গোটা রাজ্যের পাশাপাশি শিল্প ধর্মঘটের সমর্থনে মিছিল ঢেউ উঠল নদীয়াতেও। বুধবার সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত প্রচারে হয়। কোথাও পায়ে হাঁটা মিছিল, কোথাও বাইক মিছিল, টোটোতেও চলেছে প্রচার। আবার কোথাও অনুষ্ঠিত হয়েছে সভা। হাঁসখালি ব্লকের গাজনা পঞ্চায়েতের শ্যামনগর থেকে এদিন সকালে এক বিরাট মিছিল গোটা এলাকা প্রদক্ষিণ করে। বিকালে হাঁসখালি বগুলাতে দৃপ্ত মিছিল ও সভা হয়। মিছিল ডাকবাংলা মোড় থেকে শুরু করে, কলেজ মোড়, ব্যাংক রোড হয়ে বাজারে এসে শেষ হয়। শ্রম কোড বাতিল সহ ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা আরও বেশ কিছু দাবিতে ধর্মঘট ডেকেছে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন ও ফেডারেশন সমূহ। গোটা দেশের সঙ্গে রাজ্য জুড়ে প্রচার চলছে জোরকদমে। শ্রমিক কর্মচারীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কৃষক-খেত মজুররাও। এদিন ৪টি শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে করিমপুর এক ব্লক শ্রমজীবী সমন্বয় টিমের উদ্যোগে করিমপুর বাজারে এক বিরাট মিছিল হল। মিছিল স্লোগান ওঠে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ও আমাদের রাজ্যে শিল্প ধর্মঘট সমর্থন ও সফল করুন। দীনেশ স্মৃতি ভবন থেকে মিছিল শুরু হয়ে প্রথমে কলেজ মোড় ঘুরে হসপিটাল গেট হয়ে করিমপুর বাজার দিয়ে নতুন বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে মিছিল শেষ হয়। মিছিল থেকে ব্যাংক বীমা ও পোস্ট অফিস সহ কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরগুলিকে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানানো হয়।
ধর্মঘটের সমর্থনে এদিন মিছিল হয় নাজিরপুরেও। নাজিরপুর বাজার এলাকার বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে এবং শ্রমিক ঐক্য, শ্রম কোড বাতিল ও শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার দাবিতে স্লোগান ওঠে। মিছিল শেষে সভা হয়। তেহট্ট দক্ষিণ এরিয়া কমিটির অভ্যন্তরে তেহট্ট ও শ্যামনগরে দু’দুটি নজর কাড়া মশাল মিছিল হয়েছে। মিছিল তেহট্টের নাটনা মোড় থেকে যাত্রা শুরু করে বিএলআর অফিস এইডিও অফিস হয়ে এসডিপিও অফিসের সামনে এসে শেষ হয়। অন্যদিকে শ্যামনগরে শ্রমিক কৃষক ক্ষেত মজুর সহ শ্রমজীবী এবং মহিলাদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মিছিল শুরু হয় প্রাথমিক হেলথ সেন্টারের সামনে থেকে। ধর্মঘটের প্রচার নিয়ে রানাঘাটের আনুলিয়া স্টেট ব্যাংকের চরম উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়। ধর্মঘটের সমর্থনে যখন সর্বত্র প্রচারাভিযান চলছে, তখন রানাঘাট আনুলিয়া স্টেট ব্যাংকে নেতৃত্বরা গ্রাহক এবং কর্মচারীদের শিল্প ধর্মঘট সফল করার আবেদন করতে যান। গ্রাহক এবং কর্মচারীরা ধর্মঘট সমর্থন করবেন বলে আশ্বাস দেন। তবে ব্যাংকের ম্যানেজার বন্ধের আবেদন সিআইটিইউ নেতৃত্বের সামনে ছিড়ে ফেলে দেন। অত্যন্ত অশালীন ভাষায় বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন গুলোর নামে অশ্রাব্য কথা বলেন। সিআইটিইউ নেতৃত্বের প্রতিবাদ করেন। সিআইটিইউ নদীয়া জেলা নেতৃত্ব ও কর্মীরা রানাঘাট আনুলিয়া স্টেট ব্যাংকের সামনে গিয়ে অবস্থান বিক্ষোভ করে। দাবি করে ব্যাংকের ম্যানেজারকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। চাপে পড়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান ব্যাংক ম্যানেজার। এবং আবেদন জমা নেন।
ধর্মঘটের সমর্থনে কালীণারায়নপুরে মিছিল।
