Editorial

যাদবপুর ছাত্রদের জন্য গুন্ডাদের জন্য নয়

সম্পাদকীয় বিভাগ

আর তর সইছে না। মুখোশ খুলে নিজেদের হিংস্র, পৈশাচিক ফ্যাসিস্ত চেহারাটা প্রদর্শন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদী আরএসএস-বিজেপি। শিক্ষা, চেতনা, জ্ঞানচর্চার ঘোরতর বিরোধী এই শক্তি এতদিন নিজেদের খোলসের আড়ালে রাখার চেষ্টা করেছিল। ক্ষমতায় আসার পর গুন্ডা, দুষ্কৃতী, লুম্পেন, মাফিয়াদের সঙ্গে নিয়ে সবকিছুর উপর আধিপত্য কায়েম করতে বেপরোয়া অভিযানে নেমেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অন্যতম প্রধান টার্গেট। দিল্লিতে যেমন জেএনইউ, এ রাজ্যে তেমন যাদবপুর। কেননা যাদবপুর শিক্ষার অনন্তচর্চার খোলা প্রান্তর। বিজ্ঞান-যুক্তি ও মননের অফুরন্ত ভাণ্ডার। এখানে ছাত্ররা অনর্গল প্রশ্ন করতে পারে। প্রতিবাদ-বিরোধিতা করতে পারে। যুক্তি বিরুদ্ধে পালটা যুক্তি হাজির করতে পারে। ধর্মান্ধতার আফিম খেয়ে বুঁদ হয়ে গো-চনার মাহাত্ম্য কীর্তন করা যায় না। সত্যিকারে বিশ্ব বিদ্যা চর্চারই উৎকৃষ্ট স্থল এই বিশ্ববিদ্যালয়। গণেশের মাথার প্লাস্টিক সার্জারির মতো জ্ঞান যে এনটায়ার পলিটিকাল সায়েন্সের বিষয় থেকে মেলে সেটা এখানে প্রবেশাধিকার পায় না। তাই মেধাকে ভয় পাওয়া গোমূত্রজীবীরা যাদবপুরকে সহ্য করতে পারে না। উচ্চ মেধা ও উচ্চ জ্ঞানচর্চার উচ্চাসন থেকে যদি যাদবপুরকে টেনে নামানো যায় তাহলে সেখানে খাটাল বা গোশালা বানানো সম্ভব হবে। আর তেমনটা হলেই হিন্দুত্ববাদের পিটুলি খাওয়া অন্ধভক্ত এবিভিপি’র গুন্ডারা যাদবপুরের উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারবে। ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’।
কিন্তু তেমনটা তো হবার উপায় নেই। কারণ যাদবপুরের পড়ুয়া, গবেষক, শিক্ষকরা সেই শিক্ষায় শিক্ষিত যা গণতন্ত্রের পতাকাকে উড়িয়ে রাখে। তারা দখলদারি, আধিপত্য সহ্য করে না। স্বৈরাচার, একাধিপত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাই প্রাক্তন তৃণমূলী শুভেন্দুকে সামনে রেখে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের ফ্যাসিবাদীরা ক্ষমতায় এলেও যাদবপুর দখল করা কঠিন। গণতান্ত্রিক পথে যাদবপুরে ঢোকা যাবে না। যুক্তির পথেও না। অতএব পেশিশক্তিই একমাত্র ভরসা। সেজন্য গেরুয়া ঝান্ডার নিচে ঘৃণিত, ধিক্কৃত দুষ্কৃতী, মস্তান, মাফিয়াদের জড়ো করে মারদাঙ্গা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, খুন-সন্ত্রাসের পথকেই ওরা বেছে নিয়েছে। পরিকল্পনা উপরতলা থেকে। রূপায়ণের দায়িত্ব এলাকার নেতা-নেত্রী, জনপ্রতিনিধিদের। কর্তৃপক্ষকে যেমন উপর থেকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে তেমনি পুলিশকে পাশে রাখা হয়েছে গুন্ডাদের সহায়তায়।
কিন্তু লাভ হবে না। সাধারণ মানুষ যাদবপুরকে দেশের অন্যতম সেরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখতে চায়। শিক্ষাবিরোধী কুলাঙ্গারদের গোয়াল হিসাবে নয়। মমতার নেতৃত্বে তৃণমূল অনেক চেষ্টা করেছে। এখন শুভেন্দুও চেষ্টা করছে। রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার অনেকদিন ধরেই যাদবপুরের বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে শুকিয়ে মারার জন্য। এখনও ন্যায্য পাওনার অর্ধেকও মেলে না। তথাপি দেশের ১০ সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যাদবপুর। দেশের রাজ্য সরকারগুলির অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যাদবপুর প্রথম স্থানে। ডাবল ইঞ্জিনের সার্বিক বিরোধিতার মধ্যে যাদবপুর তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ছাত্ররা প্রতি বছর বিপুল টাকা সাহায্য হিসাবে পাঠায় যাদবপুরে। নবীন-প্রবীণ এবং বর্তমান-প্রাক্তন ছাত্ররা যাদবপুরের মুক্ত চিন্তার ক্যাম্পাসকে বাঁচিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর।

Comments :0

Login to leave a comment