অমর্ত্যালোক ব্যানার্জি
গ্লোবাল কনজিউমারিজম-এর যুগে ন্যানো টেকনোলজির এই বেপরোয়া আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে সত্যি কি আধুনিক ইকোনমিক ম্যান-এর মুক্ত স্বাধীনতা বা ফ্রী-উইল এবং অটোনমি বা স্বশাসনের কিছুমাত্র অবশিষ্ট আছে? ফুকো প্রশ্ন তুলেছিলেন, বেন্থামিয়ো প্যানঅপটিকানের আদলে প্রজাকুলকে নজরবন্দি করার নতুন তরিকা নিয়ে। আজকে রাষ্ট্রের কাছে বা গুগল সার্চ ইঞ্জিন-এর কাছে এবং এআই’র কাছে প্রজাকুলের সব তথ্য মজুত আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর বিশ্ব আজকে দাঁড়িয়ে আছে কার্যত খাদের কিনারায়। কিন্তু ২০২৫ সালে আমরা পেরিয়ে এলাম ক্লাসিক্যাল জার্মান দর্শনের কুলগুরু ইমানুয়েল কান্টের জন্মের ৩০০ বছর। এক্ষেত্রে শব্দ সংখ্যা সীমিত, তাই বিস্তারে যাবার অবকাশ বা প্রয়োজন কোনোটাই নেই। তবে কান্টের দর্শন খুব সহজে লেখাও যায় না।
মধ্যযুগ ছিল ঈশ্বরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারও আগে সফোক্লিসের অয়দিপাউস ছিলেন ঈশ্বরের হাতের ক্রীড়ানক। বিপ্রতীপে শেকসপিয়রের হ্যামলেট প্রায় একই ধরনের পরিণতির শিকার হলেও হ্যামলেট কিন্তু তাঁর নিজের ভাগ্য নিজে নিয়ন্ত্রণ করার স্বাধীনতা এবং অটোনমি পেয়েছিলেন। বলার বিষয়টা এই যে, পাশ্চাত্য আধুনিক ভাববাদী দর্শনের জনক দেকার্তে সংশয়বাদকে অবলম্বন করে ব্যক্তির একটি নিজস্ব স্থির নিটোল সেলফ বা সত্তা আবিষ্কার করেছিলেন (কজিটো)। দেকার্তে বুদ্ধিবাদী এবং সেকারণেই অভিজ্ঞতার সংবেদনকে সংশয় প্রকাশ করেন। অন্যদিকে অভিজ্ঞতাবাদী লক এবং হিউম যথাক্রমে ব্যক্তির সম্পত্তির অধিকার এবং জ্ঞানের উৎস প্রসঙ্গে বলেছেন-জাগতিক সংবেদন বা অনুভূতির মাধ্যমেই জ্ঞান হতে পারে। তবে দার্শনিক আচার্য দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বুদ্ধিবাদী ও অভিজ্ঞতাবাদীদের এই সমস্যাকে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের সঙ্কট হিসাবেই দেখেছিলেন এবং বলেছিলেন-এই সঙ্কট থেকে ভাববাদকে বাঁচানোর জন্যই উদিত হলেন কান্ট। কিন্তু মূলত বুদ্ধিবাদী কান্টের হাতে স্থান-কাল নামক দুটি ইনটিউশন এবং বারোটা ক্যাটাগরি ছাড়া জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি হওয়ার আর কোনও কাঁচামাল ছিল না। কিছুটা যেন হালকা চালে, গল্পের ছলে বলা যায়, কোনও একদিন কান্ট দুপুরবেলা বাড়িতে ঘুমোচ্ছিলেন, আর তার পূর্বসূরি ডেভিড হিউম এসে জানালার কড়া নেড়ে বললেন-"আরে তুমি এখনো ঘুমাচ্ছ, আজকে বিকেলে ক্লাবের মাঠে ম্যাচ আছে, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।" আক্ষরিকভাবেই কান্ট লিখে গেছেন যে, "হিউম তার ঘুম ভাঙিয়েছিলেন"। আসলে হিউমের সংবেদন বা অনুভূতিকেই কান্ট কাঁচামাল হিসাবে গ্রহণ করলেন এবং স্থান-কাল এবং বারোটা ক্যাটাগরির মধ্য দিয়ে আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা বোঝাপড়া অথবা ধারণা গঠন এবং তার ভিত্তিতে জাজমেন্ট বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়টি গতিপ্রাপ্ত