Post Editorial

ডিজিটাল লেনদেনের উপর নতুন আক্রমণ

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

ঈশিতা মুখার্জি

কিছুদিন আগেই কেন্দ্রের সরকার লোকসভা এবং পরবর্তীকালে রাজ্যসভায় কর বাবদ একটি সংশোধনী বিল পাশ করিয়ে নিল বিরোধীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও। এই বিলেই সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ছিল যা ইউপিআই ডিজিটাল লেনদেনের উপর কর আরোপ করেছিল। ‘করেছিল’ কথাটা বলছি এই কারণে কারণ পরবর্তীকালে সিপিআই (এম) সহ অন্যান্যদের আপত্তিতে ইউপিআই লেনদেনের উপর করের বিষয়টি সরকার লঘু করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই— কেন সরকার ইউপিআই লেনদেনের উপর কর বসানোর কথা ভাবল? ইউপিআই লেনদেন আসলে কি? কবে তার শুরু এবং কেন?
দেশের মানুষের কাছে এই লেনদেনের অর্থ খুব সহজে মোবাইল ফোনের সাহায্যে একজনের থেকে টাকা অন্যজনের কাছে চলে যায়। এই সহজভাবে টাকার লেনদেনের জন্য ছোট ব্যবসাদার, পাড়ার মুদির দোকান, ওষুধের দোকান সবাই একটি কিউ আর কোড সামনে সাজিয়ে রাখে। ক্রেতার কাছে সহজেই তা স্ক্যান করে যৎসামান্য জিনিষও কিনে নেওয়া সম্ভব হয়। নিজেদের মধ্যেও লেনদেন করা সহজেই সম্ভব। ইউপিআই’র অর্থ ইউনাইটেড পেমেন্টস ইন্টারফেস। ২০১৬ সালে এই পদ্ধতি দেশে চালু হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যানে ২০২৬ সালের জুন মাসে ইউপিআই ব্যবহার করে দেশে ৫৫.৪৯ কোটি মানুষ। ২০২৫-২৬ সালে ইউপিআই’র মধ্য দিয়ে ২৪,১৬২ কোটি লেনদেন হয়েছে,শুধুমাত্র জুলাই মাসেই লেনদেন হয়েছে ২৩৬০ কোটি যার অর্থমূল্য ২৯.৮৭ লক্ষ কোটি টাকা। ভারতের ইউপিআই লেনদেন শুরু হওয়ার পর মোবাইলের মাধ্যমে টাকা আদান-প্রদান বহু পরিমাণে বেড়ে গিয়েছে এবং নগদ আদান প্রদান কমে এসেছে। ২০১৬ থেকে ভারতে যেক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি অনেক মানুষ ব্যবহার করেছে তা হলো এই প্রযুক্তি। টাকা লেনদেনের অন্য যে প্রযুক্তি রয়েছে তা হলো নেফট, আরটিজিএস, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড। এই পরিষেবার জন্য গ্রাহককে কিছু টাকা ব্যয় করতে হয়। এমন কি এটিএম থেকে টাকা তোলার উপরও উর্ধ্বসীমা রয়েছে। একমাত্র ইউপিআই পরিষেবাতেই গ্রাহককে কোনও কর দিতে হয় না। এবার সরকার এই লেনদেনকেও করের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বিদেশে এই কথা বলে দেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন যে দেশ ডিজিটাল প্রযুক্তিতে এগিয়ে আছে। এই কথা বলার একমাত্র কারণ ইউপিআই লেনদেনের সাফল্য। সাফল্য এই কারণে যে দেশের বহু মানুষ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। এই প্রযুক্তির খরচ কে বহন করেছে? কত খরচ হয় এই প্রযুক্তির জন্য? সরকার জানিয়েছে যে সরকার জানিয়েছে ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৮৭৩০ কোটি টাকা। কিন্তু ইউপিআই’র ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পেমেন্ট কোম্পানিগুলি সরকারকে চাপ দিতে থাকে যে এই পরিষেবা থেকে তারা লেনদেনের পরিকাঠামো গড়ে তুলে অর্থ উপার্জন বা মুনাফা করবে।