এদিন সকাল থেকেই নদীয়া জেলার কালীনারায়নপুরে শ্রমিক এবং কৃষক নেতৃত্বরা যৌথভাবে সারা সকাল ধরে মাঠ মিছিল পরিক্রমা করে। জনে জনে কৃষকদের কাছে যায়। কৃষকদেরকে মধ্যে ফসলের ন্যায্য মূল্যের দাবি, সারের ন্যায্য মূল্যের দাবি এবং মোদী সরকার যেভাবে আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি করেছে তা দেশের স্বার্থ বিরোধী ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক বিষয়ে জনসংযোগ করেন। ছিলেন সিআইটিইউ নদীয়া জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য অয়ন মিত্র, শ্রমিক নেতা সুবল দাস চৌধুরী জেলার অন্যতম কৃষক নেতা গৌরাঙ্গ মোদক, পরিমল বিশ্বাস, দুলাল মন্ডল অজিত মোদক, বিদ্যুৎ মন্ডল সায়ন্তন রায়, রাজীব দেব সহ অন্যান্য নেতৃত্ব। ধর্মঘটের সমর্থনে বাদকুল্লা ও তাহেরপুরে দুটি বিশাল মিছিল হয়েছে। কৃষ্ণনগর ১ ব্লকের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁত শ্রমিক, বিড়ি শ্রমিক, টোটো চালক, ভ্যান রিক্সা চালক সহ বিভিন্ন অংশের শ্রমজীবী মানুষদের সংঘটিত করে ঘরোয়া সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিন হাইরোডে একটি মিছিল হয়েছে। এদিন শান্তিপুরের পাবলিক লাইব্রেরী মাঠ থেকে দৃপ্ত মিছিল এলাকা পরিক্রমা করে, বাইগাছি মোড়ে এসে শেষ হয়।
এদিন চাপড়ায় অনুষ্ঠিত মিছিলের মেজাজ থেকে উত্তাপ নিয়েছেন স্থানীয় পথ চলতি মানুষেরাও। দেবগ্রাম সিআইটিইউ আঞ্চলিক সমন্বয় কমিটির উদ্যোগে এদিন দেবগ্রাম সিপিআই(এম) অফিস থেকে দেবগ্রাম বাজার হয়ে ষ্টেশনবাজার হয়ে এক বন্যাঢ মিছিল হয়েছে। ধর্মঘটের সমর্থনে এদিন সন্ধ্যাটয় চাকদহ শহরে মিছিল সংগঠিত হয়েছে সিআইটি ইউর উদ্যো গে। মিছিল থেকে স্লোগান উঠেছে শিল্প ধর্মঘটকে সফল করার। মিছিল শুরু হয় সিপিআই(এম) চাকদহ এরিয়া অফিসের সামনে থেকে। সিংহের হাট, চাকদহ বাসস্ট্যা ন্ড, রেলগেট, চাকদহ থানা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়। মিছিলে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান ছিল চোখে পড়ার মতো। শ্রমজীবি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি এল পথচলতি মানুষের কাছ থেকেও।
সিআইটিইউ নদিয়া জেলার সাধারণ সম্পাদক এস এম সাদী এদিনের প্রচার কর্মসূচির মধ্যেই জানালেন মাসাধীক কালব্যাপী গোটা দেশের সঙ্গে রাজ্যজুড়ে ধর্মঘটের প্রচার চলছে। এরাজ্যে শিল্প ধর্মঘটকে সফল করার বার্তা নিয়ে ব্যাপক প্রচার আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে মত বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে শ্রমজীবী মানুষের জীবন যন্ত্রণার বার্তা। ঠিকা শ্রমিকদের অধিকার ন্যূনতম, বেকার সমস্যা, সমকাজে সমবেতন, জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমকোড চালুর মধ্যে লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়া, সর্বোপরি সরকারের একের পর এক জনবিরোধী গৃহীত-নীতির ফলে আক্রান্ত সর্বস্তরের মানুষের জীবন জীবিকার সংকটের কথা জোরালো ভাবে উঠে এসেছে। প্রচার আন্দোলনে শহর থেকে গ্রামগঞ্জের প্রান্তিক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাড়তি রসদ জুগিয়েছে আন্দোলনকারীদের। তিনি বৃহস্পতিবারের শিল্প ধর্মঘটকে সংগঠিত ও অসংগঠিত বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রমিক তথা শ্রমজীবী মানুষদের ঐক্যবদ্ধভাবে ধর্মঘটকে সর্বাত্মক সফল করার আহ্বান রেখেছেন। বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই রাস্তার দখল নেবে লাল ঝান্ডা আঁকড়ে শ্রমজীবীরা। বিকালে জেলার কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপ, রানাঘাট সহ একাধিক স্পটে কেন্দ্রীয়ভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
Comments :0