ইজরায়েলের সুরক্ষার জন্য ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে মহা ফাঁপরে পড়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না। এদিকে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে মার্কিন অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। তার শিকার হচ্ছেন মার্কিন নাগরিকরা। জিনিসের দাম বাড়ছে, সরকারের ঘাটতি বাড়ছে, কিন্তু কাজের সুযোগ বাড়ছে না। অন্যদিকে ইরানে সামরিক হামলার জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী (প্রধানত তেলবাহী) জাহাজ চলাচল কার্যত গত পাঁচ মাস ধরে বন্ধ। যে প্রণালী দিয়ে বিশ্বের তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের জোগান কমে দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক। একই সঙ্গে বেড়েছে পরিবহণ ব্যয়ও। ফলে ভারতের মতো তেল আমদানি নির্ভর দেশগুলির অর্থনীতিতে সঙ্কট ঘনীভূত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধির হার কমেছে। দেশে দেশে শেয়ার বাজারে ধারাবাহিক পতন ঘটেছে। এই অবস্থায় ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েরেল যুদ্ধে বিশ্বজুড়েই অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। বস্তুত কোনও দেশই চাইছে না এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হোক। এমনকি আমেরিকার ঘনিষ্ট মিত্র দেশগুলিও এই যুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গী হয়নি এবং সমর্থনও করেনি। ফলে ইরান যুদ্ধের দায় আমেরিকাকে একাই বইতে হচ্ছে। এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নাগরিকও এই যুদ্ধে ট্রাম্পের পাশে নেই। তারা যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার মাত্রাও সম্প্রতি দ্রুত পতন ঘটেছে।
এমন এক পরিস্থিতিতে আগামী নভেম্বর মাসে আমেরিকায় মধ্যবর্তী (মার্কিন কংগ্রেস তথা সংসদ) নির্বাচন। এমনিতে ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের জেরে আমদানি মূল্য বেড়ে যাওয়ায় মানুষকে অনেক বেশি দাম দিয়ে জিনিস কিনতে হচ্ছে। তার উপর ইরান যুদ্ধে অর্থনীতিতে জোর ধাক্কা এসেছে। আবার যুদ্ধের ব্যয় চাপছে নাগরিকদেরই উপর। মার্কিন নাগরিকরা মনে করছে এই যুদ্ধে আমেরিকার কোনও লাভ নেই, সবটাই ক্ষতি। ইজরায়েলকে বাঁচাতে গিয়ে ট্রাম্প আমেরিকার ক্ষতি করছে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তাই খুব চিন্তিত। যদি কংগ্রেসে ট্রাম্পের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকে তাহলে আগামী দু’বছর নিজের খেয়াল খুশিমতো সরকার চালানো ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব হবে না।
বিশ্বে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব, জাতীয়তাবাদী অহঙ্কার মার্কিন রাজনীতির অন্যতম উপাদান। ভোগের আগে যুদ্ধোন্মাদনা, যুদ্ধজিগির, এমনকি যুদ্ধ লাগিয়ে আমেরিকার নেতারা ভোটে বাজিমাত করার চেষ্টা করেন। ট্রাম্পও ভাবছেন ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ জাগিয়ে যুদ্ধ জয় দেখিয়ে ভোটে বাড়তি সুবিধা পেতে। তাই ইরানের সঙ্গে প্রাথমিক যুদ্ধ বিরতি চুক্তি করেও সেটা উপেক্ষা করে নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন। কিন্তু তিনি যতই হুঙ্কার দিন বা ইরানকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার হুমকি দিন ইরানের পালটা আক্রমণ অনেক ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয় পর্বে যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে লক্ষ্য হচ্ছে অসামরিক ক্ষেত্র। বোঝাই যাচ্ছে ট্রাম্প বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। তেমনি আমেরিকার সামরিক সঙ্গী পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির ওপর ইরানের হামলায় যেভাবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাতে আমেরিকার প্রতি তাদের নির্ভরতা ও বিশ্বাস ধাক্কা খেয়েছে। এইসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিও ইরানের হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাম্প বাধ্য হয়ছেন তাদের ঘাটির মূল কর্মকাণ্ড জর্ডন ও ইজরায়েলে সরিয়ে নিতে। কিন্তু দু’দিন আগে জর্ডনে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ভয়ঙ্কর হামলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুই মার্কিন সেনার মৃত্যুও হয়েছে। এই অবস্থায় ট্রাম্প আরও হিংস্র ও আগ্রাসী হতে পারেন। কিন্তু সমস্যা বাড়বে বই কমবে না। ট্রাম্প নিজের পায়েই নিজে কুড়াল মারছেন।
editorial
মহা সঙ্কটে ট্রাম্প.
×
Comments :0