ভারত- মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের বিক্ষোভের মুখে পড়েছে রাজধানী। এই চুক্তির কারণেই কি ইউপিআই’র উপর সরকার কর বসানোর চেষ্টা করছে? মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প এই চুক্তির আগেই ইউপিআই’র এই জনপ্রিয়তা দেখে মার্কিন পেমেন্ট পদ্ধতি ভিসা বা মাস্টারকার্ডের মুনাফা নিয়ে প্রমাদ গুনেছেন। আগেই ভারতকে জানিয়েছে গ্রাহকদের বিনা পয়সায় এইভাবে মোবাইলের মাধ্যমে লেনদেনের ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলির ক্ষতি হচ্ছে। আসলে মার্কিন দেশের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্লজ্জভাবে অন্য দেশের উপর আগ্রাসী নীতি চাপিয়ে দেয়। অন্য দেশ মেনে না নিলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের সব আজ্ঞাই মাথা নিচু করে মেনে নেয়। তাই ট্রাম্পের বিনা পয়সায় ইউপিআই না পসন্দ— সেই জায়গায় মার্কিন পেমেন্ট গেটওয়ে বা পথ এসে এই বাজারের মুনাফা নিয়ে নেবে— মার্কিন দেশের মন্দার বাজার এবং পুঁজিবাদের সঙ্কট কিছুটা সামাল দেবে ট্রাম্প এইভাবে। মার্কিনি এই চাপের কাছে কার্যত নতিস্বীকার করে অর্থ মন্ত্রী নির্মলা সীতারমন এবার ইউপিআই লেনদেনের উপর কর ধার্য করে। পরের দিন সিপিআই (এম) সহ অন্যান্য বিরোধী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানায় গ্রাহকদের উপর এই কর বসানো যাবে না। বিনা পয়সায় ইউপিআই লেনদেনের কোনও পরিবর্তন করা যাবে না। অর্থ মন্ত্রী পরের দিন জানান যে সাধারণ মানুষ, ছোট ব্যবসাদার—এদের উপর কোনও কর বসবে না। শুধুমাত্র এক নির্দিষ্ট লেনদেনের অতিরিক্ত লেনদেনের উপর ব্যবসায়ীদের উপর কর বসবে। অর্থ মন্ত্রী এও বলেন যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে। 
উল্লেখযোগ্য যে এই আলোচনায় সংসদে সিপিআই (এম) সাংসদ জন ব্রিটাসের সঙ্গে তুমুল বাক্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন অর্থ মন্ত্রী সীতারমন। ব্রিটাস যখন এই নীতি মার্কিন চাপের কাছে নতিস্বীকার বলে বর্ণনা করেন, অর্থ মন্ত্রী ধৈর্য হারান। দেশের অন্যান্য নীতির মতই এক্ষেত্রেও মার্কিন চাপ স্পষ্ট। ২০০০ টাকার বেশি লেনদেনের উপর এই কর ব্যবসায়ীদের উপর বসানো হবে এমন কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই এই কর ছোট ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ক্রেতাদের উপর চাপিয়ে এই পরিমাণ ধার্য অর্থ আদায় করে নেবে— এ কথা সবাই বুঝতে পারে। যে কর ছিল না সেই কর বসানো হলে সেই অর্থ ব্যবসায়ী তার ব্যবসার খরচ এক জায়গায় রাখার জন্য অবশ্যই অন্যত্র থেকে সেই অর্থ তুলে নেবে- এটাই ব্যবসার নিয়ম। তাই সাধারণ মানুষের উপর এই বোঝা চলে আসবেই। আক্রান্ত হবেন ছোট ব্যবসায়ীরাও। 
কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণ করল যে সরকারের যা কিছু নীতি তার সঙ্গে দেশের অর্থনীতির উন্নতির কোনও সম্পর্ক নেই। ক্রমাগতই এমন নীতি সরকার নিয়ে চলেছে যা মার্কিন কোম্পানি, এ দেশের কোম্পানিগুলির মুনাফা বৃদ্ধি করবে। কিন্তু এর ফলে দেশের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি কি একচুলও বাড়বে? এই মুনাফা বৃদ্ধি কি আদৌ কর্মসংস্থানে কাজে লাগবে? এই মুনাফা বৃদ্ধি কি আদৌ আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াবে? এমন কোনও চিহ্ন নেই আমাদের দেশে। অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানিকে সুবিধাদান করলে সেই কোম্পানি ভারতে বিনিয়োগ করে না, সেই অর্থ সরাসরি মার্কিন দেশে পাড়ি দেয়। বড় ব্যবসায়ীদের উপর বসানো কর যে সাধারণ মানুষের উপর চাপলে মানুষ হয় আবার নগদে লেনদেন করবে অথবা ছোট ছোট লেনদেন মূল্যবৃদ্ধির ফলে মাঝারি থেকে বড় লেনদেনে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। 
