জয়ন্ত সাহা ও শম্ভুচরণ নাথ-আলিপুরদুয়ার
মাত্র ২ টো চা বাগান পড়েছে আলিপুরদুয়ার বিধানসভা এলাকায়। তার একটা হল পাটকাপাড়া আর অন্যটি হল মথুরা চা বাগান। মথুরা বাগানে স্থায়ী শ্রমিক ১ হাজার ৮০০ আর অস্থায়ী শ্রমিক প্রায় ৬০০।
গত পঞ্চায়েত ভোটে এই বিধানসভা এলাকায় লালঝান্ডার প্রার্থীই ছিল না। গত লোকসভাতেও ভোট মিলেছে সামান্য। সেই মথুরা চা বাগানেই এখন লালঝান্ডার দাপট বাড়ছে। আর এর পেছনে রয়েছেন ইন্দ্র খালকো, দূর্গা বাস্কে, পাশকেল ওরাওঁ, লিবরে মুন্ডার মত অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকেরাই! ওদের দেখে অল্প বয়সের শ্রমিকেরা আসছে লালঝান্ডার নিচে। বাড়ছে সদস্যপদ।
ইন্দ্র খালকো বছর চারেক আগে অবসর নিয়েছেন। তারপরেও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় ছিলেন। বছর খানেক আগে বিছানা ছেড়ে হাঁটা চলা শুরু করেছেন। বড় বাগান হলে কি হবে? অন্য সবার মত তিনিও পিএফ, গ্র্যাচুইটি পান নি যৌবনে লালঝান্ডা ধরা ইন্দ্র খালকো।
মঙ্গলবার তিনিই জানালেন, বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতেই ভেবেছিলাম যদি উঠে দাঁড়াতে পারি তবে ফের লালঝান্ডা কাঁধে নিয়ে পিএফ আর গ্র্যাচুইটি আদায় করবো। মার্চ মাসের শ্রমিক ধর্মঘটের আগে আমাদের শ্রমিক নেতা বিদ্যুৎ গুণ’র সাথে যোগাযোগ করে আমার বাড়িতেই প্রথম মিটিংটা ডেকেছিলাম। উনি আমাদের একটা লালঝান্ডা দিয়ে গিয়েছিলেন। সেটা নিয়েই আমাদের ঘরের ছেলে বৌ যারা এখন বাগানে কাজ করে তাদের নিয়ে বাগানের গেটে পিকেটিং করেছি। আর ধর্মঘট করেছি। বাগানে ফের লালঝান্ডার ইউনিয়ন হয়েছে। সিপিআই(এম) প্রার্থী শ্যামল রায়কে নিয়ে বাগানে আসার নিমন্ত্রণ করেছি বিদ্যুৎ দা-কে। তারপরেই বললেন,‘‘মথুরা বাগানকের মজদুর আপন অধিকার হাসিল করেকলে ইস চুনাও মে লাল ঝানডা কে জিতায়কে লে একজুট হোওথে।’’
আসলে চা-বাগান থেকে কৃষি বলয় আর শহর এলাকায় লালঝান্ডার দাপট বাড়ছে আলিপুরদুয়ার বিধানসভা কেন্দ্রে। তোলাবাজি আর সিন্ডিকেটরাজের হাত থেকে মুক্তি পেতে এই বিধানসভা কেন্দ্রে এখন লালঝান্ডাই এখন ‘‘প্রথম চয়েজ’’! এটাই এখন আলোচ্য বিষয় গ্রাম-শহরে!
তৃণমূল প্রার্থীর সমর্থনে আলিপুরদুয়ার পৌর এলাকার ৮ নং ওয়ার্ডের সূর্যনগরে বাড়ি বাড়ি প্রচার সেরে তৃণমূল কর্মীদের একটা ৭-৮ জনের দল বেড়িয়ে যেতেই এলাকার গৃহবধূ শিউলি পাল গেট আটকে ভেতরে যেতে যেতে আপনমনে রাগে গজগজ করতে করতে প্রতিবেশী আরেক মহিলাকে বললেন,‘‘ভোট আসলেই এরা এসে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেয়, অথচ বছরের পর বছর ধরে এক বালতি পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দিতে পারে না। সেই তো জল কিনেই খেতে হয়! এদের ভোট দিয়ে কি হবে?’’
