CPIM

খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাব পেশ করে কারাত, উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে পরাস্ত করেই এগতে হবে বামপন্থীদের

জাতীয়

প্রসূন ভট্টাচার্য: মাদুরাই

হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক-কর্পোরেট শক্তির আগ্রাসী কর্তৃত্ববাদী আক্রমণকে প্রতিহত করেই এগিয়ে যেতে হবে বামপন্থী শক্তিকে। হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি এগিয়ে যাবে, আর বামপন্থীদেরও অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে, এই দুটো ঘটনা কখনও একসাথে ঘটতে পারে না। এই আক্রমণকে পরাস্ত করেই বামপন্থীদের এগতে হবে। তারজন্য পার্টির স্বাধীন শক্তির বৃদ্ধি ঘটিয়ে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির যত দূর সম্ভব ব্যাপকতম সমাবেশ ঘটানোর উদ্যোগ নিতে হবে সিপিআই(এম)-কে। বুধবার সিপি‌আই(এম)’র ২৪তম কংগ্রেসের প্রতিনিধি অধিবেশনে খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাব পেশ করতে গিয়ে একথা বলেন পার্টির পলিট ব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির কো-অর্ডিনেটর প্রকাশ কারাত। একইসঙ্গে তিনি কান্নুর পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইনের খসড়া পর্যালোচনা রিপোর্টও এদিন প্রতিনিধি অধিবেশনে পেশ করেন। উল্লেখ্য, এবারই প্রথম রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইনের খসড়া পর্যালোচনা রিপোর্ট কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টি কংগ্রেসের আগে পৃথকভাবে গ্রহণ করে আলোচনার জন্য প্রকাশ করেছে। প্রকাশ কারাত এদিন বলেন, বিজেপি-আরএসএস’র নয়া-ফ্যাসিবাদী বহুমুখী আক্রমণের বিরুদ্ধে শুধু মতাদর্শগতভাবেই মোকাবিলা নয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক-সমস্ত স্তরে মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা অর্জন করার কাজে আমাদের অগ্রসর হতে হবে।  
মাদুরাইয়ের তামুক্কম কনভেনশন সেন্টারে সীতারাম ইয়েচুরি নগর এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও কোডিয়েরি বালকৃষ্ণান মঞ্চে এদিনই ২৪তম পার্টি কংগ্রেস শুরু হয়েছে। প্রকাশ কারাত এদিন বলেন, কান্নুর পার্টি কংগ্রেসে আমরা যে লাইন গ্রহণ করেছিলাম, তা হলো বিজেপি-আরএসএস’র বিরুদ্ধে সমস্ত বাম, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে সমবেত করে এদের পরাস্ত করো এবং পার্টির স্বাধীন শক্তির বিকাশ ঘটাও। তিনি গত লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি-আরএসএস’র বিরুদ্ধে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চ গঠনে পার্টির উদ্যোগী ভূমিকার উল্লেখ করে বলেন, কিন্তু সিপিআই(এম)’র স্বাধীন শক্তি বৃদ্ধি ঘটানোর কাজে আমরা সফল হতে পারিনি। কেন আমরা সফল হতে পারলাম না পার্টি কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। তিনি এই প্রশ্নে কেন্দ্রীয় কমিটির মতামত উল্লেখ করে বলেন, কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক শক্তির নয়া-উদারবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রেণি আন্দোলন ও গণআন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। শুধু সর্বভারতীয় স্তরেই নয়, স্থানীয় স্তরেও ধারাবাহিকভাবে এই আন্দোলন গড়ে তোলায় দুর্বলতা থাকছে। তিনি বলেন, এমন নয় যে আমরা আন্দোলন করছি না। কিন্তু আন্দোলনগুলির স্লোগান অনেক সময় সঠিক নির্বাচন হচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি পালনের মতো হয়ে যাচ্ছে। এই আন্দোলনগুলিতে শামিল মানুষকে আমরা রাজনীতিগতভাবে সচেতন করে তুলতে পারছি না।  