হলো। পূর্বে ঈশ্বরের নির্দেশে মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো এখন ঈশ্বরকে সরিয়ে সেখানে কান্ট রিজনকে বসালেন। এতদিন কিন্তু বস্তু ছিল জ্ঞানের অনুবর্তী, কান্ট বললেন— জ্ঞান এখন বস্তুর অনুবর্তী। চূড়ান্ত ভাববাদী দর্শন, সন্দেহ নেই ঈশ্বরের জায়গায় রিজনকে বসানো এবং উপরোক্ত বাক্যদ্বয়ই মূলত কান্টের "কোপার্নিকান বিপ্লব"। কান্টের প্রথম ক্রিটিক, ক্রিটিক অব পিওর রিজন; অতি সংক্ষেপে মূলত এই।
কিন্তু কান্টীয় রিলিজিয়নে কনসেপ্টচুয়ালি দেবতা থাকলেও, অনটোলজিক্যালি দেবতা নেই। কেননা কান্ট মনে করতেন, ফেনোমেনান (যা আমরা বাস্তবে অনুভূতি বলে জানি), আর নিউমেনন- যা থিং ইন ইটসেল্ফ অর্থাৎ যাকে আমরা জানতে পারবো না। দেবতা অনটোলজিক্যালি থিং ইন ইট-সেলফ। কিন্তু আমার ভালো লাগে কান্টের পারপিচুয়াল পিস বা স্থায়ী বিশ্ব শান্তির বার্তা, যা রাষ্ট্রহীন। তবে কি কান্ট নৈরাজ্যবাদী ছিলেন? সারা বিশ্বে যখন উপনিবেশ ও কলোনি তৈরি হচ্ছে, কান্ট কিন্তু তার নিন্দা করেছেন। আজকের ভেনেজুয়েলা এবং তারও আগে লিবিয়ার গদ্দাফি, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, গুয়েতেমালা, কঙ্গোর প্র্যাট্রিক লুবুম্বা, চে, চিলির সালভাদোর আলেন্দের ঘটনা দেখলে কান্ট অবশ্যই, যন্ত্রণা পেতেন। হিটলার থেকে ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী দৌরাত্ম্য দেখলে কান্ট হয়তো নতুন করে মোরালিটি সংক্রান্ত বক্তব্য পেশ করতেন। তাই ৩০০ বছর আগে জন্মানো মানুষটি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনেই থাকবেন, এমনটাই আমার বিশ্বাস। আমরা যারা মার্কসীয় ইতিহাস চর্চার ধারাবাহিকতাতে বিশ্বাস করে মাঝে মাঝে কিছু অসরলরৈখিক ঘটনার স্বীকার পূর্বক সভ্যতার জ্ঞানতত্ত্বের ইতিহাস লিখতে যদি যাই সেক্ষেত্রে কান্টকে স্মরণ করতেই হয়।
দ্বিতীয় ক্রিটিক প্রাকটিক্যাল রিজনও প্রথম ক্রিটিকেরই অনুবর্তী এবং তার সঙ্গে তার আরেকটি গ্রন্থ মেটাফিজিক্স অব মোরাল, গ্রাউন্ড ওয়ার্ক। কান্টের নৈতিকতা ডিঅনটোলজি অর্থাৎ "কর্তব্যের জন্য কর্তব্য" নীতি, সমালোচনার শিকার যেমন হয়েছে, তেমনি পরিণামবাদও ব্যবহারিক প্রয়োগের ব্যর্থতায় সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। আসলে কান্ট জ্ঞানের একটা সীমারেখা টেনেছিলেন এবং বিশ্বব্যাপী এক নৈতিকবোধ (ক্যাটাগরিক্যাল ইমপ্যারেটিভের) প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তাঁর মতে, আমরা যেটা জানতে পারি সেটা ফেনোমেনা, আর যেটা জানতে পারি না সেটা নিউমেনা। কান্ট ঈশ্বরকে নিউমেনার জগতে রেখেছিলেন। অনেক পরে এডমন্ড হ্রসারল ফেনোমেনাকেই প্রধান বলে মেনে নিউমেনাকে বাতিল করেন। সঙ্গত কারণেই বিশ্লেষক ও সংশ্লেষক বচন নিয়ে এই নিবন্ধে কিছু লিখবো না কিন্তু আমার মূল বক্তব্য হচ্ছে কান্টের সেই বিখ্যাত উক্তি, যেখানে তিনি বলেছেন-নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে যখন আমি তাকিয়ে থাকি, তখন অনুভব করি এক মহাজাগতিক হারমোনি বা বিন্যাস। যা আমার চিদাকাশ আর মহাজগতের কোথাও যেন মিলে আছে। এইখান থেকেই আসে মোরাল অটোনমি এবং ফ্রি-উইল, তথা বিশ্বশান্তির এক নতুন ব্যাখ্যা। কিন্তু ১৭৮৪ সালে কান্ট একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে হোয়াট ইস এনলাইটমেন্ট) লিখে গেছেন, আলোকায়ন মানুষকে সাবালক করেছে। বাস্তবে বক্তব্যটা এই যে, এখন সিদ্ধান্ত নেবে সাবালক মানুষ, ঈশ্বর নয়-ঈশ্বর অব্যক্ত।