আসলে পানীয় জলের ইস্যুই এবারে ডোবাতে চলেছে গতবারে বিজেপির টিকিটে জিতে উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে তৃণমূলে চলে যাওয়া বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলালকে। তৃণমূল এবারে তার ওপরেই বাজি রেখেছে।
আসলে পানীয় জল নিয়ে হাহাকার শহরের প্রায় ২১ হাজার বাড়ির বাসিন্দারা। ১৯৫৭ সালের এই পৌরসভায় বাড়ি বাড়ি পানীয় জলের ব্যবস্থা আজও নেই! বামফ্রন্ট আমলে চেয়ারম্যান থাকাকালীন অনিন্দ্য ভৌমিক যে পরিস্রুত পানীয় জলের প্রকল্প গড়ে উঠেছিল সেটাও তৃণমূলের আমলে পুরোপুরি বিকল স্রেফ রক্ষনাবেক্ষণের অভাবে।
নিউ আলিপুরদুয়ারের ১৮ নং ওয়ার্ডের কল্পনা দাসের বক্তব্য,‘‘জল তো কিনেই খাই। পড়শী বাড়িতেও একই অবস্থা। যাদের পয়সা আছে তারা বাড়িতে জল পরিশোধনের মেশিন বসিয়ে নিয়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে আসা কল্পনা দাসের ক্ষোভ ‘‘এরা ভোটে জিতে একটু পানীয় জলও দিতে পারে না। কি হবে এদের ভোট দিয়ে?
আলিপুরদুয়ার বিধানসভা কেন্দ্রে এতদিন আরএসপি লড়েছে। এবারেই আরএসপি এই আসন সিপিআই(এম)কে ছেড়েছে। আরএসপি সহ অন্য বামদলগুলি সিপিআই(এম) প্রার্থী শ্যামল রায়কে নিয়ে প্রচারে ঝাঁপিয়েছেন জোর কদমে। বাড়ি বাড়ি প্রচারে বেড়িয়ে পানীয় জলের হাহাকারের কথা শুনতে হচ্ছে তাকেও। প্রার্থী শ্যামল রায় বলেন,‘‘আসলে গোটা শহর তো নাকাল হচ্ছে এক গ্লাস পরিস্রুত জলের জন্য। তৃণমূল ২০১৮ সালে শহরে পানীয় জলের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। ৮ বছরে সে প্রকল্পের কাজ ২৫শতাংশও শেষ হয় নি।
আলিপুরদুয়ার বিধানসভা কেন্দ্রের অধীনে পৌরসভা ছাড়াও আছে ১৩ টি গ্রাম পঞ্চায়েত। শাসক তৃণমূল পুরোপুরি ব্যাকফুটে থাকার প্রথম কারণ যদি হয় পানীয় জলের হাহাকার তবে দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই পৌরসভায় দেদার দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসা আর সঙ্গে যোগ হয়েছে টিকিট না পেয়ে গোঁসা ঘরে বসে যাওয়া দলের প্রবীন নেতারা!