যারফলে তারা আবার সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। প্রকাশ কারাত বলেন, সংসদীয়বাদের কারণে কোথাও কোথাও এই ধরনের আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে মানসিক বাধা থাকছে। আবার অনেকগুলি রাজ্যে আঞ্চলিক বুর্জোয়া দলগুলির সরকার আছে, যারা বিজেপি সরকারের নয়া উদারবাদী নীতিকেই অনুসরণ করছে। তাদের দিক থেকেও বাধা আসছে। তিনি বলেন,  আমাদের নতুন করে পরিকল্পনা করে নতুন নতুন কৌশল রপ্ত করে এই ধরনের আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে। এই কাজের পরিকল্পনা জরুরি ভিত্তিতে করে এখনই আমাদের নামতে হবে।  
প্রকাশ কারাত এদিন বলেন, কেন আমরা হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে কর্পোরেট আঁতাতের কথা বলছি, এসম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি এখনও গড়ে তোলা যায়নি। নরেন্দ্র মোদী যখন নাগপুরে গিয়ে মোহন ভাগবতের সঙ্গে দেখা করেন, সেটা একজন ঘরের ছেলে বাড়ির কর্তাদের সঙ্গে দেখা করার মতোই অস্বাভাবিক কিছু নয়। মোদী সঙ্ঘের একজন প্রচারক ছিলেন। কিন্তু রতন টাটা, মুকেশ আম্বানিরা যখন নাগপুরে গিয়ে আরএসএস’র সরসঙ্ঘচালকের সঙ্গে দেখা করেন, তখনই সেটা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। 
তিনি বিজেপি’র শাসনে সমাজে ধর্মীয় প্রবণতা বৃদ্ধির উল্লেখ করে বলেন, শুধু হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির বৃদ্ধি ঘটছে না, একইসঙ্গে অন্যান্য ধর্মগুলির মধ্যেও সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা উদ্বেগের বিষয়। এখনই যদি জীবন-জীবিকার ইস্যু এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে ব্যাপক আন্দোলনে মানুষকে শামিল করতে না পারি, তবে সমাজের বিরাট অংশের মানুষ এই প্রবণতার শিকার হয়ে যাবেন। ইতোমধ্যেই একটা বড় অংশের মানুষকে সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন করে তুলেছে এই শক্তিগুলি। তিনি অস্পৃশ্যতা সহ বিভিন্ন সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে পার্টির সরাসরি হস্তক্ষেপ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
প্রকাশ কারাত এদিন বলেন, আঞ্চলিক দলগুলি সম্পর্কে আমাদের মূল্যায়ন খুবই স্প্ষ্ট। তিন ধরনের আঞ্চলিক দল আছে। কিছু দল আছে যারা ধারাবাহিকভাবে বিজেপি-বিরোধী অবস্থান নিয়ে চলছে। যেমন, আরজেডি, এসপি, ডিএমকে। আরেক ধরনের দল আছে যারা এনডিএ’তে যুক্ত। তৃতীয় ধরনের দলগুলি হলো, যারা দোদুল্যমান, কখনও বিজেপি-বিরোধী, কখনও বিজেপি’র পক্ষে। তৃণমূল এক বিচিত্র ধরনের রাজনৈতিক দল। এই দল অগণতান্ত্রিক, কর্তৃত্ববাদী, কমিউনিস্ট-বিরোধী এবং রাজনীতিতে দুষ্কৃতীকরণ ঘটিয়েছে। সেই সঙ্গে ওরা বিজেপি’র বিরোধিতাও করছে, আবার বিজেপি সরকারের নীতির সঙ্গে আপস করেও চলছে।   
প্রকাশ কারাত এদিন খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবের ওপর আসা প্রাক-কংগ্রেস সংশোধনীগুলি সম্পর্কে স্টিয়ারিং কমিটির অভিমত অধিবেশনে পেশ করেন। খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাব ও গত পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইনের খসড়া পর্যালোচনা রিপোর্টের ওপর বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই প্রতিনিধিরা আলোচনা শুরু করবেন।

Comments :0

Login to leave a comment