসলিম সব মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির উদ্দেশ্য ও আকাঙ্ক্ষা। মমতা ব্যানার্জি কেবল তাদের আকাঙ্ক্ষাই পূরণ করছেন। বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের সরকারে ক্ষমতাসীন হওয়ার আগেই মমতা ব্যানার্জিকে দিয়ে সেই রাজনৈতিক পরিমণ্ডল তৈরি করিয়ে নিচ্ছে, যাতে ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা কোণঠাসা হয়। বাংলার বুকে বামপন্থী রাজনীতি শক্তিশালী থাকাকালীন এই অবস্থা কল্পনাও করা যেত না। আজকের দিনেও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে বাংলায় রক্ষা করতে হলে বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান ছাড়া গতি নেই। মুখ্যমন্ত্রী মহাকাল মন্দিরের শিলান্যাস করেননি, বাংলার বুকে মহা বিপদের কাল ডেকে আনার আয়োজন করেছেন।

Comments :0

Login to leave a comment