আলিপুরদুয়ারের চায়ের দোকান থেকে পাড়ার আড্ডার ঠেক আর প্রাতঃভ্রমনে বের হওয়া শহরের প্রবীন নাগরিকদের মুখে মুখে ঘুরছে পৌর সভার সরকারী অর্থ লুঠের কথা! শহরের প্রবীণ নাগরিক সত্যেন পাল অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী। খোঁজ খবর ভালোই রাখেন। প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন,‘‘আরে কি বলবো বলুন তো! শুনছি অডিট রিপোর্টে ধরা পড়েছে ২০২১-২২ অর্থবর্ষে বরাত পাইয়ে দিতে বড় ‘‘ঘাপলা’’ ধরা পড়েছে। কাজ পাইয়ে দিতে অনিয়ম হয়েছে। আর নিম্নমানের কাজের নমুনা তো শহর জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
প্রবীণ মানুষটির কথা মিথ্যে যে নয় সেটা পৌরসভার অন্দরে কান পাতলেই শোনা যায়। শুধু ২১-২২ এই নয়,২৩-২৪ এবং ২৪-২৫ আর্থিক বছরের অডিট রিপোর্টেও লাল কালির দাগ পড়েছে। পুরো বেসামাল তৃণমূলের পৌরবোর্ড। মুখে কুলুপ এঁটেছেন চেয়ারম্যান।
এরই মধ্যে আলিপুরদুয়ারের প্রবীণ তৃনমুলের নেতা দলের রাজ্য সম্পাদক তথা প্রাক্তন জেলা সভাপতি মৃদুল গোস্বামী টিকিট না পেয়ে অভিমানে গোঁসা ঘরে ঢুকেছেন! এবারে তিনি আরও অনেকের সাথে টিকিটের দাবিদার ছিলেন। তাঁর অনুগামীদের সাফ কথা,‘‘দাদা দলে অবহেলিত। তাকে এড়িয়ে সব কাজ হচ্ছে। এর ফল ভুগবে প্রার্থী!’
এদিকে ভোটের দিন এগিয়ে এলেও স্বস্তিতে নেই বিজেপিও! গত বিধানসভায় দল সুমন কাঞ্জিলালকে টিকিট দিয়ে জিতিয়েছিল। সে কিছুদিন পরেই উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে দিদির দলে ঠাঁই পেয়েছিল। এবারে দল পরিতোষ দাসকে টিকিট দিয়েছে। এরপরেই বিজেপির জেলা অফিসে ভাঙচুর হয়েছে তালাও ঝুলেছে। জেলা সভাপতি মনোজ টিগগা পরে সে তালা খুললেও বিক্ষুব্ধরা ঘরে বসে গেছেন।
সিপিআই(এম) জেলা সম্পাদক কিশোর দাস বলেন,আমরা তৃণমূল আর বিজেপির ক্ষোভ বিক্ষোভ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আলিপুরদুয়ার এক সময়ে বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। এবারে প্রার্থী ঘোষণার পরেই পুরোনো কর্মীরা ফের সক্রিয় ভাবে পাড়ায় পাড়ায় প্রচারে নেমেছে। সেটাই আমাদের "প্লাস পয়েন্ট"।
আমরা জোর দিয়েছি তোপসিখাতায় কালজানি নদীর ওপরের সেতু গড়ার কাজ করতে চাই, বেহাল জল নিকাশি ব্যবস্থার হাল ফেরানো আর বাড়ি বাড়ি পানীয় জল পৌঁছে দিতে চাই। পূর্নাঙ্গ জেলা হাসপাতাল গড়ার দাবিকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখে প্রচার চলছে " ভোটার টু ভোটার"।
সিপিআই(এম)প্রার্থী প্রচারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলছেন,আমরা চাই জেলায় মেডিকেল কলেজ হোক, জেলা হাসপাতাল, রেফার হাসপাতালের বদনাম মুক্ত হোক। বিধানসভা এলাকার পাটকাপাড়া সহ অন্য বাগানের চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ুক, ওদের আবাসন, চিকিৎসা আর শিক্ষার হাল ফিরুক। বন্ধ হোক কাটমানি আর তোলাবাজির রাজত্ব। তৃণমূল আর বিজেপির অপশাসন মুক্ত হয়ে ফের লালঝান্ডায় ভরসা রাখতে শুরু করেছেন আলিপুরদুয়ার বিধানসভা কেন্দ্র।
West Bengal Assembly Election
ফের লালঝান্ডায় ভরসা রাখতে শুরু করেছেন আলিপুরদুয়ারের মানুষ
×
Comments :0