এরপরে ফিকটে, শেলিং ক্যানটিও বক্তব্যকে নতুনভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু এটা পরিষ্কার, হেগেলের ইতিহাসবোধ তৈরির পিছনে মূল অবদান কান্টের। যেখান থেকে মাল-মশলা নিয়ে একদা ইয়ং হেগেলিয়ান পরবর্তীকালে মানুষের দুঃখমুক্তির দিশারী কার্ল মার্কস তাঁর বিপ্লবী মেথডোলজি তৈরি করেছেন। তবে কান্টীয় মেথডলজিতে গ্যালিলিও, নিউটনের গতিবিদ্যা প্রভাব ফেলেছে এবং ততদিনে টলেমির ভূমিকেন্দ্রিক মডেলও খারিজ হয়ে গেছে। অনেক পরে কিছুটা কান্টসিয়ান জন রলস বা নোয়াম চমস্কি কান্টের তত্ত্বকে কাজে লাগিয়েছিলেন। আজকে কান্টের কাছে আমাদের উত্তরাধিকার আছে জন রলস থেকে কিছুটা প্রভাবিত হওয়া অমর্ত্য সেন এবং মার্থা নুসবামের ডিগ্রি অব ফ্রিডম এবং থিওরি অব চয়েজ এবং কল্যাণকামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রশ্নে এবং অবশ্যই ব্যক্তির স্বাধীনতা (ফ্রি-উইল এবং অটোনমির প্রশ্নে) এবং এমনকি ক্যারল গিলিগানের কেয়ার এথিক্সের প্রশ্নেও। শেষ কথা, এই বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান বিপ্লবী এবং দার্শনিক কমরেড লেনিন বলেছিলেন মার্কসবাদের তিনটি উৎসের কথা। প্রথমটি রিকার্ডো, অ্যাডাম স্মিথ প্রমুখের ব্রিটিশ অর্থনীতি, ফরাসি সমাজবাদ (ফরাসি বিপ্লব, সাঁ-সিমো, জাঁ জাক রুশো) এবং অবশ্যই চিরায়ত জার্মান দর্শন। আজকের এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও তাই কান্টের অটোনমি ও ফ্রি-উইল নিয়ে আলোচনা জরুরি।
আজকের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে কান্টের বিশ্বশান্তির ধারণা পদদলিত। আমার শুধু মনে হয়, ইমানুয়েল কান্ট কি মহাভারত, কনফুসিয়াস ও বুদ্ধদেব পড়েছিলেন? আজকের এই উত্তর সত্য যুগে যেখানে এক সিন্থেটিক হেজিমনির বিস্তার, পণ্য সভ্যতায় বিজ্ঞানের লবজ হচ্ছে-"আমার বাড়িই হোক আমার পরিচয়", তখন কান্টের মোরাল অটোনমি এবং ফ্রি-উইল তাঁর উত্তরসূরিদের কাছ থেকে যেভাবে অধিকারের দর্শন-এর ব্যাখ্যা আমরা লাভ করেছি, সেটা কিছুক্ষণ অন্তত ভাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। বলার এইটুকুই। তবু কান্টের রিজনের বড় সমস্যা এই যে, তা একদিকে রবিনসন ক্রুশোর পশ্চিম ইউরোপীয় কলোনিয়ালিজমের মর্মান্তিক ইতিহাসও যেমন তৈরি করতে পারে, তেমনি যুক্তির প্রকৃত রূপটিকেও ফুটিয়ে তুলতে পারে। এই সতর্কবাণীও উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন। তবু পশ্চিম ইউরোপের আলোকায়ন কলোনি তৈরি করেছিল সারা বিশ্বের মেহনতি মানুষকে শেষ পর্যন্ত শোষণ এবং শাসন করার উদ্দেশ্যেই তবে তা ভিন্ন প্রেক্ষিতের আলোচনা।
Comments :0