editorial

কৃষিক্ষেত্রের আশঙ্কাই সত্য হলো!

সম্পাদকীয় বিভাগ

দৌড় প্রতিযোগিতায় দুই প্রতিযোগীর মধ্যে একজনকে যদি ১৮শতাংশ পথ বেশি বা কম পথ অতিক্রম করতে বলা হয়, তাহলে সেই প্রতিযোগিতাকে যেমন সমান সুযোগের ভিত্তিতে বলা যায় না, তেমনই ভারত-মার্কিন নতুন বাণিজ্য চুক্তিকেও সমান সুযোগের বলা যায় না। বরং ভারতের বাজারকে আমেরিকার কাছে উন্মুক্ত করে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হবে বলে যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, মোদী সরকার সেটাই বাস্তবায়িত করল। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কাছে ভারতবাসীর, বিশেষত ভারতের কৃষকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে মোদী সরকার বাণিজ্য চুক্তিতে নির্লজ্জের মতো আত্মসমর্পণ করেছে। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল সংসদে শুক্রবার তিন পাতার বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিলেন, আমেরিকার জন্য ভারতের ডেয়ারি ও কৃষি বাজার অবাধ করা হবে না। কিন্তু পরদিনই যৌথ ঘোষণায় দেখা গেছে সম্পূর্ণ উলটো ছবি, আমেরিকার কৃষিপণ্যের জন্য ভারতের বাজার অবাধ করে দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য চুক্তি অনুসারে, ভারতের পণ্য আমেরিকায় প্রবেশে বসবে ১৮শতাংশ শুল্ক আর আমেরিকার পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশে শুল্ক শূন্য হবে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তির ফলে ৫০০বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫০হাজার কোটি টাকা)’এর মার্কিন কৃষিপণ্য ভারত ক্রয় করবে। এমনিতেই আমেরিকায় বিপুল সরকারি ভরতুকিতে চলে কৃষি কর্পোরেট। বাজার অবাধ করায় তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটেই উঠতে পারবে না ভারতের কৃষিক্ষেত্র। ফলে সঙ্কটে পড়বে ভারতের কৃষিক্ষেত্র। ভারতে কৃষি উৎপাদনের যাবতীয় উপকরণের দাম বেড়েছে। সারের ওপর ভরতুকি কমানোয় সারের দাম বেড়েছে। এদিকে ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়লেও তার দাম মিলছে না কৃষকদের। ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মুল্য স্বামীনাথনের সূত্রে স্থির করার দাবি জানানো হলেও তা মানেনি কেন্দ্র। কৃষি অলাভজনক হয়ে যাওয়ায় ভারতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমে হয়েছে ৩.১ শতাংশ মাত্র। এখন আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে কৃষিতে সঙ্কট গভীরতর হবে। ভারতের কৃষিতে মার্কিনী সংস্থাগুলির একচেটিয়া কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পাবে। 
এই যৌথ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ভারত ও আমেরিকার তরফে দুই কর্তাব্যক্তির প্রকাশ্য বক্তব্যেও ধরা পড়েছে বৈপরীত্য। ভারতের কৃষি মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান এবং বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল যখন তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, মার্কিন কৃষি মন্ত্রী ব্রুক রোলিন্স তখন উল্লাসের সঙ্গে তথ্য ফাঁস করে দিয়েছেন। কয়েকদিন আগেই তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘নতুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–ভারত চুক্তির মাধ্যমে ভারতের বিশাল বাজারে আরও বেশি আমেরিকান কৃষি পণ্য রপ্তানি করা যাবে। এর ফলে দাম বাড়বে এবং গ্রামীণ আমেরিকায় নগদ অর্থ প্রবাহিত হবে।’ এই সত্যকে আড়াল করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান ঘোষণা করেন, ‘ভারতের প্রধান খাদ্যশস্য, ফল, গুরুত্বপূর্ণ ফসল, মিলেট এবং দুগ্ধজাত পণ্য সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত এবং এগুলির ওপর কোনও ধরনের হুমকি নেই। এই চুক্তি ভারতীয় কৃষির জন্য ঝুঁকি নয়, বরং নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।’
কিন্তু সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বাণিজ্য মন্ত্রীর সাংবাদিক বৈঠকের ব্রিফিং নোটে স্পষ্ট লেখা আছে ‘ভারতের কৃষিক্ষেত্রের পরিকল্পিত বা সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্মুক্তকরণ।’ অর্থাৎ মার্কিন স্বার্থরক্ষা করেই বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। চুক্তিতে সমতা বা ভারসাম্য যে নেই তা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীরাও পাটিগণিতের হিসাব কষলেই বুঝতে পারবে একদিকে শূন্য শুল্ক এবং অন্যদিকে ১৮ শতাংশ শুল্কের পরিমাণ দেখলেই। ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্কের এই পরিমাণকে ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করতে পারার সাফল্য মোদী সরকার দাবি করলে সেটাও নিছক হাস্যকর। কারণ মোদী সরকারকে চাপ দিতেই ট্রাম্প শুল্ককে তিন শতাংশের থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেছিলেন। এখন সেটাকে ১৮ শতাংশে কমানোর সাফল্য হিসাবে দেখালে  কালোবাজারিতে অভ্যস্ত ব্যবসায়ীরাও হাসবে।

Comments :0

Login to leave a comment