সামান্য কিউ আর কোড আর কি সামান্য থাকবে? এই চিন্তা তো ওঠাই স্বাভাবিক। এই ইউপিআই লেনদেনের যে ডিজিটাল পরিকাঠমোর খরচ তা ব্যাঙ্ক, কিছু কোম্পানি এবং সরকার মিলে বহন করে। সরকার যে পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর উপর ব্যয় করে, এই ব্যয় তার মধ্যে পড়ে। সরকার সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর উপর ব্যয় এমনিতেই কমিয়ে আনছে একটির পর একটি বাজেটে। দেশের মানুষকে ডিজিটাল পরিষেবা দিচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী যে কথা ফলাও করে বলতেন, সেই পরিষেবা থেকেও সরকার ধীরে ধীরে হাত গুটিয়ে নিতে চাইছে। এটি তাদের নীতির মধ্যে পড়ে। মার্কিন রাষ্ট্রপতির কথা মেনে চলাও তাদের নীতির মধ্যে পড়ে। শুধু ইউপিআই লেনদেন নয়, দেশের সাধারণ মানুষের নিত্য ব্যবহারের প্রতিটি খরচের উপর কর্পোরেটের লোভের রাজত্বে বাস করছে আজ ভারতবাসী। যেখানে যেটুকু সুযোগ আছে দেশের বিজেপি সরকার মার্কিন কোম্পানি এবং দেশের বড় কর্পোরেটদের পকেট ভরাতে উদ্যত। 
দেশের নির্বাচিত সরকারের যখন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোনও দায় থাকে না, দেশের নির্বাচিত সরকার যখন আর্থিক লুটকেই মদত দেয়, তখন এই কাজ কি দেশদ্রোহিতার চেয়ে আলাদা কিছু? দেশের সাধারণ মানুষের সামান্যতম সুবিধা যদি সরকার কেড়ে নিতে চায় তার প্রতিটি নীতির মধ্যে, সেই সরকার কি দেশের অর্থনীতির উন্নতিসাধনে কোনও কাজে আসে? যে ইউপিআই লেনদেন বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপ্তি অর্জন করল, সেই সময়েই এখান থেকে মুনাফার সন্ধানে ঝাঁপিয়ে পড়ল কর্পোরেট রাজ। আগে লেনদেনের বাজার এবং মানুষের অভ্যাস দশ বছরে তৈরি করে লুটের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে রাষ্ট্র।
দেশে সঙ্কট রয়েছে অন্যত্রও। দেশের অর্থনীতিতে ভাটা। তাই আর্থিক লেনদেনের বাজারেও ভাটা ধরা পড়ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে দেখা যাচ্ছে যে ইউপিআই লেনদেনের বৃদ্ধির হার গত বছরের তুলনায় ১৮.৭% কমে গেছে। নগদ লেনদেন সামান্য বেড়েছে, কিন্তু আর্থিক লেনদেনের পরিমাণও কমছে। এই সমস্যা নিয়ে দেশের সরকারের বিশেষ মাথাব্যথা নেই, সরকার যেটুকু লুট সম্ভব তাতেই মনোযোগ দিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন কোম্পানিকে লুট করতে দেওয়ার জন্য দেশের সরকার যে নীতি গ্রহণ করা সম্ভব, তাই করে চলেছে। এভাবে দেশের অর্থ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার মূলে রয়েছে দেশের সরকারের আর্থিক নীতি। সাম্প্রতিক ইউপিআই লেনদেনের উপর করের বোঝা নিয়ে আলোচনা, সংসদে প্রস্তাব, বিরোধীদের বক্তব্য, এবং সরকারের নীতি পিছনে গুটিয়ে নেওয়া, আবার অন্য দরজা দিয়ে সে নীতি চালু করা— এই সব চিত্রনাট্য সেই লুটের কথাই বলছে। 
ইউপিআই লেনদেনের উপর কর একটা ক্ষেত্র মাত্র। বিজেপি সরকার সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য কোনও ক্ষেত্রই বাদ দেয়নি। শিক্ষায় লুটের বিরুদ্ধে আমরা নতুন প্রজন্মের বিক্ষোভ দেখেছি এবং দেখছি। ডিজিটাল লেনদেনের উপর আঘাত আসলে দেশ এই বিক্ষোভ আবার দেখবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির গুণ একটাই- পিছন ফেরা যায় না। পুরানো প্রযুক্তি ধীরে ধীরে মানুষ ভুলে যায়। তাই ডিজিটাল ক্ষেত্রে লুটও নতুন প্রজন্ম মেনে নেবে না। 
 

Comments :0

Login to leave a comment